’আলী ইবন আবী তালিব (রা)— ২য় অংশ

 

মাদানী জীবনের সূচনাতে রাসূল সা. যখন মুসলমানদের পরস্পরের মধ্যে ‘মুয়াখাত’ বা দ্বীনী-ভ্রাতৃ সম্পর্ক কায়েম করছিলেন, তিনি নিজের একটি হাত আলীর রা. কাঁধে রেখে বলেছিলেন, ‘আলী তুমি আমার ভাই।

তুমি হবে আমার এবং আমি হব তোমার উত্তরাধিকারী।’ (তাবাকাতঃ /২২) পরে রাসূল সা. আলী ও সাহল বিন হুনাইফের মধ্যে ভ্রাতৃসম্পর্ক কায়েম করে দিয়েছিলেন। (তাবাকাতঃ /২৩)

হিজরী দ্বিতীয় সনে হযরত আলী রা. রাসূলে কারীমের সা. জামাই হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

রাসূলুল্লাহর সা. প্রিয়তম কন্যা খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমার রা. সাথে তাঁর বিয়ে হয়।

ইসলামের জন্য হযরত আলী রা. অবদান অবিস্মরণীয়।

রাসূলে কারীমের সা. যুগের সকল যুদ্ধে সবচেয়ে বেশী সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় তিনি দেন। এ কারণে হুজুর সা. তাঁকে ‘হায়দার’ উপাধিসহ ‘যুল-ফিকার’ নামক একখানি তরবারি দান করেন।

একমাত্র তাবুক অভিযান ছাড়া সকল যুদ্ধেই তিনি অংশগ্রহণ করেন। বদরে তাঁর সাদা পশমী রুমালের জন্য তিনি ছিলেন চিহ্নিত। কাতাদা থেকে বর্ণিত। বদরসহ প্রতিটি যুদ্ধে আলী ছিলেন রাসূলুল্লাহর সা. পতাকাবাহী। (তাবাকাতঃ /২৩) উহুদে যখন অন্যসব মুজাহিদ পরাজিত হয়ে পলায়নরত ছিলেন, তখন যে ক’জন মুষ্টিমেয় সৈনিক রাসূলুল্লাহকে সা. কেন্দ্র করে ব্যুহ রচনা করেছিলেন, আলী রা. তাঁদের একজন।

অবশ্য পলায়নকারীদের প্রতি আল্লাহর ক্ষমা ঘোষিত হয়েছে।

ইবন ইসহাক থেকে বর্ণিত। খন্দকের দিনে ’আমর ইবন আবদে উদ্দ বর্ম পরে বের হল।

সে হুংকার ছেড়ে বললোঃ কে আমর সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হবে? আলী উঠে দাঁড়িয়ে বললেনঃ হে আল্লাহর নবী, আমি প্রস্তুত।

রাসূল সা. বললেনঃ ‘এ হচ্ছে ’আমর তুমি বস।’ ’আমর আবার প্রশ্ন ছুড়ে দিলঃ আমার সাথে লড়বার মত কেউ নেই? তোমাদের সেই জান্নাত এখন কোথায়, যাতে তোমাদের নিহতরা প্রবেশ করবে বলে তোমাদের ধারণা? তোমাদের কেউই এখন আমার সাথে লড়তে সাহসী নয়? আলী রা. উঠে দাঁড়ালেন। বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি প্রস্তুত।

রাসূল সা. বললেনঃ বস। তৃতীয় বারের মত আহ্‌বান জানিয়ে ’আমর তার স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে লাগলো। আলী রা. আবারো উঠে দাঁড়িয়ে আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমি প্রস্তুত।

রাসূল সা. বললেনঃ সে তো ’আমর। আলী রা. বললেনঃ তা হোক। এবার আলী রা. অনুমতি পেলেন। আলী রা. তাঁর একটি স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে আমরের দিকে এগিয়ে গেলেন।

’আমর জিজ্ঞেস করলোঃ তুমি কে? বললেনঃ আলী। সে বললোঃ আবদে মান্নাফের ছেলে? আলী বললেনঃ আমি আবু তালিবের ছেলে আলী। সে বললোঃ ভাতিজা, তোমার রক্ত ঝরানো আমি পছন্দ করিনে।

আলী বললেনঃ আল্লাহর কসম, আমি কিন্তু তোমার রক্ত ঝরানো অপসন্দ করিনে। এ কথা শুনে ’আমর ক্ষেপে গেল। নিচে নেমে এসে তরবারি টেনে বের করে ফেললো। সে তরবারি যেন আগুনের শিখা।

সে এগিয়ে আলীর ঢালে আঘাত করে ফেঁড়ে ফেললো।

আলী পাল্টা এক আঘাতে তাকে ধরাশায়ী করে ফেললেন।

এ দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ সা. তাকবীর ধ্বনি দিয়ে উঠেন।

তারপর আলী নিজের একটি কবিতা আবৃত্তি করতে করতে রাসূলুল্লাহর সা. কাছে ফিরে আসেন। (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবন কাসীর /১০৬)

সপ্তমি হিজরীতে খাইবার অভিযান চালানো হয়।

সেখানে ইয়াহুদীদের কয়েকটি সুদৃঢ় কিল্লা ছিল। প্রথমে সিদ্দীকে আকবর, পরে ফারুকে আজমকে কিল্লাগুলি পদানত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কেউই সফলকাম হতে পারলেন না।

নবী সা. ঘোষণা করলেনঃ ‘কাল আমি এমন এক বীরের হাতে ঝাণ্ডা তুলে দেব যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রিয়পাত্র। তারই হাতে কিল্লাগুলির পতন হবে।’ পরদিন সকালে সাহাবীদের সকলেই আশা করছিলেন এই গৌরবটি অর্জন করার।

হঠাৎ আলীর ডাক পড়লো। তাঁরই হাতে খাইবারের সেই দুর্জয় কিল্লাগুলির পতন হয়।

তাবুক অভিযানে রওয়ানা হওয়ার সময় রাসূল সা. আলীকে রা. মদীনায় স্থলাভিষিক্ত করে যান।

আলী রা. আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি যাচ্ছেন, আর আমাকে নারী ও শিশুদের কাছে ছেড়ে যাচ্ছেন? উত্তরে রাসূল সা. বললেনঃ হারুন যেমন ছিলেন মূসার, তেমনি তুমি হচ্ছো আমার প্রতিনিধি।

তবে আমার পরে কোন নবী নেই। (তাবাকাতঃ /২৪)

 

তৃতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar