উসমান ইবন আফফান (রাঃ) এর জীবনী

নাম উমসান, কুনিয়াত আবু আমর, আবু আবদিল্লাহ, আবু লায়লা এবং লকব যুন-নূরাইন । (তাবাকাত ৩/৫৩) পিতা আফফান, মাতা আরওয়া বিনতে কুরাইশ । কুরাইশ বংশের উমাইয়্যা শাখার সন্তান । তাঁর উর্ধ পুরুষ আবদে মান্নাফে গিয়ে রাসূল (সাঃ) এর নসবের সাথে তাঁর নসব মিলিত হয়েছে । খুলাফায়ে রাশেদার তৃতীয় খলীফা । তাঁর নানী বায়দা বিন্তু আবদিল মুত্তলিব রাসূল (সাঃ) ফুফু । জন্ম হস্তীসনের ছ’বছর পরে ৫৭৬ খৃষ্টাব্দে । (আল-ইসতিয়াব) এ হিসাবে রাসূলে কারীম (সাঃ) থেকে তিনি ছয় বছর ছোট । তবে তাঁর জন্মসন সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে । ফলে শাহাদাতের সময় তাঁর বয়স কত ছিল সে সম্পর্কে অনুরূপ মত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় । কোন কোন বর্ণনা মতে, তাঁর জন্ম হয় তায়েফে । (ফিতনাতুল কুবরা, ডঃ তোহা হুসাইন)

হযরত উসমান (রাঃ) ছিলেন মধ্যমাকৃতির সুঠাম দেহের অধিকারী । মাংসহীন গন্ডদেশ, ঘন দাড়ি, উজ্জল ফর্সা, ঘন কেশ, বুক ও কোমর চওরা, কান পর্যন্ত ঝোলানো যুলফী, পায়ের নলা মোটা, পশম ভরা লম্বা বাহু, মুখে বসন্তের দাগ, মেহেদী রঙ্গের দাড়ি এবং স্বর্ণখচিত দাঁত ।

হযরত উসমানের জীবনের প্রাথমিক অবস্থা অন্যান্য সাহাবীর মত জাহিলী যুগের অন্ধকারেই রয়ে গেছে । তাঁর ইসলামপূর্ব জীবন এমনভাবে বিলীন হয়েছে যেন ইসলামের সাথেই তাঁর জন্ম । ইসলাম পূর্ব জীবনের বিশেষ কোন তথ্য ঐতিহাসিকরা আমাদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি ।

হযরত উসমান ছিলেন কুরাইশ বংশের অন্যতম কুষ্টিবিদ্যা বিশারদ । কুরাইশদের প্রাচীন ইতিহাসেও ছিল তাঁর গভীর জ্ঞান । তাঁর প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, সৌজন্য ও লৌকিকতাবোধ ইত্যাদি গুনাবলীর জন্য সব সময় তাঁর পাশে মানুষের ভীড় জমে থাকতো । জাহিলী যুগেও কোন অপকর্ম তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি । লজ্জা ও প্রখর আত্মমর্যাদাবোধ ছিল তাঁর মহান চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট । যৌবনে তিনি অন্যান্য অভিজাত কুরাইশদের মত ব্যবসা শুরু করেন । সীমাহিন সততা ও বিশ্বস্ততার গুনে ব্যবসায়ে অসাধারণ সাফল্য লাভ করেন । মক্কার সমাজে একজন বিশিষ্ট ধণী ব্যবসায়ী হিসাবে ‘গনী’ উপাধি লাভ করেন ।

হযরত উসমানকে ‘আস-সাবেকুনাল আওয়ালুন’, ‘আশারায়ে মুবাশশরা’ এবং সেই ছয় জন শ্রেষ্ঠ সাহাবীর মধ্যে গণ্য করা হয় যাঁদের প্রতি রাসূলে করীম (সাঃ) আমরণ খুশী ছিলেন । আবু বকর সিদ্দীকের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল । তাঁরই তাবলীগ ও উৎসাহে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন । মক্কার আরো অনেক নেতৃবৃন্দের আচরণের বিপরীত হযরত উসমান রাসুল (সাঃ) নবুওয়াতের সূচনা পর্বেই তার দাওয়াতে সাড়া দেন এবং আজীবন জান-মাল ও সহায় সম্পত্তি দ্বারা মুসলমানদের কল্যাণব্রতী ছিলেন । হযরত উসমান (রাঃ) বলেনঃ ‘আমি ইসলাম গ্রহণকারী চারজনের মধ্যে চতুর্থ’ । ইবন ইসহাকের মতে, আবু বকর, আলী এবং যায়িদ বিন হারিসের পরে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি হযরত উসমান ।

হযরত উসমানের ইসলাম গ্রহণের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সীরাত লেখক ও মুহাদ্দীসগণ যেসব বর্ণনা দিয়েছেন তার সারকথা নিম্নরূপঃ

কেউ কেউ বলেন, তাঁর খালা সু’দা ছিলেন সে যুগের একজন বিশিষ্ট ‘কাহিন’ বা ভবিশ্যদ্বক্তা । তিনি নবী করীম (সাঃ) সম্পর্কে উসমানকে কিছু কথা বলেন এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনার জন্য উৎসাহ দেন । তারই উৎসাহে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন । (আল ফিতনাতুল কুবরা) পক্ষান্তরে ইবন সা’দ সহ আরো অনেকে বর্ণনা করেনঃ হযরত উসমান সিরিয়া সফরে ছিলেন । যখন তিনি ‘মুয়ান ও যারকার’ মধ্যবর্তী স্থানে বিশ্রাম করছিলেন তখন তন্দ্রালু অবস্থায় এক আহবানকারীকে বলতে শুনলেন, ওহে ঘুমন্ত ব্যক্তিরা, তাড়াতাড়ি কর । আহমেদ নামের রাসূল মক্কায় আত্মপ্রকাশ করেছেন । মক্কায় ফিরে এসে শুনতে পেলেন ব্যাপারটি সত্য । অতঃপর আবু বকরের আহবানে ইসলাম গ্রহণ করেন । (তাবাকাতঃ ৩/৫৫)

হযরত উসমান যখন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তখন তাঁর বয়স তিরিশের উপরে । ইসলাম র্পূব যুগেও আবু বকরের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল । প্রায় প্রতিদিনই আবু বকরের বাড়ীতে যাতায়াত ছিল । একদিন হযরত আবু বকর (রাঃ) তাঁর সামনে ইসলাম পেশ করলেন । ঘটনাক্রমে রাসূল (সাঃ) ও তখন সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন । তিনি বললেনঃ উসমান, জান্নাতের প্রবেশকে মেনে নাও । আমি তোমাদের এবং আল্লাহর সকল মাখলুকের প্রতি তাঁর রাসূল হিসেবে এসেছি । একথা শুনার সাথে সাথে তিনি ইসলাম কবুল করেন । হযরত উসমানের ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর খালা সু’দা তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে একটি কাসীদা রচনা করেছিলেন ।

হযরত উসমানের সহোদর আমীনা, বৈপিত্রীয় ভাই বোন ওয়ালীদ, খালিদ, আম্মারা, উম্মে কুলসুম সবাই মুসলমান হয়েছিলেন । তাঁদের পিতা উকবা ইবন আবী মুয়ীত ।দারু কুতনী বর্ণনা করেছেন, উম্মে কুলসুম প্রথম পর্বের একজন মুহাজির । বলা হয়েছে তিনিই প্রথম কুরাইশ বধূ যিনি রাসূল (সাঃ) হাতে বাইয়াত করেন । হযরত উসমানের অন্য ভাই-বোন মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন ।

ইসলাম গ্রহণের পর কুরাইশদের একজন সম্মানিত ব্যক্তি হওয়া সত্বেও তাঁকে ইসলামের শত্রুদের লাঞ্ছনা শিকার হতে হয় । তাঁর চাচা হাকাম ইবন আবিল আস তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে বেদম মার দিত । সে বলতো, একটা নতুন ধর্ম গ্রহণ করে তুমি আমাদের বাপ-দাদার মুখে কালি দিয়েছ । এ ধর্ম ত্যাগ না করা পর্যন্ত তোমাকে ছাড়া হবে না । এতে হযরত উসমানের ঈমান একটুও টলেনি । তিনি বলতেনঃ তোমাদের যা ইচ্ছে কর, এ দ্বীন আমি কক্ষণো ছাড়তে পারবো না । (তাবাকাতঃ ৩/৫৫)

হযরত উসমান ইসলাম গ্রহণের পর রাসুল (সাঃ) নিজ কণ্যার ‘রুকাইয়্যাকে’ তাঁর সাথে বিয়ে দেন । হিজরী দ্বিতীয় সনে মদীনায় রুকাইয়্যার ইন্তিকাল হলে রাসূল (সাঃ) তার দ্বিতীয় কন্যা উম্মে কুলসুমকে তাঁর সাথে বিয়ে দেন । এ কারণে তিনি ‘যুন-নূরাইন’ বা দুই জ্যোতির অধিকারী উপাধি লাভ করেন ।

রুকাইয়্যা ছিলেন হযরত খাদীজার (রাঃ) গর্ভজাত সন্তান । তাঁর প্রথম শাদী হয় উতবা ইবনে আবু লাহাবের সাথে এবং উম্মে কুলসুমের শাদী হয় আবু লাহাবের দ্বিতীয় পুত্র উতাইবার সাথে । আবু লাহাব ছিল আল্লাহর নবীর কট্টর দুশমন । পবিত্র কুরআনের সূরা লাহাব নাযিলের পর আবু লাহাব ও তার স্ত্রী উম্মে জামীল (হাম্মা লাতাল হাতাব) তাদের পুত্রদ্বয়কে নির্দেশ দিল মুহাম্মদের কন্যাদ্বয়ের তালাক দেওয়ার জন্য । তারা তালাক দিল । অবশ্য ইমাম সুয়ূতী মনে করেন, ইসলাম গ্রহণের পূর্বেই রুকাইয়্যার সাথে উসমানের শাদী হয় । উপরোক্ত ঘটনার আলোকে সুয়ূতীর মতটি গ্রহণযোগ্যে মনে হয় না ।

নবুওয়াতের পঞ্চম বছরের মক্কার মুশরিকদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথম যে দলটি হাবশায় হিজরাত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে উসমান ও তারঁ স্ত্রী রুকাইয়্যা ছিলেন । হযরত আনাস (রাঃ) বলেনঃ ‘হাবশায় মাটিতে প্রথম হিজরাতকারী উসমান ও তাঁর স্ত্রী নবী দুহিতা রুকাইয়্যা ।’ রাসূল (সাঃ) দীর্ঘদিন তাঁদের দু’জনের কুশল জিজ্ঞেস করেন । সে সংবাদ দেয়, ‘আমি দেখেছি, রুকাইয়্যা গাধার ওপর সওয়ার হয়ে আছে এবং উসমান গাধাটি তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে । রাসূল (সাঃ) তাঁর জন্য দু’আ করেন আল্লাহ তার সহায় হোন । লূতের (আঃ) পর উসমান আল্লাহর রাস্তায় পরিবার পরিজনসহ প্রথম হিজরতকারী ।(আল-ইসাবা) হাবশা অবস্থানকালে তাঁদের সন্তান আব্দুল্লাহ জন্মগ্রহন করে এবং এ ছেলের নাম অনুসারে তাঁর কুনিয়াত হয় আবু আবদুল্লাহ । হিজরী ৪র্থ সনে আব্দুল্লাহ মারা যান । রুকাইয়্যার সাথে তাঁর দাম্পত্য জীবন খুব সুখের হয়েছিল । লোকেরা বলাবলি করতো কেউ যদি সর্বোত্তম জুটি দেখতে চায়, সে যেন উসমান ও রুকাইয়্যাকে দেখে ।

হযরতউসমান বেশকিছুদিন হাবশায় অবস্থানকরেন।অতঃপর মক্কায়ফিরে আসেন এই গুজব শুনে যে, মক্কায় নেতৃবৃন্দ ইসলাম গ্রহন করেছে।রাসূল্লাহর (সাঃ) মদীনায় হিজরাতের পর আবার তিনি মদীনায় হিজরাত করেন এভাবে তিনি ‘যুলহিজরাতাইন’- দুই হিজরাতের অধিকারী হন।

You may also like...

Skip to toolbar