কা’ব ইবন মালিক (রা) ।। ১ম অংশ

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

কা’ব (রা) ইতিহাসের সেই তিন ব্যক্তির একজন যাঁরা আলস্যবশতঃ তাবুক যুদ্ধে যোগদানত থেকে বিরত থাকেন এবং আল্লাহ, আল্লাহর রাসূল (সা) ও মুমিনদের বিরাগভাজনে পরিণত হন। অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁদের তাওবা কবুলের সুসংবাদ দিয়ে আয়াত নাযিল কারেন।১ হিজরতের ২৫ বছর পূর্বে ৫৯৮ খ্রীষ্টাব্দে তিনি ইয়াসরিবে জন্ম গ্রহণ করেন।২ তাঁর আনেকগুলো কুনিয়াতবা ডাক নাম ইতিহাসে ও সীরাত গ্রন্থেসমূহে বূর্ণিত রয়েছে। যথাঃ আবু ‘আবদুল্লাহ, আবু আবদির রহমান, আবু মুহাম্মাদ ও আবু বাশীর।৩ ইবনে হাজারের একটি বর্ণনায় জানা যায়, জন্মের পর তাঁর পিতা মালিক ইবন আবী কাব আমর ছেলের ডাকনাম রাখেন আবু বাশীর। ইসলাম গ্রহনের পর রাসূলে কারীম (সা) রাখেন আবু আবদিল্লাহ। তিনি পিতা- মাতার একমাত্র সন্তান।৪ মাতার নাম লায়লা বিনতু যায়িদ। পিতামাতা উভয়ে মদীনার খায়রাজ গোত্রের বনু সালিমা শাখার সন্তান।৫ তিনি একজন আকাবী ও উহুদী সাহাবী। ইবন আবী হাতেম বলেনঃ তিনি ছিলেন আহলুস সুফ্ফাহরও আন্যতম সদস্য।৬ পচিঁশ বছর বয়সে গোত্রীয় লোকদের সাথে বাই’য়াতে আকাবায় শরীক হন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।৭

ইবনুল আসীর বলেনঃ প্রায় সকল সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতে, কাব আকাবার শেষ বাই’য়াতে শরীক ছিলেন।৮ উরওয়া সেই সত্তর জনের মধ্যে তাঁর নামটি উল্লেখ করেছেন যাঁরা আকাবায় অংশ গ্রহন করে ছিলেন।৯ বুখারী ও মুসলিমে এসেছে কা’ব বলেছেনঃ আমি বাইয়াতে আকাবায় রাসূলুল্লাহর (সা) সংগে উপস্থিত ছিলাম। আমরা ইসলামের ওপর অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলাম। তবে অপর একটি বর্ণনায় এসেছে। তিনি বলেন, আমি লায়লাতুল আকাবায় বাইয়াত থেকে বঞ্চিত হই।১০

কা’ব ইবন মালিক যে আকাবার শেষ বাইয়াতে শরীক ছিলেন তা ইবন ইসহাকের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে জানা যায়। এ বাইয়াতে বিস্তারিত বিবারণ কা’ব দিয়েছেন এবং বিভিন্ন প্রাচীন গ্রন্থে তা বর্ণিত হয়েছে। সীরাতু ইবন হিশামে কাবের জবানীতে তা হুবহু এসেছে সংক্ষেপে তার কিছু এখানে তুলে ধারা হলো।

ইবন ইসহাক কা’ব এর ছেলে আবদুল্লাহ ও মা’বাদ এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। কা’ব মদীনা থেকে স্বগোত্রীয় পৌত্তলিক হাজীদর একটি কাফেলার সাথে মাক্কার উদ্দেশ্যে বের হন। এ কাফেলার সাথে পূবেই ইসলামের গ্রহণকারী কিছু মুসলামনও ছিলেন। তারা দ্বীন ও বুঝেছিলেন এবং নামায পড়তেন। এ কাফেলার তাঁদের বয়োজ্যেষ্ট নেতা আলÑবারা ইবন মারুর ও ছিলেন। চলার পথে তিনি একদিন বললেনঃ আমি আর এই কা’বার দিকে পিঠ করে নামায পড়তে চাইনে। এখানে থেকে কা’বার মুখ করেই নামায পড়বো। কা’ব ও অন্যরা তাঁর একথায় আপত্তি জানিয়ে বললেন, আমাদের নবী (সা) তো শামের বায়তুল মাকাদাসের দিকে মুখ করে নামায আদায়  করতে থাকেন। তাঁর বিরোধীতা হয় আমরা এমনভাবে নামায পড়তে  চাইনা। এর পরও আল-বারা তাঁর মতে অটল থাকলেন।

পথে নামাযের সময় হলে আল-বারা কাবার দিকে, কা’বও অন্যরা শামের দিকে মুখ করে নামায আদায় করতে মক্কায় পৌঁছালেন। তাঁরা আল-বারা কে তাঁর এ কাজের জন্য তিরস্কার করেন। কিন্তু তাতে কোন কাজ হলোনা, তিনি স্বীয় মতে আনড় থাকলেন।

মক্কায় পৌঁছালে আল-বারা’কা’বার দিকে, কাব’ কে বললেনঃ তুমি আমাকে একটু রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট নিয়ে চলো। আসার পথে আমি যে কাজ করেছি সে ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেসা করতে চাই। তোমাদের বিরোধিতা করে আমার মনটা ভালো যাচ্ছে না। কা’বকে তাঁকে সংগে করে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে চললেন। দুইজনের কেউই এর আগে রাসূলুল্লাহকে (সা) চিনত না এবং দেখেননি। পথে মাক্কার দুই ব্যক্তির সাথে তাঁদের দেখা হলো। তাঁরা রাসূলুল্লাহর (সা) অবস্থান সম্পর্কে জানাতে চাইলেন। তাঁরা বললোঃ আপনারা কি তাঁকে চেনেন? কা’ব ও আল-বারা জবাব দিলেনঃ না। তারা প্রশ্ন করলোঃ তাঁরা চাচা আব্বাসকে চেনেন? তাঁরা জবাব দিলোঃ হ্যাঁ, আব্বাস চিনি। ব্যবসা উপলক্ষে তিনি আমাদের ওখানে য়াতয়াত করন। তখন তারা বললোঃ আপনারা মাসজিদে ঢুকে দেখবেন আব্বাসের সাথে একটি লোক বসে আছেন। তিনি সেই ব্যক্তি।

কা’বও আল-বারা লোক দুইটির কথামত মসজিদে হারামে ঢুকে আব্বাসকে এবং তাঁর পাশে রাসূলুল্লাহর (সা) বসা দেখতে পেলেন। সালাম দিয়ে তাঁদের পাশে পড়লেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আব্বাস কে বললেনঃ আবুল ফাদল! আপনি কি এ দুই ব্যক্তিকে চেনেন? আব্বাস বললেনঃ হাঁ ইনি আল-বারা ইবন মারুফ। তাঁর সম্প্রদায়ের নেতা। আর ইনি কা’ব ইবন মালিক। কা’ব বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সেই প্রশ্নবোধক শব্দটি আজও ভুলিনি- কবি? অথ্যাৎ রাসূলু (সা) আব্বাসকে প্রশ্ন করেনঃ একি সেই কবি কা’ব ইবন মালিক? আব্বাস জবাব দেনঃ হ্যঁ, ইন সেই কবি কা’ব। এরপর কা’ব বর্ণনা করেছেন, কিভাবে কেমন করে রাসূলুল্লাহর (সা) সাক্ষাৎ হলো এবং কোন কথার ওপর তাঁরা তার বাইয়াত করলেন।১১ রাসূল (সা)যে বারোজন নাকীব মনোনিত করেন, কা’ব একটি কবিতায় তাঁদের পরিচয়ও ধরে রেখেছেন।ইবন হিশাম সে কবিতাটিও বর্ননা করেছেন।১২

রাসূলে করীম (সা) মদীনায় এসে আনসার ও মাহাজিরদের মধ্যে দ্বীনী মুওয়াখাত বা ভ্রাতৃ সম্পর্খে প্রতিষ্টা করেন। আশারা মুবাশ্শারার সদস্য তালহা ইবন উবাইদুল্লাহর (রা) সাথে কা’বের এ সম্পর্কে প্রতিষ্টা হয়। একথা  ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন।১৩ তবে উরওয়া থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে (সা) যুবাইর ও কাবের মধ্যে ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্টা করে দেন।১৪ উহুদের দিন কা‘ব আহত হলে যুবাইর তাঁকে মুমূর্ষে অবস্থায় কাঁধে বহন করে নিয়ে আসেণ। সেদিন কা’ব মারা গেলে যুবাইর হতেন তাঁর উত্তরাধিকারী পরবর্তীকালে সূরা আল আনফারের ৭৫ নং আয়াত-‘বস্তুতঃ যারা উলুল আরহমা’ বা রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়, আল্লাহর বিধান মতে তাঁরা পরস্পর বেশী হকদার-নাযিল করে এ বিধান রহিত করা হয়।১৫

একমাত্র বদর ও তাবুক ছাড়া অন্য সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূল কারীমের (সা) সাথে অংশ গ্রহণ করেন। ইবনুল কালবীর মতে, তিনিবদর যোগদানকরেন।১৬ তবে অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞের নিকট এ মতটি স্বীকৃত হয়নি। আসল ঘটনা হলো, যে তাড়াহুড়ো ও দ্রুততার সাথে বদর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি সম্পন্ন হয় তাতে অনেকের মত কা’বও অংশ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত থাকেন। এ কারণে রাসূল (সা) কাউকে কিছুই বলেননি।

কা’ব বলেন: তাবুক পর্যন্ত একমাত্র বদর ছাড়া সকল যুদ্ধের আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশ গ্রহণ করেছি।ক্ষদরে যাঁরা যাননি, রাসূল (সা) তাঁদেরকে কোন প্রকার তিরস্কার করেননি। মূলতঃ রাসূল (সা) মদীনা থেকে বের হন আবু সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফিলার উদ্দেশ্যে। আর এদিকে কুরাইশরা মক্কা থেকে বেরিয়ে পড়ে আবূ সুফইয়ানের মুখোমুখিী হয় কোন রকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই। কা’ব আরও বলেন, বদর রাসূলুল্লাহর (সা) জীভনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বলে মানুষের নিটক বিবেচিত। তবে ‘লাইলাতুল ’আকাবা’-যখন আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) হাতে ইসলামের ওপর বাই’য়াত (অঙ্গীকার) করেছিলাম, তার পরিবর্তে বদর আমার নিকট মোটেই প্রাধান্যযোগ্য নয়। এরপর একমাত্র তাবুক ছাড়া আর কোন যুদ্ধ থেকে পিছনে থাকিনি।

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar