জা’ফর ইবন আবী তালিব (রা)—২য় অংশ

 

প্রথম যুগের মুসলমানরা যেসব দৈহিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করেছিল তার সবই এ হাশেমী যুবক ও তাঁর যুবতী স্ত্রী ভোগ করেছিলেন।

কিন্তু কখনও তাঁরা ধৈর্যহারা হননি। তাঁরা জানতেন, জান্নাতের পথ বন্ধুর ও কন্টাকাকীর্ণ।

তবে যে বিষটি তাঁদের অন্যান্য দ্বীনী ভাইদের মত তাঁদেরকেও পীড়া দিত এবং ভাবিয়ে তুলতো তা হল, ইসলামী অনুশাসনগুলি পালনে এবং এক আল্লাহর ইবাদাতে কুরাইশদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি।

প্রতিটি ক্ষেত্রেই কুরাইশরা তাঁদের জন্য ওঁৎ পেতে থেকে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ গড়ে তুলতো।

এমনি এক মুহূর্তে জা’ফর ইবন আবী তালিব, তাঁর স্ত্রী এবং আরও কিছু সাহাব রাসূলুল্লাহর সা. নিকট হাবশায় হিজরাতের অনুমতি চাইলেন। অত্যন্ত বেদনা ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি তাদের অনুমতি দিলেন।

ব্যাপারটি তাঁর কাছে এত কষ্টদায়ক ছিল এ জন্য যে, এসব সৎ ও পবিত্র-আত্মা লোক তাদের প্রিয় জন্মভূমি-শৈশব কৈশোর ও যৌবনের চারণভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে শুধু এ কারণে যে, তারা বলে আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ।

তাছাড়া অন্য কোন অপরাধে তারা অপরাধী নয়।

তারা দেশত্যাগ করছে, তাদের ওপর যুল্‌ম, উৎপীড়ন চলছে আর তিনি নিতান্ত অসহায়ভাবে তা তাকিয়ে দেখছেন।

মুহাজিরদের প্রথম দলটি জা’ফর ইবন আবী তালিবের নেতৃত্বে হাবশায় উপনীত হলেন।

সেখানে তাঁরা সৎ ন্যায়নিষ্ঠ নাজ্জাশীল দরবারে আশ্রয় লাভ করলেন।

ইসলাম গ্রহণের পর এই প্রথমবারের মত তাঁরা একটু নিরাপত্তার স্বাদ এবং নিঃশঙ্কচিত্তে স্বাধীনভাবে এক আল্লাহর ইবাদতের মাধুর্য অনুভব করলেন।

মুসলমানদের এ দলটির হাবশায় হিজরাত এবং সেখানে বাদশার দরবারে আশ্রয় ও নিরাপত্তা লাভের ব্যাপারে কুরাইশরা অবহিত ছিল।

তারা তাদেরকে হত্যা অথবা ফিরিয়ে আনার জন্য ষড়যন্ত্র আরম্ভ করল।

এই ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত হযরত উম্মু সালামা রা. বলেনঃ ‘আমরা যখন হাবশায় পৌঁছলাম, সেখানে সৎ প্রতিবেশী এবং আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে নিরাপত্তা লাভ করলাম।

আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ তা’আলার ইবাদাতের ব্যাপারে আমরা কোন প্রকার যুল্‌ম-অত্যাচারের সম্মুখীন হলাম না অথবা আমাদের অপছন্দনীয় কোন কথাও আমরা শুনলাম না। এ কথা কুরাইশরা জানতে পেরে ষড়যন্ত্র শুরু করল।

তারা তাদের মধ্য থেকে শক্তিমান ও তাগড়া জোয়ান দু’ব্যক্তিকে নির্বাচন করে নাজ্জাশীর কাছে পাঠাল। এ দু’ব্যক্তি হল, আমর ইবনুল ’আস ও আবদুল্লাহ ইবন আবী রাবীয়া।

তারা তাদের দু’জনের সংগে নাজ্জাশী ও তার দরবারের চাটুকার পাদ্রীদের জন্য প্রচুর মূল্যবান উপঢৌকন পাঠাল। তাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছিল, হাবশার রাজার সাথে আমাদের বিষয়টি আলোচনার পূর্বেই প্রত্যেক পাদ্রীর জন্য নির্ধারিত হাদিয়া তাদের পৌঁছে দেবে।

 

তারা দু’জন হাবশা পৌঁছে নাজ্জাশীর পাদ্রীদের সাথে মিলিত হল এবং তাদের প্রত্যেককে তার জন্য নির্ধারিত উপঢৌকন পৌছে দিয়ে বলল, ‘‘বাদশাহর সাম্রাজ্যে আমাদের কিছু বিভ্রান্ত সন্তান আশ্রয় নিয়েছে।

তারা তাদের পিতৃপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও অনৈক্য সৃষ্টি করেছে।

আমরা যখন তাদের সম্পর্কে বাদশাহর সংগে কথা বলবো, আপনারা তাদের দ্বীন সম্পর্কে কোন রকম জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই তাদেরকে আমাদের নিকট ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাদশাহকে একটু অনুরোধ করবেন।

কারণ, তাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দইতো তাদের বিশ্বাস ও আচরণ সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। তারাই তাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন।’’

দরবারী পাদ্রীরা তাদের কথায় সায় দিল।

উম্মু সালামা বলেন, ‘বাদশাহ আমাদের কাউকে ডেকে তার কথা শুনুক, এর চেয়ে বিরক্তিকর আর কিছু ’আমর ইবনুল আস ও তার সংগীর নিকট ছিলনা।’

তারা দু’জন নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে উপঢৌকন পেশ করল।

উপঢৌকনগুলি নাজ্জাশীল খুবই পছন্দ হল। তিনি সেগুলির ভূয়সী প্রশংসা করলেন।

অতঃপর তারা বাদশাহকে বললঃ ‘‘মহামান্য বাদশাহ, আমাদের কিছু দুষ্টু প্রকৃতির ছেলে আপনার সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেছে। তারা এমন একটি ধর্ম আবিষ্কার করেছে যা আমরাও জানিনে এবং আপনিও জানেন না।

তারা আমাদের দ্বীন পরিত্যাগ করেছে।

কিন্তু আপনাদের দ্বীনও গ্রহণ করেনি।

তাদের পিতা, পিতৃব্য ও গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা তাদেরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদেরকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন।

তাদের সৃষ্ট অশান্তি ও বিপর্যয় সম্পর্কে তাদের গোত্রীয় নেতারাই অধিক জ্ঞাত।’’

তৃতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar