কৃতজ্ঞতা- শেখ সাদির গল্প

হযরত লোকমান হাকিম তখন যুবক। একটি ঘটনায় তাকে বন্দী হিসেবে আটক করা হলো। পরে তাকে এক ধনী লোকের ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করা হলো। সৌভাগ্যক্রমে লোকমানের মনিব ছিলেন একজন বুদ্ধিমান ও রুচিশীল মানুষ। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি লোকমানের মধ্যে লুকিয়ে থাকা বুদ্ধি, বিবেক, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ঈমান দেখে মুগ্ধ হলেন। দেখতে দেখতে মালিক, লোকমান হাকীমকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতে লাগলেন। মনিব সবসময় চেষ্টা করতেন, লোকমানের মান-সম্মান যেকোনো অবস্থায় বজায় রাখতে। তিনি তখন খেতে বসতেন তখন লোকমানকে সাথে নিয়েই খেতেন।
হযরত লোকমান নিজে আগে খাবার খেতেন তারপর খাবারের বাকি অংশ খেতো তার মনিব এবং তারপর অন্যান্যরা। লোকমান যদি কোনো কারণে কোনো একটা খাবার না খেতেন তার মনিবও সেই খাবারে মুখ দিত না। একান্তই যদি নিরুপায় হয়ে খেতেই হতো তাহলে এমনভাবে খেতো যেন ইচ্ছে নেই কিংবা ক্ষুধা নেই।

ওই ধনী লোকটির জন্য একদিন কে যেন একটা তরমুজ পাঠিয়েছিল উপহার হিসেবে। লোকটি সঙ্গে সঙ্গে তার এক গোলামকে ডেকে বলল- “এক্ষুণি গিয়ে লোকমানকে ডেকে আনো। লোকমান এসে আগে তরমুজ খাবে তারপর আমি খাব।”
লোকমান হাকিম আসার পর তার মনিব একটা ছুরি দিয়ে তরমুজটি কাটল। প্রথম টুকরোটি দিল লোকমানকে। লোকমান তরমুজের ওই টুকরোটি এমনভাবে খেতে শুরু করল যেন মধুর চেয়েও মিষ্টি ওই তরমুজ। বেশ মজা করে খেল। লোকমান খুব মজা করে খাচ্ছে দেখে লোকটা পরের টুকরোটিও তাকে খেতে দিল। কারণ সে সত্যিই লোকমানকে ভীষণ ভালোবাসে। লোকমান আবারও বেশ মজা করে তরমুজের টুকরোটি খেল। এভাবে পরপর সতের টুকরো তরমুজ লেখেন লোকমান। অবশেষে একটি মাত্র টুকরো বাকি ছিল, ওই টুকরোটি মনিব নিজে খাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল।
সে বলল: এই টুকরোটি আমি নিজে খাব, দেখব এবং জানব তরমুজ কী করে এতো মিষ্টি আর সুস্বাদু হয়। লোকমান কী মজা করেই না সতেরটি টুকরো খেয়েছে!
কিন্তু যখনই মনিব তরমুজের শেষ টুকরোটি মুখে দিল এবং খেল, তিতা স্বাদ আর অন্যরকম একটা উটকো ঝাঁঝে তার চেহারা বিকৃত হয়ে গেল। এতো বেশি ঝাঁঝ আর তিতা ছিল ওই তরমুজ যে মনিবের জিহ্বার পাশাপাশি গলাও তিতা হয়ে গেল। অতিরিক্ত তিতার কারণে লোকটি অজ্ঞান হয়ে পড়ার উপক্রম হলো। বেশ কিছু সময় পর কিছুটা স্বস্তি বোধ করল মনিব। এরপর লোকমানকে লক্ষ্য করে বললেন,
হে বৎস! তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল তরমুজটি খুবই সুস্বাদু। কিন্তু খেতে গিয়ে আমি বুঝলাম, ওটা ছিল ভয়ানক তিতা। এখন বল, কেন তুমি বিষয়টি গোপন রাখলে? কি দরকার ছিল এত তিতা তরমুজ খাওয়ার?

লোকমান হাকিম এবার মুখ খুললেন। বললেন: “তরমুজটা যে তিতা ছিল এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এ কয়েক বছর আপনার হাতে আমি অনেক মজার মজার খাবার খেয়েছি। তাই কোনোভাবেই আমি আপনাকে বুঝতে দিতে চাইনি যে, তরমুজটি ভীষণ তিতা ছিল। আপনি আমাকে অনেক সম্মান দিয়েছেন, তাই আমার মন চায়নি একটা মাত্র তরমুজের তিক্ততা নিয়ে আপত্তি করে আপনার অমর্যাদা করি। আপনি আমাকে ভালোবেসে যে মিষ্টি খাইয়েছেন, আমাকে দয়া করে যে পরিমাণ অনুগ্রহ দেখিয়েছেন, তার তুলনা সামান্য এই তরমুজের তিতা কিছুই না।”
একটু থেমে লোকমান হাকিম আবার বললেন, “আমি মানুষকে সবসময় উপদেশ দিয়ে এসেছি তারা যেন অন্যদের ভালো কাজ ও আচরণের মর্যাদা দেয়, তারা যেন নিমক-হারাম না হয়। সেই আমিই আজ কি করে নিজের দেয়া উপদেশ ভুলে গিয়ে নিমক-হারামী করতে পারি?”
মনিবের উদ্দেশ্যে হযরত লোকমান এবার বললেন, “আহা! কতই না ভালো হতো যদি তরমুজটার শেষ টুকরাও আমাকে দিতেন এবং আমার প্রতি আপনার মমতা ও স্নেহ নিয়ে তৃপ্ত ও আনন্দিত থাকতেন; যেমনি করে আমি আপনার মহত্ব ও উত্তম আচরণের কারণে আপনার নিকট চির ঋণী হয়ে আছি।”

You may also like...

Skip to toolbar