আবু দুজানা (রা)

আসল নাম সিমাক, ডাকনাম আবু দুজানা। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের বনু সায়িদা শাখার সন্তান। খাযরাজ নেতা বিখ্যাত সাহাবী হযরত সা’দ ইবন ’উবাদার (রা) চাচাতো ভাই। পিতার নাম খারাশা ইবন লাওজান, মতান্তরে আউস ইবন খারাশা এবং মাতার নাম হাযমা বিনতু হারমালা।১ আবু দুজানা একজন খ্যাতিমমান আনসারী সাহাবী এবং একজন সাহসী বীর। ইসলামের প্রচার প্রতিষ্ঠায় তাঁর বিরাট আত্মত্যাগ স্বীকৃত।২

হিজরাতের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত রাসূলে কারীম (সা) মদীনায় এসে ’উতবা ইবন গাযওয়ানের (রা) সাথে তাঁর দ্বীনি ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন।৩ ’আল্লামা ইবন হাজার (রহ) তাঁর বদরে অংশগ্রহণের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের ঐক্যমতের কথা বর্ণণা করেছেন।৪ ইবন হিশামও তাঁর বদরে শরীক হওয়ার কথা বলেছেন।৫ বদরের যুদ্ধের দিন তাঁর মাথায় একটি লাল ফেটা বাঁধাা ছিল। মুসা ইবন মুহাম্মাদ বলেন: সেদিন জনতার মাঝে এ লাল ফেটার জন্যই তাঁকে স্পষ্টভাবে চেনা যাচ্ছিল।৬ মক্কায় যারা হযরত রাসূলে কারীমকে (সা) নির্মমভাবে ঠাট্টা বিদ্রুপ করতো, আবুল আসওয়াদ ইবনল মুত্তালিব ছিল তাদের অন্যতম। একটি বর্ণনামতে বদরে আবু দুজানা তার ছেলে আবু হাকীমা যাম’য়া ইবনুল আসওয়াদকে হত্যা করেন। তাছাড়া আবু মুসাফি’ আল-আশ’য়ারী ও মা’বাদ ইবন ওয়াহাবকেও হত্যা করেন।৭

আবু দুজানা উহুদ যুদ্ধেও রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে ছিলেন। এবং চরম বিপর্যয়ের মুহূর্তেও তার সাথে অটল থাকেন। সেদিন তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) হাতে মৃতুর জন্য বাই’য়াত করেছিলেন। আনাস ইবন মালিক বলেন: যুদ্ধের পূর্বক্ষণে রাসূল (সা) একখানি তরবারি হাতে নিয়ে বললেন: এটি কে নিবে? উপস্থিত সকলেই হাতবাড়িয়ে দিলে বলে তখন সবাই চুপ থাকলো; কিন্তু আবু দুজানা বললেন: আমি পারবো এক হক আদায় করতে। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, আবু দুজানা রাসূলকে (সা) জিজ্ঞেস করলেন: এর হক কি?তিনি জবাব দিলেন: এ নিয়ে কোন মুসলমানকে হত্যা না করা, এটি নিয়ে কাফিরদের ভয়ে পালিয়ে না যাওয়া।৮

যুদ্ধের সময় মাথায় একটি লাল ফেটা বাঁধা ছিল তাঁর অভ্যাস। সেটা বাঁধলে বুঝা যেত তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহর (সা) হাত তেকে তরবারিখানি নিয়ে তিনি মাতায় ফেটা বাঁধলেন। তারপর একটা অভিজাত চলনে সৈনিকদের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালেন।৯ কিছুক্ষন পর কবিতার কিছু পংক্তি গুন গুন করে গাইতে গাইতে শত্র“বাহিনীর দিকে ধাবিত হলেন। দু’টি পংক্তির অর্থ নিম্নরূপ:১০

১.আমি সেই ব্যক্তি, যাকে আমার বন্দু পাহাড়ের পাদদেশে খেজুর বাগানের সন্নিকটে প্রতিশ্র“তি নিয়েছিলেন।

২.আমি যেন সৈনিকদের সারির শেষ প্রান্তে অবস্থান না করি। আর তিনি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের (সা) তরবারি দ্বারা শত্র“ নিধনের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

উহুদের রণক্ষেত্রের দিকে তিনি অভিজাত ভঙ্গিতে হেঁটে গিয়েছিলেন, তা দেখে রাসূল (সা) মন্তব্য করেছিলেন: যদিও এভাবে চলা আল্লাহর পসন্দ নয়, তবে এক্ষেত্রে কোন দোষ নেই।১১

হযরত যুবাইর ইবনুল ’আওয়াম বলেন, আবু দুজানার আগেই আমি তরবারিখানি চেয়েছিলাম। কিন্তু রাসূল (সা) আমাকে না দিয়ে দিলেন তাঁকে। অথচ আমি হলাম রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফু সাফিয়্যা বিনতু আবদুল মুত্তালিবের ছেলে। তাই তরবারিখানি তাঁকে দেওয়ার রহস্য জানার জন্য আমি তাকে অনুসরণ করলাম। তিনি রাসূল (সা) প্রদত্ত তরবারি হাতে নিয়ে অগ্রসর হলেন। যে দিকে এগুতে লাগলেন শত্র“দের মাঝে ত্রাস ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। একসময় তিনি পাহাড়রে ঢালে নেমে গেলেন, যেখানে কুরাইশ রমনীরা হিন্দার নেতৃত্বে রণসঙ্গিত গেয়ে তাদের সৈনিকদের উৎসাহিত করছিলো। তারা আবু দুজানাকে দেখে ভীত হয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার শুরু করে দিল। কিন্তু কেউ তাদের সাহায্যে এগিয়ে এলো না। কিন্তু না, আবু দুজানা তারে কাউকে স্পর্শ করলেন না। ফিরে এলেন। একটি বর্ণনায় এসেছে, হিন্দার মাথার ওপর তরবারি রেখে তিনি আবার তা উঠিয়ে নিলেমণ। যুবাইর তাঁর পিছনে ছিলেন। এ দৃশ্য দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। তিনি এর কারণ জানতে চাইলেন। আবু দাজানা জবাব দিলেন: রাসূলুল্লাহর (সা) তরবারি দিয়ে অসহায় কোন নারীকে হত্যা করতে আমার ইচ্ছা হয়নি।১২

উহুদের বিপর্যয়ের সম যে মুষ্টিমেয় সৈনিক রাসূলকে (া) ঘিরে নিজেরে দেহকে ঢাল বানিয়ে অটল হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের মধ্যে আবু দুজানা অন্যতম।১৩ এদিন তিনি নিজের পিঠ পেতে হযরত রাসূলে কারীমের (সা) পিঠ রক্ষা করেছিলেন। তাই শত্র“র নিক্ষিপ্ত তীর বর্শার আঘাতেই তাঁর পিঠ ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিলো।১৪

এ যুদ্ধেল এক পর্যায় পৌত্তলিক আবদুল্লাহ ইবন হুমাইদ, রাসূলকে (সা) হত্যার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। আবু দুজানা তাকে তরবারি দ্বারা প্রচন্ড আঘাত হেনে বলে ওঠেন: নে, আমি ইবন খারাশা। সেই আঘাতে নরাধম আদুল্লাহ ধরাশায়ী হয়। তখন হযরত রাসূল কারীম (সা) তাঁর জন্য ি বলে দু’আ করেন: হে আল্লাহ! তমি ইবন খারাশার প্রতি সন্তুষ্ট হও, আমি তার প্রতি সন্তুষ্ট।১৫

রাসুল (সা) উহুদের যুদ্ধ শেষে রণক্ষেত্রে থেকে ফিরে এসে কন্যা ফাতিমাকে (রা) বললেন: লও, আমার তরবারিখানি ধুয়ে ফেল। আজ সে বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছে। হযরত আলীও (রা) ফাতিমার নিকট একই আবেদন করে বললেন: আজ আমি খুব লড়েছি। রাসূল (সা) তার জবাবে বললেন, হাঁ, তুমি যদি ভালো লড়ে থাক তাহলে সাহল ইবন হুনাইফ ও আবু  দুজানা-দু’জনই ভালো লড়েছে।১৬

আল্লাহপাক বনু নাদীরের যাবতীয় গণীমতের মালিকানা দান করেন রাসূলকে (সা)। তিনি সেই সম্পদ শুধুমাত্র প্রথম পর্বের মুহাজিরদের মধ্যে বণ্টন করেন। তবে সাহল ইবন হুনাইফ ও আবু দুজানা এ দুজন আনসারীকেও তাঁদের দারিদ্র্যের কারণে কিছু কিছু দান করেন। এ সময় আবু দুজানা কিছু ভূমি লাভ করেন যা বহু দিন পর্যন্ত ইবন খারাশার ভুমি নামে পরিচিত ছিল।১৭

একটি বর্ণনা মতে তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত রাসূলে কারীম (সা) খাযরাজ গোত্রের ঝান্ডাটি আবু দুজানার হাতে অর্পণ করেন।১৮

মোটকথা হযরত রাসুলেকারীমের (সা) জীবদদ্দশায় সংঘটিত সকল ুদধ ও অভিযানে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। আল-ইসতী’য়াব গ্রন্থকার লিখেছেন: রাসুলুল্লাহর (সা) সময়কালের সকল যুদ্ধে তার প্রশংসনীয় ভূমিকা ছিল।১৯

প্রথম খলীফঅ হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফতকালে সংঘটিত ইয়ামামার ভয়াবহ যুদ্ধে তিনি চরম দু”সাহসের পরিচয় দেন। যুদ্ধটি ছিল ভন্ড নবী মুসায়লামা আল-কাজ্জাবের বিরুদ্ধে। সে  তার একটি সুরক্ষিত উদ্যানের মধ্য থেকে মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করছিল। উদ্যানটি শক্তু প্রাচীর বেষ্টিত থাকার কারণে মুসলিম বাহিনী ভিতরে প্রবেশষের চেষ্ট করে ব্যর্থ হচ্ছিল। বিয়টি নিয়ে আবু দুজানা ভাবলেন। তারপর বললেন: ‘আমার মুসলমনা ভাইয়েরা! আমাকে ভিতরে ছুড়ে মার।’ এভঅবে তিনি প্রাচীর তো টপকালেন; কিন্তু পা ভেঙ্গে গেল। তা সত্ত্বেও প্রাচীরের ফটক থেকে শত্র“দের তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হলেন এবং মুসলিম সৈন্যরা ভিতরে না ঢোকা পর্যন্ত নিজের স্থঅনে অটল থাকলেন। আবদুল্লাহ ইবন যায়িদ ও ওয়াহশীর সাথে তিনি ভন্ড মুসায়লামার হত্যায় অংশ গ্রহণ করেন। অবশেষে এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। ইবন সা’দের মতে এটা হিজরী ১২ সনের, আর আল্লামা যিরিকলীর মতে হি: ১১/খ্রী:৬৩২ সনের ঘটনা।২০

আবু দুজানার সূত্রে কোন হাদীস বর্ণিত না থাকলেও ‘ইবনুল আসীরের’ ভাষা” তিনি ছিলেন সম্মানিত সাহাবীদের একজন এবং তাঁদের মধ্যে উঁচু মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি।’২১

প্রবল একটা ঈমানী আবেগ তাঁর মধ্যে ছিল। এর প্রমাণ তিনি দিয়েছেন ইামামার যুদ্ধে। হযরত রাসূলে কারীমের (সা) প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার প্রমানতিনি দিয়েছেন উহুদ যুদ্ধে। এ যুদ্ধের এক মারাত্মক পযায়ে যখন মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত হয়ে রাসূল (সা) থেকে দূরে ছিটকে পড়ে তখন যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন সৈনিক তাঁর ধারে কাছে ছিলেন তাঁদের মধ্যে মুস’য়ার ইবন ’উমাইর ও আবু দুজানা ঢাল হিসেবে নিজেদের বুক পেতে দেন। মুসয়াব তো জীবনই দান করেন। আর আবু দুজানা নিজের দেহ ঝাঝরা করে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেন।

তাঁর চলার ভঙ্গিটা ছিল এক বিশেষ ধরনের যা তখন রীতিমত একটা দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছিল। ‘আল-মাশহারা’ নামে তাঁর একটি বর্ম ছিল। যদ্ধের সময় তিনি সেটা পরতেন। এ কারণে তাঁকে ‘জুল মাশহারা’ (আল মাশহারার অধিকারী) বলা হতো। তাঁকে ‘জু-আস্-সায়ফাইন’ও বলা হতো। কারণ উহুদে তিনি দু’টি তরবারি দিয়ে লড়েছিলেন। একটি নিজের এবং অপরটি রাসূলুল্লহার (সা) ‘জু-আস্-সায়ফাইন’ অর্থ দুই তরবারির অধিকারী।২২

আবু দুজানা একবার রোগশয্যায় শায়িত। এক ব্যক্তিতাঁকে দেখতে এলন। তিনি তাঁর চেহারায় নূরের ঝলক দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন: আপনার চেহেরা এমন উজ্জ্বল হওয়ার কারণ কি? তিনি বললেন: দু’টি অভ্যা ছাড়া আমার তেমন কোন ’আমল নেই। একটি হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় কোন কথা আম বলিনে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, আমার অন্তরটি সব সময় মুসলমানদের কল্যাণকামী।২৩ উপরোক্ত আলোচনা থেকে তাঁর কর্মময় জীবন চরিত্র ও গুণাবলী সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা লাভ করা যায়।

You may also like...

Skip to toolbar