আবদুর রহমান ইবন ’আউফ (রা)–৩য় অংশ

 

বনু খুযায়মার এ দুর্ঘটনা নিয়ে খালিদ ও আবদুর রহমানের মধ্যে বচসা ও বিতর্ক হয়।

এ কথা রাসূল সা. অবগত হয়ে খালিদকে ডেকে তিরস্কার করেন। তিনি বলেন, ‘তুমি সাবেকীনে আওয়াবীন’ (প্রথম পর্বে ইসলাম গ্রহণকারী) একজন সাহাবীর সাথে ঝগড়া ও তর্ক করেছ। এমনটি করা তোমার শোভন হয়নি।

আল্লাহর কসম, যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনার মালিকও তুমি হও এবং তার সবই আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দাও, তবুও তুমি আমার সেসব প্রবীণ সাহাবীর একজনেরও সমকক্ষ হতে পারবে না।’ উল্লেখ থাকে যে, হযরত খালিদ আহযাবের যুদ্ধের পর ষষ্ঠ হিজরীতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

নবম হিজরীতে তাবুক অভিযানের সময় মুসলমানগণ যে ঈমানী পরীক্ষার সম্মুখীন হয়  সে পরীক্ষায়ও তিনি কৃতকার্য হন।

রাসূলুল্লাহর সা. আবেদনে সাড়া দিয়ে এ অভিযানের জন্য হযরত আবু বকর, উসমান ও আবদুর রহমান রা. রেকর্ড পরিমাণ অর্থ প্রদান করেন। আবদুর রহমান আট হাজার দিনার রাসূলুল্লাহর সা. হাতে তুলে দিলে মুনাফিকরা কানাঘুষা শুরু করে দেয়।

তারা বলতে থাকে, ‘সে একজন রিয়াকার- লোক দেখানোই তার উদ্দেশ্য।’ তাদের জবাবে আল্লাহ বলেন, ‘এ তো সেই ব্যক্তি যার উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হতে থাকবে।’ (সূরা তাওবাহঃ ৭১) অন্য একটি বর্ণনায় আছে, উমার রা. তাঁর এ দান দেখে বলে ফেলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আবদুর রহমান গুনাহগার হয়ে যাচ্ছে। কারণ, সে তার পরিবারের লোকদের জন্য কিছুই রাখেনি।’ একথা শুনে রাসুল সা. জিজ্ঞেস করেন, ‘আবদুর রহমান, পরিবারের জন্য কিছু রেখেছ কি?’ তিনি বলেন, ‘হাঁ। আমি যা দান করেছি তার থেকেও বেশী ও উৎকুষ্ট জিনিস তাদের জন্য রেখেছি।’

রাসূলুল্লাহ সা. জিজ্ঞেস করলেন, ‘কত?’ বললেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসূল যে রিযিক, কল্যাণ ও প্রতিদানের অঙ্গীকার করেছেন, তাই।’

এ তাবুক অভিযানকালে একদিন ফজরের নামাযের সময় রাসূল সা. প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বাইরে যান। ফিরতে একটু দেরি হয়। এদিকে নামাযের সময়ও হয়ে যায়। তখন সমবেত মুসল্লীদের অনুরোধে আবদুর রহমান ইমাম হিসাবে নামাযে দাড়িয়ে যান।

এদিকে রাসুল সা. ফিরে এলেন, এক রাকায়াত তখন শেষ। আবদুর রহমান রাসূলুল্লাহর সা. উপস্থিতি অনুভব করে পেছন দিকে সরে আসার চেষ্টা করেন। রাসূল সা. তাঁকে নিজের স্থানে থাকার জন্য হাত ইশারা করেন। অতঃপর অবশিষ্ট দ্বিতীয় রাকায়াতটিও তিনি শেষ করেন এবং রাসুল  সা. তাঁর পেছনে ইকতিদা করেন। ইমাম মুসলিম ও আবু দাউদ তাঁদের সহীহ গ্রন্থদ্বয়ে এ সম্পর্কিত হাদিস বর্ণনা করেছেন।

প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর রা. অন্তিম রোগশয্যায়।

জীবনের আশা আর নেই। তাঁর পর খলীফা কে হবেন সে সম্পর্কে ‍চিন্তাশীল বিশিষ্ট সাহাবীদের ডেকে পরামর্শ করলেন। হযরত আবদুর রহমানের সাথেও পরামর্শ করেন এবং হযরত উমারের কিছু গুণাবলী তুলে ধরে পরবর্তী খলীফা হিসাবে তাঁর নামটি তিনি প্রস্তাব করেন।

আবদুর রহমান ধৈর্য সহকারে খলীফার কথা শুনার পর বললেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। তাঁর যোগ্যতা সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। তবে স্বভাবগতভাবেই তিনি একটু কঠোর।

হযরত আবু বকরের রা. খিলাফতকালে আটজন বিশিষ্ট সাহাবীকে ফাতওয়া ও বিচারের দায়িত্ব প্রদানের সাথে সাথে অন্য সকলকে ফাতওয়া দান থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়। আবদুর রহমান ছিলেন এ আটজনের একজন।

হযরত উমারও তাঁর খিলাফতকালে জ্ঞান ও বিচক্ষণতার অধিকারী সাহাবীদের ছাড়া অন্য সকলকে বিচার কাজ থেকে বিরত রাখেন।

এমনকি যে আবদুল্লাহ ইবন মাসউদকে তিনি ‘খাযিনাতুল ইলম’ (জ্ঞানের ভাণ্ডার) বলে অভিহিত করতেন, তিনিও যখন পূর্ব অনুমতি ছাড়াই ফাতওয়া দিতে শুরু করেন, তাঁকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।

জ্ঞানের যে শাখায় যিনি বিশেষজ্ঞ ছিলেন হযরত উমার তাকেই কেবল সে বিষয়ে মতামত প্রকাশের অনুমতি প্রদান করেন।

এ সম্পর্কে সিরিয়া সফরকালে ‘জাবিয়া’ নামক স্থানে এক বক্তৃতায় বলেন, ‘যারা কুরআন বুঝতে চায়, তারা উবাই বিন কা’ব, যারা ফারায়েজ সম্পর্কে জানতে চায়, তারা যায়িদ বিন সাবিত এবং যারা ফিক্‌হ সংক্রান্ত বিষয়ে অবগত হতে চায়, তারা মুয়ায বিন জাবাল ও আবদুর রহমান বিন ’আউফের সাথে যেন সম্পর্ক গড়ে তোলে।’’

খলীফা হযরত উমার হযরত আবদুর রহমানকে বিশেষ উপদেষ্টার মর্যাদা দেন।

রাতে তিনি যখন ঘুরে ঘুরে নগরের মানুষের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতেন, অনেক সময সংগে নিতেন হযরত আবদুর রহমানকে এবং নানা বিষয়ে

তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন।

চতুর্থ অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar