’আলী ইবন আবী তালিব (রা)— ৩য় অংশ

 

নবম হিজরীতে মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে প্রথম ইসলামী হজ্জ্ব অনুষ্ঠিত হয়।

এ বছর হযরত সিদ্দীকে আকবর রা. ছিলেন ’আমীরুল হজ্জ্ব।

তবে কাফিরদের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি বাতিল ঘোষণার জন্য রাসূল সা. আলীকে রা. বিশেষ দূত হিসেবে পাঠান।

দশম হিজরীতে ইয়ামনে ইসলাম প্রচারের জন্য হযরত খালিদ সাইফুল্লাহকে পাঠানো হয়।

ছ’মাস চেষ্টার পরও তিনি সফলকাম হতে পারলেন না। ফিরে এলেন। রাসূলে করীম সা. আলীকে রা. পাঠানোর কথা ঘোষণা করলেন। আলী রা. রাসূলুল্লাহর সা. কাছে উপস্থিত হয়ে বললেনঃ আপনি আমাকে এমন লোকদের কাছে পাঠাচ্ছেন যেখানে নতুন নতুন ঘটনা ঘটবে অথচ বিচার ক্ষেত্রে আমার কোন অভিজ্ঞতা নেই। উত্তরে রাসূল সা. বললেনঃ আল্লাহ তোমাকে সঠিক রায় এবং তোমার অন্তরে শক্তিদান করবেন।

তিনি আলীর রা. মুখে হাত রাখলেন। আলী বলেনঃ ‘অতঃপর আমি কক্ষনো কোন বিচারে দ্বিধাগ্রস্ত হইনি।’ যাওয়ার আগে রাসূল সা. নিজ হাতে আলীর রা. মাথায় পাগড়ী পরিয়ে দুআ করেন। আলী ইয়ামনে পৌঁছে তাবলীগ শুরু করেন।

অল্প কিছুদিনের মধ্যে সকল ইযামনবাসী ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং হামাদান গোত্রের সকলেই মুসলমান হয়ে যায়।

রাসূল সা. আলীকে রা. দেখার জন্য উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েন।

তিনি দুআ করেনঃ আল্লাহ, আলীকে না দেখে যেন আমার মৃত্যু না হয়।

হযরত আলী বিদায় হজ্জের সময় ইয়ামন থেকে হাজির হয়ে যান।

রাসূলুল্লাহর সা. ওফাতের পর তাঁর নিকট-আত্মীয়রাই কাফন-দাফনের দায়িত্ব পালন করেন।

হযরত আলী রা. গোসল দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন।

মুহাজির ও আনসাররা তখন দরজার বাইরে অপেক্ষা করছিলেন।

হযরত আবু বকর, হযরত উমার ও হযরত উসমানের রা. খিলাফত মেনে নিয়ে তাঁদের হাতে বাইয়াত করেন এবং তাঁদের যুগের সকল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শরীক থাকেন। অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতেও হযরত উসমানকে পরামর্শ দিয়েছেন।

যেভাবে আবু বকরকে ‘সিদ্দীক’, উমারকে ‘ফারুক’ এবং উসমানকে ‘গণী’ বলা হয়, তেমনিভাবে তাঁকেও ‘আলী মুরতাজা’ বলা হয়। হযরত আবু বকর ও উমারের যুগে তিনি মন্ত্রী ও উপদেষ্টার ভূমিকা পালন করেন। হযরত ’উসমানও সব সময় তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। (মরুজুজ জাহাবঃ /)

বিদ্রোহীদের দ্বারা হযরত উসমান ঘেরাও হলে তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে আলীই রা. সবচেয়ে বেশী ভূমিকা পালন করেন। সেই ঘেরাও অবস্থায় হযরত উসমানের রা. বাড়ীর নিরাপত্তার জন্য তিনি তাঁর দুই পুত্র হাসান ও হুসাইনকে রা. নিয়োগ করেন (আলফিত্নাতুল কুবরাঃ . ত্বাহা হুসাইন)

হযরত উমার রা. ইনতিকালের পূর্বে ছ’জন বিশিষ্ট সাহাবীর নাম উল্লেখ করে তাঁদের মধ্য থেকে কাউকে পরবর্তী খলীফা নির্বাচনের অসীয়াত করে যান। আলীও ছিলেন তাঁদের একজন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি আলীর রা. সম্পর্কে মন্তব্য করেনঃ লোকেরা যদি আলীকে খলীফা বানায়, তবে সে তাদেরকে ঠিক রাস্তায় পরিচালিত করতে পারবে। (আলফিত্নাতুল কুবরা) হযরত ‘উমার তাঁর বাইতুল মাকদাস’ সফরের সময় আলীকে রা. মদীনায় নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান।

হযরত ’উসমানের রা. শাহাদাতের পর বিদ্রোহীরা হযরত তালহা, যুবাইর ও আলীকে রা. খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য চাপ দেয়। প্রত্যেকেই অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানান। বিভিন্ন বর্ণনার মাধ্যমে জানা যায়, হযরত আলী রা. বার বার এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে থাকেন। অবশেষে মদীনাবাসীরা হযরত আলীর রা. কাছে গিয়ে বলেন, খিলাফতের এ পদ এভাবে শূণ্য থাকতে পারে না।

বর্তমানে এ পদের জন্য আপনার চেয়ে অধিক উপযুক্ত ব্যক্তি নেই। আপনিই এর হকদার। মানুষের পীড়াপীড়িতে শেষ পর্যন্ত তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হন। তবে শর্ত আরোপ করেন যে, আমার বাইয়াত গোপনে হতে পারবে না।

এজন্য সর্বশ্রেণীর মুসলমানের সম্মতি প্রয়োজন। মসজিদে নববীতে সাধারণ সভা হলো।

মাত্র ষোল অথবা সতেরো জন সাহাবা ছাড়া সকল মুহাজির ও আনসার আলীর রা. হাতে বাইয়াত করেন।

অত্যন্ত জটিল এক পরিস্থিতির মধ্যে হযরত আলীর রা. খিলাফতের সূচনা হয়।

খলীফা হওয়ার পর তাঁর প্রথম কাজ ছিল হযরত উসমানের রা. হত্যাকারীদের শাস্তি বিধান করা।

কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। প্রথমতঃ হত্যাকারীদের কেউ চিনতে পারেনি। হযরত উসমানের স্ত্রী হযরত নায়িলা হত্যাকারীদের দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি তাদের কাউকে চিনতে পারেননি। মুহাম্মাদ বিন আব আবু বকর হত্যার উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন।

কিন্তু হযরত উসমানের এক ক্ষোভ-উক্তির মুখে তিনি পিছটান দেন। মুহাম্মাদ বিন আবু বকরও হত্যাকারীদের চিনতে পারেননি। দ্বিতীয়তঃ মদিনা তখন হাজার হাজার বিদ্রোহীদের কব্জায়। তারা হযরত আলীর রা. সেনাবাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়েছে।

কিন্তু তাঁর এই অসহায় অবস্থা তৎকালীন অনেক মুসলমানই উপলব্ধি করেননি।

তাঁরা হযরত আলী রা. নিকট তক্ষুনি হযরত উসমানের রা. ‘কিসাস’ দাবী করেন। এই দাবী উত্থাপনকারীদের মধ্যে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়িশা রা. সহ তাল্‌হা ও যুবাইরের রা. মত বিশিষ্ট সাহাবীরাও ছিলেন। তাঁরা হযরত আয়িশার রা. নেতৃত্বে সেনাবাহিনী সহ মক্কা থেকে বসরার দিকে যাত্রা করেন। সেখানে তাঁদের সমর্থকদের সংখ্যা ছিল বেশী।

আলীও রা. তাঁর বাহিনীসহ সেখানে পৌঁছেন। বসরার উপকণ্ঠে বিরোধী দুই বাহিনী মুখোমুখি হয়। হযরত আয়িশা রা. আলীর রা. কাছে তাঁর দাবী পেশ করেন। আলীও রা. তাঁর সমস্যাসমূহ তুলে ধরেন। যেহেতু উভয় পক্ষেই ছিল সততা ও নিষ্ঠা তাই নিষ্পত্তি হয়ে যায়। হযরত তালহা ও যুবাইর ফিরে চললেন। আয়িশাও ফেরার প্রস্তুতি শুরু করলেন।

কিন্তু হাংগামা ও অশান্তি সৃষ্টিকারীরা উভয় বাহিনীতেই ছিল। তাই আপোষ মীমাংসায় তারা ভীত হয়ে পড়ে। তারা সুপরিকল্পিতভাবে রাতের অন্ধকারে এক পক্ষ অন্য পক্ষের শিবিরে হামলা চালিয়ে দেয়। ফল এই দাঁড়ায়, উভয় পক্ষের মনে এই ধারণা জন্মালো যে, আপোষ মীমাংসার নামে ধোঁকা দিয়ে প্রতিপক্ষ তাঁদের ওপর হামলা করে বসেছে।

পরিপূর্ণ যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আলীর রা. জয় হয়।

তিনি বিষয়টি হযরত আয়িশাকে রা. বুঝাতে সক্ষম হন।

আয়িশা রা. বসরা থেকে মদীনায় ফিরে যান।

চতুর্থ অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar