আলোর আবাবিল।।২য় অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

তারপর আবার কাঁদতে শুরু করলেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন শাদ্দাদ।
তাঁর কান্না দেখে উবাদা ইবনে নাসী কাঁদছেন।
আপনি কাঁদছেন কেন? শাদ্দাদ জিজ্ঞেস করলেন । নাসী বললেন, আপনার কান্না দেখে আমারও কান্না পাচ্ছে। কিন্তু আপনিই বা কাঁদছেন কেন?
শাদ্দাদ কম্পিত কণ্ঠে বললেন, কাঁদছি- কারণ, রাসুল (সা)-এর একটি হাদীস আমার মনে পড়ছে।
হাদীসটি কী? জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
শাদ্দাদ বললেন, হাদীসটি হলো: রাসুল (সা) বলেছৈন,
‘আমার সবচেয়ে বেশি ভয় হয় আমার উম্মতের প্রবৃত্তির গোপন কামনা-বাসনার পূজারী হওয়া এবং শিরকে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে।’
রাসূল (সা)-এর কথা শুনে জিজ্ঞেস করলাম, আপনার উম্মত কি মুশরিক হয়ে যাবে?
রাসূল বললেন, হ্যাঁ। তবে তারা চন্দ্র-সূর্যকে পূজা করবে না। পূজা করবে না মূর্তি, পাথর বা অন্য কোনো বস্তুরও। বস্তুত তারা পূজা করবে রিয়া এবং প্রবৃত্তির। সকল রোযা রাখবে। কিন্তু যখন তার প্রবৃত্তি চাইবে, আর সাথে সাথে নিঃসঙ্কোচে তখন তা ভেঙ্গে ফেলবে।
কী নিদারুণ পরিতাপের বিষয় বলূন! সেই জন্যই আমি কাঁদছি। বললেন শাদ্দাদ।
এমনি তাকওয়ার অধিকারী ছিলেন শাদ্দাদ। আল্লাহর প্রতি ছিল তাঁর এমনি ভয়, ঈমান আর মুসলমানদের প্রতি ছিল তাঁর এমনি অপরিসীম ভালোবাসা।
রাসূল (সা) বসে আছেন।
তাঁর চারপাশে ঘিরে আছে আলোর পরশ।
এমন সময় সেখানে উপস্থিত হলেন শাদ্দাদ।
এ কি!
এ কেমন চেহারা শাদ্দাদের?
সারা চেহারায় বিষণ্ণতার কালো ছাপ!
চোখে-মুখে মেঘের আস্তরণ!
চোখ দু’টো ভারাক্রান্ত।
বিমর্ষতায় ছেয়ে আছে শাদ্দাদ।
অবাক হলেন দয়ার নবীজী (সা)। জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ? নাকি অন্য কিছু?
শাদ্দাদের কণ্ঠটি ধরে এলো।
বলরেণ, ইয়া রাসুলুল্লাহ! মনে হচ্ছে- মনে হচ্ছে আমার জন্যে পৃথিবীটা সঙ্কীর্ণ হয়ে যাচ্ছে!
হাসলেন রাসূলুল্লাহ (সা)।
বললেন, না। তোমার জন্যে পৃথিবী সঙ্কীর্ণ হবে না কখনো। নিশ্চিন্তে থাকতে পার তুমি। জেনে রেখ, একদিন বিজিত হবে শাম এবং বাইতুল মাকদাস। আর সেদিন, সেদিন তুমি এবং তোমার সন্তানরা হবে সেখানকার ইমাম।
রাসূল (সা)-এর ভবিষ্যদ্বাণী।
সত্যি তো হতেই হবে।
সত্যিই শাম এবং বাইতুল মাকদাস একদিন বিজিত হলো। আর শাদ্দাদই হলেন সেখানকার নেতা।
তিনি সেখানে সপরিবারে বসতি স্থাপন করলেন।
কেমন ছিল তার তাকওয়া আর পরহেজগারি?
সে এক অনুকরীণয় ইতিহসই বটে!
একবার একদল মুজাহিদ যাচ্ছেন জিহাদের ময়দানে।
তাদেরকে বিদায় জানাচ্ছেন শাদ্দা।
যাবার সময় হলে মুজাহিদরা খাবার জন্যে আহ্বান জানালেন তাকে।
সবিনয়ে শাদ্দাদ বললেন, রাসুল (সা)-এর হাতে বাইয়াতের পর থেকে খাবারটি কোথা থেকে এলো তা না জেনে খাবার অভ্যাস থাকলে অবশ্যই আজ তোমাদের সাথে খেতাম। কিছু মনে নিও না ভাই! তোমরা খাও।
এমন ছিল শাদ্দাদের আল্লাহভীতি।
এমনি ছিল তাঁর দীনদারি।
তিনি বলতেন, কল্যাণের সবকিছুই জান্নাতের। আর অকল্যাণের সবকিছুই জাহান্নামের। এই দুনিয়া একটি উপস্থিত ভোগের বস্তু। সৎ এবং অসৎ সবাই তো ভোগ করে। কিন্তু আখেরাত হচ্ছে সত্য অঙ্গীকার। যেখানে রাজত্ব করেন এক মহাপরাক্রমশালী রাজা। অর্থাৎ মহান রাব্বুল আলামীন। প্রত্যেকেরই আছে সন্তানাদি। তোমরা আখেরাতের সন্তান হও। দুনিয়ার সন্তান হয়ো না।
কী চমৎকার কথা!
শাদ্দাদের মত সোনার মানুষ, খাঁটি মানুষই কেবল বলতে পারেন এমন সোনার চেয়ে দামি কথা।
শাদ্দাদ ছিলেন যেমন খোদাভীরু, তেমনি ছিলেন সাহসী।
তাঁ সাহসের অনেক উপমা আছে।
আছে আগুনঝরা ইতিহাস।
হযরত মুয়াবিয়া (রা) তখন শাসনকর্তা। কী তার দাপট আর ক্ষমতা। একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন শাদ্দাদকে।
আচ্ছা, বলুন তো আমি ভালো, নাকি হযরত আলী? আমাদের দু’জনের মধ্যে আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে?
স্পষ্টভাষী শাদ্দাদ।
তিনি অকপটে বললেন, আলী (রা) আপনার আগে হিজরত করেছন। তিনি রাসূল (সা)-এর সাথে অনেক বেশি ভালো কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন আপনার চেয়ে বেশি সাহসী। তাঁর ছিল আপনার চেয়ে অনেক বেশি উদার ও প্রস্ত একটি হৃদয়। আর ভালোবাসার কথা বলছেন? আলী চলে গেছেন। তিনি আর আমাদের মাঝে নেই। সুতরাং মানুষ আজ আপনার কাছে তো বেশি কিছু অবশ্যই আশা করে।
এই ছিল শাদ্দাদের সততা। এই ছিল তার সত্যবাদিতা এবং অমলিন জীবন।
ছিল সাগরের মত বিশাল আর আকাশের মত প্রশস্ত একটি হৃদয়। ছিলেন অসীম সাহসী আর ঈমানের ওপর পর্বতের মত অবিচল।
কেন হবেন না?
তিনি তো ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মহান নেতা-প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)- এরই একান্ত স্নেহ আর ভালোবাসায় সিক্ত।
তিনি তো ছিলেন সত্যের সৈনিক, বেহেশতের আবাবিল।

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar