জামাআতের মাসায়েল-মাওলানা মুহাম্মদ হেমায়েত উদ্দিন

জামাআতের মাসায়েলঃ
১। পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায জামাআতের সাথে পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। অনেক মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামের মতে ওয়াজিব। বিনা ওজরে জামাআত তরক করা গোনাহ। যে ব্যক্তি বিনা ওজরে সর্বদা জামাআত তরক করে সে ফাসেক।
২। পাঁচ ওয়াক্তের ফরয নামাযে ইমাম ব্যতীত একজন মুক্তাদী হলেও জামাআত হয়ে যায়। চাই সে একজন সমঝদার নাবালেগ হোক বা মেয়েলোক হোক।
৩। স্ত্রীলোক, নাবালেগ, ক্রীতদাস এবং যাদের জামাআত তরক করার ওজর রয়েছে তাদের উপর জামাআত ওয়াজিব নয়।
৪। জামাআত সহীহ হওয়ার জন্য ইমামকে মুসলমান হতে হবে, ইমামকে বোধশক্তিসম্পন্ন ও বালেগ হতে হবে। মুক্তাদীকে এক্তেদার নিয়ত করতে হবে এবং ইমাম ও মুক্তাদীর স্থান একই হতে হবে অর্থাৎ, ইমাম ও মুক্তাদীর মাঝে দুই কাতার পরিমান ব্যবধান বা গাড়ী চলার মত রাস্তার ব্যবধান থাকতে পারবে না একজন সওয়ারীতে অন্যজন মাটিতে থাকতে পারবে না। কিংবা ইমাম মুক্তাদী ভিন্ন ভিন্ন যানবহনে থাকলেও হবে না।
৫। একাকী নামায পড়ার চেয়ে জামাআতের সাথে নামায পড়লে ২৫ বা ২৭ গুন বেশী ছওয়াব পাওয়া যায়।
৬। মহিলাদের জন্য মসজিদ বা ঈদগাহে জামাআতে নামায পড়তে যাওয়া মাকরুহ ও নিষিদ্ধ। সাহাবাদের যুগ থেকেই এই নিষেধাজ্ঞা চলে আসছে।
৭। যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন যাবত তাকবীরে উলার (প্রথম তাকবীরের) সাথে জামাআতে নামায পড়বে, তার জন্য জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং মুনাফেকী থেকে মুক্ত থাকার পরওয়ানা লিখে দেয়া হবে। ইমামের কিরাত শুরু করার আগ পর্যন্ত জামাআতে শরীক হলেও তাকবীরে উলা পেয়েছে ধরা হবে।
৮। জামাআত পাওয়ার আশায় মসজিদে এসে যদি দেখে জামাআত হয়ে গিয়েছে তবূও জামাআতের ছওয়াব পাওয়া যাবে।
৯। মসজিদে জামাআত হয়ে গেলে মসজিদের বাইরে জামাআত সহকারে নামায পড়তে পাড়লে উত্তম। এমনকি ঘরে এসে যারা নামায পড়েনি তাদেরকে নিয়ে জামাআত করবে। যদি শুধু স্ত্রীকে নিয়েও জামাআত করা যায় তবুও উত্তম। তবে স্ত্রী একা মুক্তাদী হলে তাকে পিছনে দাঁড়িয়ে দিতে হয়। আর কোনভাবে অন্যত্র জামাআত করতে না পরলে ফরয নামায মসজিদেই পড়া উত্তম।
১০। হযরত ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) এর মতে মসজিদে ফরয নামাযের জন্য স্বামী জামাআত (অর্থাৎ, মসজিদে একবার জামাআত হয়ে গেলে আবার দ্বীতীয়বার ঐ মসজিদে ঐ নামাযের জন্য জামাআত) মাকরূহ তাহরীমী। তবে তিন অবস্থায় ছানী জামাআত বরং আরও অধিক জামাআত করা মাকরূহ নয়।
(ক) যদি মসজিদ এমন হয় যার ইমাম মুয়াজ্জিন নির্দিষ্ট নেই। এরূপ অবস্থায় ছানী জামাআত করা যায়।
(খ) যদি প্রকাশ্যে আযান ইকামত ছাড়া প্রথম জামাআত হয়ে থাকে।
(গ) যদি মাসজিদের এলাকার নির্দিষ্ট মুসল্লী ও কর্তপক্ষ ব্যতীত অন্যরা প্রথম জামাআত করে থাকে।
হযরত ইমাম আবূ ইউসূফ (রহঃ) এর মতে এই তিন অবস্থা ছাড়াও সর্বাবস্থায় ছানী জামাআত করা যায়-মাকরূহ হবে না, যদি প্রথম জামাআত যে স্থানে হয়েছে সে স্থান পরিবর্তন করে (ঐ মসজিদেই) অন্য স্থানে ছানী (দ্বিতীয়) জামাআত করা হয়। অনেকে হযরত ইমাম আবূ ইউসুফ (রহঃ)-এর মতানুসারে ছানী জামাআত করে থাকেন, তবে ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ)-এর মত দলীলের দিক দিয়ে অধিক শক্তিশালী হওয়ার কারনে মুহাক্কিক আলেমগণ তাঁর মতানুসারেই ফতওয়া দিয়ে থাকেন।
১১। একাকী ফরয নামায পড়ার পর যদি মসজিদে জামাআত হতে দেখা যায় তাহলে তাতে শরীক হওয়া যায়, যদি সেটা জোহর বা ঈশার জামাআত হয়। এরূপ অবস্থায় জামাআতের সাথে দ্বীতীয়বার যেটা পড়া হবে তা নফল বলে গণ্য হবে।
১২। যদি আসর বা ইশার চার রাকয়াত সুন্নাতে গায়র মুয়াক্কাদা শুরু করার পর জামাআত শুরু হয়ে যায়, তাহলে দুই রাকয়াত পূর্ণ করার পূর্বে হলে দুই রাকয়াত পূর্ন করে সালাম ফিরিয়ে জামাআতে শরীক হয়ে যাবে। পরে আর এই চার রাকয়াত বা অবশিষ্ট দুই রাকয়াত পড়তে হবে না। আর তৃতীয় রাকয়াত বা চতুর্থ রাকয়াতে থাকা অবস্থায় জামাআত শুরু হলে চার রাকয়াত পূর্ণ করে তারপর জামাআতে শরীক হবে।
১৩। একাকী ফরয নামায শুরু করার পর ঐ নামাযের জামাআত শুরু হলে তখন ছয়টা অবস্থাঃ যথাঃ
ক। যদি দুই বা তিন রাকয়াত ওয়ালা নামায হয় এবং যদি এখনও সে দ্বীতীয় রাকয়াতের সাজদা না করে থাকে, তাহলে তৎক্ষণাৎ (ডান দিকে এক সালাম ফিরিয়ে ঐ নামায শেষ করে) জামাআতে শরীক হয়ে যাবে।
খ। আর যদি দুই বা তিন রাকয়াত ওয়ালা নামাযের দ্বীতীয় রাকয়াতের সাজদা করে থাকে, তাহলে ঐ নামাযই পূর্ণ করতে হবে। (জামাআতে শরীক হবে না।)
গ। যদি চার রাকয়াত ওয়ালা নামায হয় এবং প্রথম রাকয়াতের সাজদা না করে থাকে তাহলে তৎক্ষণাৎ (ডান দিকে এক সালাম ফিরিয়ে ঐ নামায শেষ করে) জামাআতে শরীক হয়ে যাবে।
ঘ। কিন্তু যদি এক সাজদাও করে থাকে তবে দুই রাকয়াত পূর্ণ করে সালাম ফিরিয়ে জামাআতে শরীক হবে। তৃতীয় রাকয়াতের জন্য দাঁড়ানোর পূর্ব পর্যন্ত এই হুকুম।
ঙ। যদি তৃতীয় রাকয়াতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে এবং এখনও তৃতীয় রাকয়াতের সাজদা না করে থাকে তবে ঐ দণ্ডায়মান অবস্থায়ই সালাম ফিরিয়ে ঐ নামায শেষ করে জামাআতে শরীক হয়ে যাবে।
চ। যদি তৃতীয় রাকয়াতের সাজদা করে থাকে বা আরও পড়ে থাকে তাহলে ঐ নামায পূর্ণ করে নিবে।

আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তৌফিক দান করুন
সূত্রঃ আহকামে যিন্দেগী । পৃষ্ঠা নং- ২০৯-২১১

You may also like...

Skip to toolbar