খুযায়মা ইবন সাবিত (রা)

আবু ’আম্মারা খুযায়মা নাম এবং জু-আশ্ শাহাদাতাইন উপাধি। পিতা সাবিত ইবনুল ফাকিহ্ মদীনার আউস গোত্রের এবং মাতা কাবশা বিনতু আউস খাযরাজ গোত্রের সন্তান। আউস গোত্রের খাতম শাখার সন্তান হওয়ার কারণে তাঁকে খাতমী বলা হয়। তিনি একজন আনসারী সাহাবী।১ জাহিলী ও ইসলামী আমলে মদীনার আউস গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত নেতা এবং সাহসী বীর।২

রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের পূর্বে কোন এক সময় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ’উমার ইবন ’আদী ইবন খারাশাকে সংগে নিয়ে নিজ গোত্রের মূর্তিগুলি ভেঙ্গে ফেলেন।৩ ইবন হিশাম বলেন: বনু খাতমার যাঁরা প্রথম পর্বে চুপে চুপে ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁরা হলেন ’উমার ইবন ’আদী, ’আবদুল্লাহ ইবন আউস ও খুযায়া ইবন সাবিত’।৪

ইবন সা’ দের মতে তিনি বদর যুদ্ধে যোগদান করেন এবং সিফফীনে মারা যান।৫ তবে গ্রহণ যোগ্য মতে তিনি  উহুদ ও তার পরবর্তী যুদ্ধ ও অভিযানগুলিতে অংশগ্রহণ করেন।৬ ইমাম জাহাবী সিফফীন যুদ্ধের আলোচনায় প্রসঙ্গক্রমে বলেন: যে সকল অবদরী সাহাবী সিফফীনে আলীর পক্ষে যোগ দেন তাঁদের মধ্যে খুযাইমা অন্যতম।৭ মক্কা বিজয় অভিযানে স্বীয় গোত্র বনু খাতমার ঝন্ডা ছি তাঁরই হাতে।৮ তিনি মূতা অভিযানেও অংশগ্রহণ করেন। তিনি বলেন: আমি মূতা অভিযানে অংশগ্রহণ করি এবং একদিন এক ব্যক্তির একটি শ্বেত-শুভ্ররতœ ছিনিয়ে নিই। যুদ্ধের পর আমি সেটি নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) নকিট হাজির হই। তিনি সেটা আমাকে দান করেন এবং আমি তা খলিফা উমাারের (রা) সময়ে বিক্রী করে  খাতামা গোত্রের নিকটবর্তী একটি খেজুর বাগান ক্রয় করি।৯ উটের যুদ্ধে তিনি আলীর (রা) পক্ষে যোগদান করলেও তরবারি কোষমুক্ত করেননি। সিফফিনে আলীর (রা) সাথে রণাঙ্গনে উপস্থিত হন এবং বলেনঃ আম্মার নিহত না  হওয়া পর্যন্ত এবং কারা তাঁকে হত্যা করে তা না দেখা পর্যন্ত আমি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবো না। কারণ আমি আল্লাহর রাসূলুল্লাহর (সা) বলতে শুনেছি: আম্মারকে একটি বিদ্রোহ গোষ্টী হত্যা করবে। অতঃপর মুয়আবিযার (রা) বহিনীর হাতে আম্মার   নিহত হলে তিনি মন্তব্য করেনঃ এখণ বিষয়টি ¯পষ্ট হয়েছে। এরপর সকল দ্বিধা-দ্ধন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে তরবারি কোষমুক্ত করে একটি কবিতার দুটি চরন গুন গুন করে আবৃত্তি করতে করতে ময়াদনে ঝাঁপিয়ে পড়েন।১০ চরণ দুটির অর্থ নিম্নরুপ:

১. আমরা আল্লার হাতে বাইয়াত করেছি এবং যে ফিতনার ভয় করছি তার জন্য আবুল হাসানই যথেষ্ট।

২. আলীর মধ্যে শামবাসীদের সকল কল্যান বিদ্যমান: কিন্তুতাদের মধ্যে আলীর গুণাবলার কিছুমাত্র নেই।

এভাবে তিনি আলীর (রা) পক্ষে য্দ্ধু করে সিফফীনের ময়দানে শহদি হন। এটা হিজরী৩৭/খ্রীঃ ৬৭৫ সনের ঘটনা।১১  মৃত্যুকালে তিনি ‘আম্মার,উমার ও উমারা নামে তিনটি ছেলে-মেয়ে রেখে যান।

তিনি রাসূলুল¬াহর (সা) হাতে বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ৩৮ (আচত্রিশ)১২ জাবির ইবন আবদিল্লাহ আম্মার উবন উসমান, ইবন হুনাইফ আমর ইবন মায়মূন আউদী, ইবরাহীম ইবন সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাস, আবু আবদিল্লাহ জাদালী আবদুর রহমান ইবন আবী লায়লা, আতো ইবন ইয়াসার প্রমুখের ন্যায় বিশিষ্ট সাহাবী ও তাবেঈ তাঁর সুত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

ঈমানের দৃঢ়তা এবং রাসূলুল¬াহর (সা)  প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসা ছিল তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট। ঈমানী মজবতীর পরিচয় পাওয়া যায় একটি ঘটনা দ্বারা। একবার রাসূলুল¬াহর (সা)  এক আরব বেদুঈনের নিকট থেকে একটি ঘোড়া খরিদ করেন। লোকটির নাম সাওয়া ইবন কায়স আল-মুহাযিলী। এ ক্রয় বিক্রয়য়েরা সময় অন্য কেই উপস্থিত ছিল না। এ কারণে বিষয়টি কারো জানা ছিলনা। রাসূলুল¬াহর (সা) দর দাম ঠিক ও কথা পাকাপাকি করে লোজটিকে সংগে নিয়ে বাড়ীর দিকে চলতে থাকেন। পথিমধ্যে অন্য এক খরিদদার ঘোড়াটির মূল্য বেশি বলায় ঘোড়ার মালিক রাসূলুল¬াহর (সা) কে ডেকে বলে ঘোড়া যদি নিতে চান নিন, নইলে আমি এর কাছে বিক্রী করে দিই। কথাটি সে  এমন ভাবে বলে যেন রাসূলুল¬াহর (সা) সাথে তার বেচা কেনা হয়নি। রাসূলুল¬াহর (সা) বললেন, ঘোড়াটি তো আগেই আমার কাছে বিক্রী করে ফেলেছো। লোকটি বললো না, আমি বিক্রী করিনি। যদি আপনার কথা সত্য হয় তাহলে কোন সাক্ষী হাজির করুন। দু’জনের কথার মাঝাখানে মুসলিম জনাতা জড় হয়ে গেল। তারা বললো, রাসূল (সা) সত্য বলছেন। লোকটি অস্বীকার করে সাক্ষী হাজির করার দাবী জানাতে লাগলো। ইত্যবসরে হযরত খুযায়মা সেখানে উপস্থিত হলেন। সবকিছু শুনে তিনি বললেন আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তুমি রাসূলুল¬াহর (সা) এর নিকট ঘোড়টি বিক্রী করেছো।খুযায়মার এমন কথায় খোদ রাসূল (সা) বিস্মিত হলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন: কিসের ভিত্তিতে তুমি এমন সাক্ষ্য দিলে? তুমি তো উপস্থিত ছিলেনা? খুযায়মা উত্তর দিলেন: ইয়া রাসূলুল¬াহর! আপনি যা নিয়ে এসেছেন আমি তা সবই সত্য বলে জেনেছি। আর একথাও জেনেছি, আপনি সত্য ছাড়া কিচুই বলেন না। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, খুযায়মা বলেনঃ আপনি আসমানে যে সব খবর দেন তাআমি বিশ্বাস করি। আর আপনি নিজে যা বলছেন তা আমি বিশ্বাস করবো না। সে দিনই হযরত রাসূলে করীম (সা) হযরত খুযায়মার একার সাক্ষ্যকে দু’জনের সামনে বলে ঘোষনা দেন এবং সে দিন থেকেই তাঁর লকব বা উপাধি হয় জূ আশ্- শাহাদাতাইন বা দু সাক্ষের অধিকার ব্যক্তি।১৩ আবু দাউদ ইমাম যুহরীর সূত্রে বর্ণনা করেছে, রাসূল (সা) বলেছেন খুযায়মা একা কারো জন্য সাক্ষ্যই যত্থেষ্ট হবে।১৪

কোন কোন সীরাত গ্রন্থে দু’জন জূ আল্- শাহাদাতইন লকবধারী ব্যক্তিকে দেখা যায়। অন্য জন খুযায়মা ইবন সবিত ইবন শাম্মাস। দুজন কি একই ব্যক্তি না ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি তা বলা কঠিন। আল-ইসবা গ্রন্থের ২২৫১ ও ২২৫২ নং জীবনীতে দুটিতে তাঁদের বর্ণনা এসেছে।১৫ সহীহ বুখারীতে হযরত খুযায়ামর উপরোক্ত ঘটনাটি প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। হযরত যায়িদ ইবন সাবিত বর্ণনা করেন। আমরনা যখন মাসহাফ সংকলন করছিলাম তখন সূরা আহযাবের একটি আয়াত যা আমরা রাসূলুল্লাহর (সা) মুখ থেকে শুনতাম, পেলাম না। তবে আয়াতটিশুধু খুযায়মা আনসারীর নিকটই ছিল। আর তার সাক্ষ্যকে রাসূল (সা) দুজনের সাক্ষ্যের সমান বলে ঘোষনা দিয়েছিলেন।১৬ তাঁর সম্মান ও মর্যাদার আনেক কথা সীরাতের গ্রন্থসমূহে বর্ণিত হযেছে। একবার তিনি স্বপ্নে দেখেন যে রাসূলে পাকের পবিত্র কপালে চুমু  দিচ্ছেন। স্বপ্নের কাথা রাসূলকে (সা) বলার পর তিনি বললেন: তুমি তোমার স্বপ্নকে বাস্তাবে রুপ দিতে পার। অতঃপর খুযায়াম উঠে এগিয়ে রাসলের (সা) পবিত্র কপালে চুমু দেন।১৭

কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় তিনি স্বপ্ন দেখেন রাসূলক (সা) সিজাদ করছেন। একথা রাসূলের (সা) নিকট বরার পর রাসুর (সা) স্বীয় কপাল দ্বারা খুযায়মার কপাল স্পর্শ করেন।১৮ একবার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়েংর মধ্যে আভিজাত্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও কৌলিন্য নিওয় বাকয্দ্ধু হয়। তখন লোকেরা খুযামার নামটিও অতি গর্বের সাথে উল্লেখ করে বলে, আামাদের মধ্যে খুযায়ম আছেন যাঁর সাক্ষ্যকে রাসূল (সা) দুজনের সাক্ষ্যের সমান ঘোষণা দিয়েছেন।

You may also like...

Skip to toolbar