কা’ব ইবন মালিক (রা) ।। ৪র্থ অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

কা’ব (রা) ছিলেন তাঁর সময়ের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তৎকালীন আরব কবিদের মধ্যে যাঁরা বেশী বেশী কবিতা রচনা করেছেন তিনি তাঁদেরই একজন। জাহিলী আমলেও কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। সাহিত্য সমালোচকদের মতে, তাঁর কবিতা খুবই উন্নতমানের।৪২ মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে যে তিনজন কবি কুরাইশ ও তাদের স্বগোত্রীয় কবিদের মুকাবিলায় দুর্ভেদ্য ব্যুহ রচনা করেন, কা’ব (রা) সেই ত্রয়ীর অন্যতম। তাঁরা ইসলামবিদ্বেষী কবিদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতেন।৪৩ ইবন সীরীন বলেন: এ তিন কবি হলেন, হাসসান ইবন সাবিত, ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা ও কা’ব ইবন মালিক। তাঁরাই রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদের ম্েযধ শ্রেষ্ঠ কবি।৪৪

কা’ব ইসলাম গ্রহনের পর কুরাইশদের দেব-দেবীর সমালোচনা করে প্রচুর কবিতা রচনা করেছেন। তিনি একটি শ্লোকে বলেছেন:৪৫

আমরা আল-লাত, আল ‘উয্যা ও উদ্দাকে ভুলে যাব। তাদের গলার হার ও কানের দুল ছিনিয়ে নেব।’

রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারের প্রধান তিন কবির কবিতার বিষয় ছিল ভিন্ন। কা’বের কবিতার মূল বিষয় ছিল যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে কাফিরদের ান্তরে ভীতির সৃষিট করা এবং মুলসামানদের অন্তর থেকে ভীতি দূর করে তাদেরকে অটল ও দৃঢ় করা। ইবন সীরীন বলেনঃ৪৬ কা’ব তো কবিতায় যুদ্ধের কথা বলে কাফিরদের ভূয় দেখাতেন। বলতেন: আমরা এমন করেছি, এমন করছি বা করবো। হাসসান তাঁর কবিতায় কাফিরদের দোষ ক্রুটি এবং তাদের যুদধ বিগ্রহের কথা বর্ণনা করতেন। আর ইবন রাওয়াহী কুফরী এবং আল্লাহ ও রাসূলের অস্বীকৃতি ও অবাধ্যতার উল্লেখ করে তাদেরকে ধিক্কার ও নিন্দা জানাতেন।

কা’বের (রা) ছেলে আবদুর রহমান বলেণ, আমার পিতা একদিন বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ, কবিদের সম্পর্কে আল্লাহ তো যা নাযিল করার তা করেছেন। উত্তরে রাসূল (সা) বললেন: একজন প্রকৃত মুজাহিদ তার তরবারি ও জিহবা উভয়টি দিয়ে জিহাদ করে। আমার প্রাণযে সত্তার হাতে তার নামের শপথ! তোমরা তো শক্রুদের দিকে (জিহবা দিয়ে) তীরের ফলাই ছুড়ে মারছো।

ইবন ইসাহক বর্ণনা করেছেন। যখন সূরা আশ-শূ’য়ারার ২২৪ থেকে ২২৬ নং আয়াত- বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখনা যে, তারা প্রতি ময়দানেই কবি-হাসসান, আবদুল্লাহ ও কা’ব কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে উপস্থিত হলেন। তাঁরা বললেনঃ হে আল্লাহ নবী! আল্লাহ যখন এ আয়াত নাযিল করেছেন তখন তো অবশ্যই জেনেছেন, আমরা কবি। রাসূল (সা) তখন তাঁদেরকে আয়াতের ব্যতিক্রমী অংশ তবে তাদের কথা ভিন্ন যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং আল্লাহকে খুব স্বরণ করে এবং নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে পাঠ করে শোনালেন। তারপর বললেন: এ হচ্ছো তোমরা।৪৮

কা’ব (রা) ইসলামের প্রতিপক্ষ কুরাইশদের নিন্দায় বহু শ্লোক রচনা করেছেন। আল্লাহ দরবারে অন্তরঃ তার একটি শ্লোক যে গৃহীত হয়েছে, সে কথা খোদ রাসূল (সা) বলেছেন। জাবির (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। একদিন রাসূল (সা) কা’বকে বললেনঃ তুমি যে শ্লোকটি বলেছো, তাতে তোমার রব তোমাকে ভোলেননি। কা’ব জানতে চাইলেনঃ কোন শ্লোকটি? রাসূল (সা) তখন আবু বকরকে বললেন: আপনি শ্লোকটি একটু আবৃত্তি করুন তো। আবু বকর তখন শ্লোকটি আবৃত্তি করে শোনান।৪৯ প্রাচীন আরবী সূত্রসমূহে শ্লোকটি সংকলিত হয়েছে।৫০ শ্লোকটির অনুবাদ এখানে ওদয়া হলোঃ ‘সাখীনা ধারণা করেছে, সে তার রবকে (প্রভু) পরাভূত করবে। সকল বিজয়ীদের ওপর বিজয়ী (আল্লাহ) অবম্যই জয়ী হবেন।’

এখানে ‘সাখীন’ অর্থ আটা ও ঘি অথবা আটা ও খোরমা দিয়ে তৈরি এক প্রকার খাবার। এটি ছিল কুরাইশদের খুবই প্রিয় খাদ্য। তারা খেতও খুব বেশী বেশী। এ কারণে কবি কুরাইশদেরকে ‘সাখীনা’ বলেছেন। এ দ্বারা মূলতঃ তাদেরকে হেয় ও অপমান করা হয়েছে।৫১

কা’ব (রা) কবিতা রচনা করে রাসূলকে (সা) শোনাতেন। মাঝে মাঝে রাসূল (সা) তাতে কিছু শব্দ রদ-বদল করে সংশোধন করে দিতেন। কা’ব তা সবিনয়ে গ্রহণ করে নিজেকে ধন্য মনে করতেন।৫২

সমকালীন আরব সমাজে কা’বের (রা) কবিতা এক অসাধারণ প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। রাসূলে কারীম (সা) হুনাইন যুদ্ধ শেষ করে যখন তায়েফের দিকে যাত্রা করেন প্রভাব ফেলে যে,  তারা তা শুনেই ইসলাম গ্রহণ করে। শ্লোক দু’টির অর্থ নিম্নরূপ:

‘তহিামা ও খায়বার থেকে আমরা সকল প্রকার হিংসা-বিদ্ভেষ বিদূরিত করে তরবারি কোষে আবদ্ধ করে ফেলেছি।

এখন আবার আমরা তাকে যে কোন দু’টির মধ্যে একটি স্বাধীনতা দিচ্ছি। যদি তরবারি কথা বলতে পারতো তাহলে বলতো এবার দাউস অথবা সাকীফের পালা।’

ইবনে সীরীন বলেনঃ দাউস গোত্র যখন উক্ত পংক্তি দুটি শুনলো তখন তারা ভীত হয়ে পড়লো। তারা বললো, এখন মুসলমান হয়ে যাওয়াই উচিত। তা না হলে আমাদের দশাও হবে অন্যদের মত। এরপর তারা একযোগে ইসলাম গ্রহণ করে।৫৩

কা’ব (রা) ইসলাম গ্রহণের পর থেকে জীবনের শেস দিন পর্যন্ত স্বীয় কাব্য প্রতিভাকে ইসলাম ও মুসলমানদের সেবায় নিয়োগ করেন। প্রয়োজনের মুহূর্তে তিনি যেমন তরবারি হাতে তুলে নিয়েছেন তেমনিভাবে ভাষার যুদ্ধও চালিয়েছেন। তাঁর জীবনকালের ইসলামের ইতহিাসের সকল ঘটনা তিনি তাঁর কবিতায় ধরে রেখেছেন। বদর যুদ্ধের উবনুল হারেস মহীন হন। তাঁর স্বরণে রচনা করেন এক শোকগাথা।৫৪ উহুদ যুদ্ধ এবং সে যুদ্ধের শহীদের সম্পর্কে বহু কবিতা তিনি রচনা করেছেন। এ যুদ্ধের অন্যতম শহীদ রাসূলুল্লাহর (সা) চাচা সায়্যিদুশ শুহাদা হামযার (রা) স্মরণে তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন। এ সময় মক্কার পৌত্তলিক কবিদের সাথে ত৭ার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। সীরাতে ইবন হিশামে তার একটি চিত্র পাওয়া যায়।৫৫

হামযার (রা) শানে রচিত একটি মরসিয়াতে তিনি হামযার বোন সাফিয়্যা বিনতু আবদিল মুত্তালিবকে লক্ষ্য করে বলছেন:৫৬

১.ওঠো সাফিয়্যা, ভেঙ্গে পড়োনা। হামযার স্মরণে বিলাপের জন্য নারীদের প্রতি আহবান জানাও।

২.মানুসের অন্তর কাঁপানো যে বিপদ আল্লাহর সিংহের ওপর আপতিত হয়েছে, সেজন্য দীর্ঘ ক্রন্দনে ক্লান্ত হয়ো না।

৩.তিনি ছিলেন পিতৃ-মাতৃহীনদের জন্য মর্যদার প্রতীক। অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় ছিলেন সিংহের মত।

৪.তাঁর সকল কর্ম দ্বারা তিনি শুধু আহমাদের সন্তুষ্টি এবং আরশ ও ইজ্জতের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহর খুশীই কামনা করতেন।

বীরে মা’উনায় রাসূলুল্লাহর (সা) প্রতিনিধিদের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে কবি কা’বের যবান  সোচ্চার হয়ে ওঠে তিনি হত্যাকারীদের নিন্দায় অনেক কবিতা রচনা করেন।৫৭ মদীনার ইহুদী গোত্র বনু নাদীরের নির্বাসন ও ইহুদী নেতা কা’ব আশরাফের হত্যার চিত্র তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতায় ধরা পড়েছে। এ ঘটনা লক্ষ্য করে প্রতিপক্ষ কবিদের নিন্দাবাদের জবাবও তিনি দিয়েছেন।৫৮

খন্দক যুদ্ধের চিত্রও তাঁর  কবিতায় ধরা পড়েছে। প্রতিপক্ষের বাহিনী ও কবিদের নিন্দায় তিনি দীর্ঘ কবিতা রচনা করেছেন।৫৯ বনু লিহইয়ানের যুদ্ধও তাঁর কবিতায় ধরা পড়েছে।৬০ জ্বি-কারাদের ঘটনায়ও তাঁকে সোচ্চার দেখা যায়।৬১ খায়বার বিজয়ের চিত্রও তাঁর কবিতায় বিধৃত হয়েছে।৬২ মূতার যুদ্ধের শহীদরা তাঁর হৃদয়ে দারুণ ছাপ ফেলেছে। তাঁদের স্বরণে তিনি রচনা করেছেন আবেগ-ভরা এক কাসীদা।৬৩ এভাবে রাসূলুল্লাহর (সা) এ মহান কবির জিহ্বা ইসলামের প্রথম পর্বের সকল ঘটনা ও যুদ্ধে সোচ্চার থেকে আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভাব যথাযথ ব্যবহার করে ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছেন। তাঁর কিছু কিছু পংক্তি আরবী ভাষা সাহিত্যে প্রবাবদ-প্রবচনে পরিণত হয়েছে। রাওহ ইবন যানবা বলেন, কা’বের নিজ গোত্রের এক ব্যক্তির প্রশংসায় রচিত তাঁর একটি শ্লোক আরবী কাব্য গজতে সর্বাধিক বীরত্বব্যঞ্জক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar