কুলসূম ইবনুল হিদ্ম (রা)

ইসলামের ইতিহাসে হিজরাত অধ্যায় আলোচনা করতে গেলেই হযরত কুলসুম ইবনুল হিদমের (রা) পবিত্র নামটি বারবার এসে যায়। ইসলামের প্রচার প্রসারে তাঁর অবদান তেমন উল্লেখযোগ্য না হলেও যাঁরা অবদান রেখেছেন তাঁদেরকে তিনি যে আশ্রয় দিয়েছেন তাতেই স্মরণীয় হয়ে আছেন। তাঁর বিস্তারিত জীবন ইতিহাস পাওয়া যায় না।

তাঁর ডাকনামা আবু কায়স এভং আসল নাম কুলসূম। পিতা আলহিদম ইবন ইমরাউল কায়স। আউস গোত্রের বণী ’আমর ইবন ’আওফেরসন্তান। মদীনার কুবা পল্লীর অধিবাসী এবং রাসূলুল্লাহর (সা) একজন আনসার সাহাবী। হিজারাতের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর জীবনে বার্দ্ধক্য এসে গেছে। তাঁর ইসলাম গ্রহণের অল্প কিছুদিন পরেই ঐতিহাসিক হিজরাত সংঘটিত হয়।১

হযরত রাসূলে কারীম (সা) মকআ থেকে হিজরাত করে সর্বপ্রথম মদীনার উপকন্ঠে কুবা পল্লীতে ’আমর ইবন আওফ গোত্রে চারদিন অবস্থান করেন।২ সর্বাধিক সঠিক বর্ণণা মতে এ চারদিন হযরত রাসূলে কারীম (সা) ও তাঁর সফল সঙ্গীকে আতিথেয়তার দুর্লভ সৌভাগ্য যিনি অর্জণকরেন, তিনি এই কুলসূম ইবনুল হিদম (রা)। রাসূল (সা) ও আবু বকর (রা) কুবায় এসে তাঁর গৃহেই ওঠেন। এ ব্যাপারে ইবন ইসহাক, মুসসা ইবন ’উকবা ও আল-ওয়াকিদী ঐকম্যমত পোষন করেছেন।৩ ইবন ইসহাক বলেন: রাসূল (সা) কুবায় কুলসূমের গৃহে অবতরণ করেন। তবে কেউ কেই যে বলেছেন, কুলসূমের নয় বরং সা’দ ইবন খায়সামার গৃহে অবস্থান করেন, সে সম্পর্কে তিনি বলেন: রাসূল (সা) কুলসূমের গৃহে অবস্থান করতেন এবং সা’দের গৃহে লোকদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ করতেন। কারণ, সা’দ ছিলেন অবিবাহিত। তাঁর পরিবার পরিজন ছিলেন না। একারণে মক্কা থেকে আগত অবিবাহিত মুহাজিরগণ সা’দের গৃহেই আশ্রয় নিতেন। আর তাই ঐ গৃহটি অবিবাহিতদের আবাসস্থল বলে লোকেরা আখ্যায়িত করতো।৪ তাঁর গৃহে চারদিন অবস্থানের পর তিনি মদীনার মূল ভূখন্ডে আবু আইউব আল-আনসারীর (রা) গৃহে অবস্থান করেন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সা) আগমনে তিনি এত খুশী হন যে বাড়ীর চাকর বাকরদেরকে চিৎকার করে হাঁক ডাক শুরু করেন। নাজীহ নামে তাঁর এক চারক ছিল। রাসূল (সা) তাঁর গৃহে উপস্থিত হলে তিনি নাজীহ, নাজীহ বলে ডাকাডাকি শুরু করেন। নাজীহ অর্থ সফলকাম। রাসূল (সা) এ নামকে শুভু লক্ষন বলে মনে করলেন। তিনি আবু বকরকে (রা) বললেন: ওহে আবু বকর। সফলকাম হয়েছ।৫

শুধুই কি হযরত রাসূলে াকরীম (সা) ও আবু বকর (রা) তাঁর গৃহে অতিথি হয়েছিলেন? না, তা নয়। আরো অনেকে মক্কা  থেকে এসে প্রথমে তাঁর ওখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আল-ওয়াকিদী বর্ণণা করেছেন, রাসূল (সা) কুবায় তাঁর গৃহে অবস্থান কালেই আলী (রা) ও সুহাইব (রা) মক্কা থেকে এসে সেখানেই রাসূলের (সা) সাথে মিলিত হন। রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে তাঁদের যখন দেখা হয় যখন তার সামনে ছিল কুলসূম ইবনুল হিদমের উপস্থাপিত উম্মু জারজান নামক এক প্রকার উৎকৃষ্ট জাতের খেজুর। সুহাইব তখন ভীষণ ক্ষুধার্ত। তাছাড়া তাঁর চিল চোকের পীড়া। এ অবস্থায় তিনি সেই খেজুর ভীষণ আগ্রহের সাথে খেতে থাকেন। তাঁকে এভাবে থেতে দেখে রাসূল (সা) এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাব দেন: কুরাইশরা বন্দী করে আমার ওপর অত্যাচার করেছিল। তারপর আমার সকল ধন-সম্পদের বিনিময়ে আমার নিজের ও পরিবার পরিজনের জীবন ক্রয় করে খুব দ্রুত চলে এসেছি। রাসূল (সা) মন্তব্য করেন: তুমি লাভবান হয়েছো।৬

বালাজুরী কুলসূম ইবনুল হিদমের গৃহে আলীর (সা) অবস্থানকালের একটা ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি সেখানে থাকাকালে লক্ষ্য করেন যে, প্রতিদিনই গভীর রাতে পাশের একটি বাড়র দরজা খোলা হয় এবং লোকজনের আনাগোনার শব্দ হয়। এতে তাঁর মনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়। একদিন তিনি পাশের বাড়ীর মহিলাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। মহিলাটি বলেন: জনাব, আমি একজন অনাথ বিধবা। সাইল ইবন হুনাইফ প্রতিদিন রাতে গোপনে মদীনার কাঠের তৈরী বিগ্রহগুলি ভেঙ্গে তার কাঠগুলি জ্বালানীর জন্য আমাকে দিয়ে যায়।৭ এর দ্বারা বুঝা যায় কুলসূমের বাড়ীতে তাঁর অবস্থান বেশ দীর্ঘ হয়।

তাছড়া আবু মা’বাদ আল-মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ (রা)৮ যায়িদ ইবন হারিসা (রা)৯ আবু াসদা কান্নায় ইবন হিসন (রা)১০ ও আবু কাবশা (রা)১১ মক্কা থেকে এসে সর্বপ্রথম তাঁরই আশ্রয়ে থাকেন। আল-হায়সাম ইবন ’আদীর মতে আবু ’উবাইদাহ ইবনুল জাররাহও (রা) প্রথমে তাঁর বাড়ীতে ওঠেন।১২ এভাবে ইতিহাসের পাতা উল্টালে আরো অনেক মুহাজিরের নাম পাওয়া যাবে যাঁদেরকে তিনি সেই চরম দু:সময়ে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

হযরত রাসূলে কারীম (সা)মদীনায় এসে হযরত হামযা ইবন ’আবদিল মুত্তালিবের (রা) সাথে কুলসূমের মুওয়াখাতা বা দ্বীনী ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাকরে দেন।১৩

মদীনায় মসজিদে নাবাবী ও রাসূলুল্লাহর (সা) সহধর্মীনীরে আবাস্থলে নির্মানের কাজ যখন চললেচ তখনই তাঁর পরপারের ডাক এসে যায়। তাঁর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন পরেই হ বদর যুদ্ধ। রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে কোন যুদ্ধ বা অভিযানে অংশ গ্রহনের সুযোগ তিনি পাননি।১৪ রাসূলুল্লাহ (সা) মদীনায় আসার পর এটাই ছিল কোন আনসারী সাহাবীর মৃত্যু। এর কিছুদনি পরেই ইসলামের একজন শ্রেষ্ঠ মুবাল্লিগ হযরত আবু উমামা (রা) ইনতিকাল করেন। তাছাড়া অন্য একজন আনসারী সাহাী হযরত আস’যাদ ইবন যুরারা তার কিছুদিন পর মারা যান।১৫ তাবারী ও ইবন কুতায়বা উল্লেখ করেছেন যে, রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীদেরমধ্যে মদীনায় সর্বপ্রথম কুলসূম ইবনুল হিদমই মারা যান। তারপর মারা যান আস’য়াদ ইবন যুরারা (রা)।

You may also like...

Skip to toolbar