কা’ব ইবন মালিক (রা) ।। ২য় অংশ

তৃতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

তবে কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় কা’ব বদরে অশং করেছেন। ইবন ইসহাক কা’বের নামটি বদরে অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় উল্লেখ করেছেন।১৮ তাছাড়া একটি বর্ণনায় এসেছে, কা’ব বলেছেন: আমিমুসলমানদের সাথে বদরে যাই। যুদ্ধ শেষে দেখলাম পৌত্তলিক যোদ্ধাদের বিকৃত লাশমুসলিম শহীদদের সাথে পড়ে আছে। আমি ক্ষণিক দাঁড়িয়ে থেকে চলে যাচ্ছি এমন সময় হঠাৎ দেখতে পেলাম একজন পৌত্তলিক অস্ত্র সজ্জিত হয়ে মুসলিম শহীদদের অতিক্রম করছে। একজন অস্ত্রসজ্জিত যোদ্ধাও যেন তার অপেক্ষা করছিল। আমি একটু এগিয়ে এ দুইজনের ভাগ্য দেখার জন্য তাদের পিছনে দাঁড়ারাম। পৌত্তলিকটি ছিল বিরাট বপুধারী। আমি তাকিয়ে থাকতেই মুসলিম নৈকিটি তার কাঁধে তরবারির এমন এক শক্ত কোপ বসিয়ে দেয় যে, তার নিতম্ব পর্যন্ত পৌঁছে তাকে দুইভাগ করে ফেলে। তারপর লোকটি মুকের বর্ম খুলে ফেলে বলেঃ কা’ব কেমন দেখলে? আমি আবূ দুজানা।১৯ তবে অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ তাঁর বদরে অনুপস্থিত থাকার বর্ণনাগুলি সঠিক বলে মনে করেছেন।

উহুদ যুদ্ধে কা’ব তাঁর দ্বীনী ভাই তালহার (রা) সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এই যুদ্ধে তিনি পরেন রাসূলুল্লাহর (সা) বর্ম এবং রাসূলুল্লাহ (সা) পরেন তাঁর বর্ম। রাসূল (সা) নিজ হাতে তাঁকে বর্ম পরিয়ে দেন। এই উহুদে তাঁর দেহে মোট এগারো স্থানে যখম হয়।২০ তবে বহু মুহাদ্দিস তাঁর দেহে সতোরোটি আঘাতের কথা বর্ণনা করেছেন।২১

এ যুদ্ধের এক পর্যায়ে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, রাসূলে কারীম (সা) শাহাদাত বরণ করেছেন। এতে সাহাবায়ে কিরামের মধ্যে ্কটো দারুণ হৈ চৈ পড়ে যায়। এ অবস্থায় কা’বই সর্বপ্রথম রাসূলকে (সা) দেখতে পান এবং গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলে ওঠেন-রাসূল (সা) এই যে, এখানে। তোমরা এদিকে এসো। কা’ব  তখন উপত্যকার মধ্যস্থলে। রাসূল (সা) তখণ তাঁর হলুদ বর্ণের বর্ম দ্বারা তাঁকে ইঙ্গিত করে চুপ থাকতে বলেন।২২

উহুদের পরে যত যুদ্ধ হয়েছে তার প্রত্যেকটিতে কা’ব (রা) দারুণ উৎসাহ ও উদ্দীপনাসহকারে যোগদান করেছেন। তবে ্ভাবতে আবাক লাগে যে, নবীর (সা) জীবনে প্রথম যুদ্ধ বদরের মত শেষ যুদ্ধ তাবুকেও তিনি যোগদান করতে ব্যর্থ হন। তাবুক ছিল রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের সর্বশেষ যুদ্ধ অভিযান। নানা কারণে একে কষ্টের যুদ্ধও বলা হয়। রাসূলুল্লাহর (সা) রীতি ছিল, যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে স্পষ্টভাবে কিচু বলতেন না। কিনউত এবার রীতি বিরুদ্ধ কাজ করলেন। এবার তিনি ঘোষণা করে দিলেন। যাতে দীর্ঘ ও কষ্টকর সফরের জন্য মুসলমানরা যথাযথ প্রস্তুতি নিতে পারে। কা’ব এই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য দুইটি উট প্রস্তুত করেন। তাঁর নিজের বর্ণনা অনুযায়ী তিনি পূর্বের কোন যুদ্ধেই এতখানি সচ্ছল ও সক্ষম ছিলেন না, যতখানি এবার ছিলেন।

এ যুদ্ধের প্রতি রাসূলুল্লাহর (সা) এতখানি গুরুত্বদান ও সতকর্তা অবলম্বনের কারণ এই ছিল যে, মূলতঃ সংঘর্ষটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের সুপার পাওয়ার প্রবল পরাক্রমশালী রোমান বাহিনীর সাথে। সাজ-সরঞ্জাম, সংখ্যা, ঐক্য ও অটুট মনোবলের দিক দিয়ে তাদের বাহিনী ছিল বিশ্বের সেরা ও শক্তিশারী বাহিনী।

নবম হিজরীর রজব মাস মুরু হয়েছে। প্রচন্ড গরমের মওসুম। রাসূল (সা) তাবুক অভিযানের প্রস্তুতি নিলেন এবং সকলকে প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশও দিলেন।২৩ সংগত ও অসংগত নানা অজুহাতে মোট তিরাশিজন (৮৩) সক্ষম মসুলমান এ যুদ্ধে গমন থেকে বিরত থাকেন। তাদের কিচু ছিল মুনাফিক (কপট মুসলমান)। কারও বাগানের ফল পাকতে শুরু করেছিল, তা ছেড়ে যেতে তার ইচ্ছা হয়নি। কেউ ভয় পেয়েছিল প্রচন্ড গরম ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার। আবার কেউ ছির অতি দরিদ্র, যার কোন বাহন ছিল না।২৪

ইবন ইসহাক বলেন: যাঁরা সন্দেহ সংশয় বশতঃ নয়; বরংয় আলস্যবশতঃ যোগদানে ব্যর্থ হন তারা মোট চার জন। কা’ব ইবন মালিক, মুরারা ইবন রাবী, হিলাল ইবন উমাইয়্যা ও আবূ খায়সামা। তবে আবূ খায়সামা একেবারে শেষ মুহূর্তে তাবুকে পৌঁছেন ও রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে মিলিত হন।২৫কারও কারও মতে প্রচন্ড গরমের কারণে তাঁরা তাবুক গমনে বিরত থাকেন।২৬ রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর বাহিনী নিয়ে তাবুকের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। কা’ব (রা) প্রতিদিনই যাওয়ার প্রস্তুতি নিতেন; কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। দ্বিধা-দ্বধ্বে তাঁর সময় বয়ে যায়। তিনি প্রতিদিনই মনে মনে বলেতেন আমি যেতে পারবো। পরক্ষণেই সিদ্ধান্ত পাল্টে যেত। যাত্রার উদ্যোগ নিয়ে আবার থেমে যেতেন। এ অবস্থায় একদিন মদীনায় খবর এলা, রাসূল (সা) তাবুক পৌঁছে গেছেন।

মদীনা ও তার আশা-পাশের সকল সক্ষম ব্যক্তি রাসূলুলÍাহর (সা) সাথে তাবুক চলে যান। কা’ব (রা) যখন মদীনা শহরে বের হতেন তখন শুধু শিশু, বৃদ্ধ ও কিচু মুনাফিক ছাড়া আর কোন মানুষের দেখা পেতেন না। লজ্জা ও অনুশোচনায় জর্জরিত হতেন। সুস্থ, সবল ও সক্সম হওয়া সত্ত্বেও কেন পিছনে থেকে গেলেন, সারাক্ষণ এই অনুশোচনার অনলে দগ্ধিভূত হতেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) সেনা বাহিনীর কোন দফতর ছিলনা। সুতরাং এত মানুষের মধ্যে কা’বারে মত একজন লোক এলো কি এলা না, তা তাঁর জানা াকার কা নয়। একমাত্র আল্লাহ পাকের ওহীই ছিল ত৭ার জানার মাধ্যম। তাবুক পৌঁছে একদিন তিনি কা’ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। কোন এক ব্যক্তি বললো, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তার এত সময় কোথায় যে সে এখানে আসবে? মু’য়াজ ইবন জাবাল কাছেই ছিলেন। তিনি প্রতিবাদের সুরে বললেন, আমরা তো তাঁর মধ্যে খারাপ কোন কিছ ুদেখিনি। একথা শুনে রাসূল (সা) চুপ থাকলেন।

রোমানদের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) কোন মারাত্মক সংঘর্ষ হলো না। উত্তর আরবের অনেক গোত্র জিযিয়ার বিনিময়ে সন্ধি করলো। রাসূল (সা) মদীনায় ফিরে এলেন। রাসূলুল্লাহর (সা) ফিরে আসার খবর কা;ব পেলেন। তাঁর অন্তরে তখন নানা রকম চিন্তার ঢেউ খেলছে। রাসূলুল্লাহর (সা) অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচার উপায় কি, সে বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন পরিবারের লোকদের কাছে। তখনও এমন চিন্তাও তাঁর মনে উদয় হলো যে, সত্য অসত্য মিলিয়ে কিছু কারণ রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে তুলে ধরবেন। কিন্তু পরক্ষণেই এ চিন্তা যেন কোথায় হাওয়া হয়ে যেত। এ করম দ্বিধা দ্বন্দ্বের এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন, কপালে যা আছে তাই হোক, কোনরকম ছল-চাতুরীর আশ্রয় তিনি নেবেন না। যা সত্য তাই বলবেন।

এর মধ্যে দলে আশি জনের মত লোক রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট উপস্থিত হয়ে যুদ্ধে না যাওয়ার জন্য আত্মাপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য রাখলো। রাসূল (সা) তাদের সকলের ওজর-আপত্তি গ্রহণযেগ্য মনে কররেন। সকলের অপরাধ ক্ষমার জন্য আল্লাহর দরবারে দু’আ করলেন এবং পুনরায় তাদের বাই’য়াত বা অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন।

কা’ব (রা) আসলেন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট। তাঁকে দেখে রাসল (সা) মৃদু হেসে বললেন: এসো। কা’ব সামনে এসে বসার পর প্রশ্ন করলেনঃ যুদ্ধে যাওনি কেন? কা’ব বললেনঃ আপনার কাছে কী আর গোপন করবো? দুনিয়ার কোন রাজা-বাদশাহ হলে নানারকম কথার জাল তৈরী করে তাকে খুশী করতাম। সে শক্তি আমার আছে।অ আমি তো একজন বাগ্মী ও তর্কবাগিশ। আমি আপনার নিকট সত্য গোপন করবো না। এতে হতে পারে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন। কিন্তু মিথ্যা বললে এ মুহূর্তে আপনি খুশী হয়ে যাবেন। তবে আল্লাহ আপনাকে আমার ব্যাপারে নাখোশ করে দেবেন। আর তা আমার জন্য মোটেই সুখকর নয়। মূলতঃ আমার না যাওয়ার কোনকারণ ছিল না। আমি ছিলাম সুস্থ সবল এবং অর্থে-বিত্তেও যুদ্ধের সাজ-সরজ্ঞামে সমর্থ। তবুও আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি যেমে পরিনি। তাঁর কথা মুনে শুনে রাসূল (সা) বললেনঃ সত্য বলেছো। তুমি এখন যাও। দেখা যাক আল্লাহ তোমার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত দান করেন।

রাসূলুল্লাহর (সা) দরবার থেকে উঠে আসার পর বনু সালেমার কিছু লোক তাঁকে বললো, আপনি এর আগে আর কোন অপরাধ করেননি। এটাই আপনার প্রথমবারের মত একটি অপরাধ। অথচ এর জন্য ভালোমত কোন ওজর ও আপত্তি উপস্থাপন করতে পারলেন না। অন্যদের মত আপনিও কিচু ওজর পেশ করতেন, রাসূল (সা) আপনার গোনাহ মাফের জন্য দু’আ করতেন, আর আল্লাহ মাফ করে দিতেন। কিন্তু তা আপনি পারলেন না। তাদের কথা শুনে কা’বের ইচ্ছা হলো, রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট ফিরে গিয়ে পূর্বের বর্ণনা প্রত্যাহাপর করেন। কিছুক্ষণ চিন্তা করে তিনি প্রশ্ন করলেন: আমার মত আর কেউ কি আছে? তিনি জানতে পেলেন, আরও দুইজন আছেন। তাঁরা হলেন: মুরারা ইবন রাবী ও হিলাল ইবন উমাইয়্যা। তঁ*ারা দুইজনই অতি নেক্কার বান্দা ও বদরী সাহাবী। তাঁরেদ নাম শুনে তিনি কিছুটা আশ্বাস্ত হলেন এবং নতুন করে ওজর পেশ করার ইচ্ছা দম ন করলেন।

তৃতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar