Menu

জুলুম-নির্যাতনের পরিণতি

0 Comments

এক বনে বাস করত এক ঝাঁক চড়ুই পাখি। তারা ঝুপড়িতে ডিম পাড়ত এবং বাচ্চা ফোটাত। ওই বনেই বাস করত একটি হাতি। একদিন ঝুপড়ির পাশ দিয়ে নদীতে পানি খেতে আসার সময় হাতির পায়ের নিচে পড়ে কয়েকটি চড়ুই পাখির বাচ্চা মারা গেল। চড়ুইরা এ খবর পেয়ে খুবই কষ্ট পেল। তাদের একজন এ ঘটনাকে ‘ভাগ্যের লিখন’ বলে এড়িয়ে যেতে চাইল। কিন্তু কাকলী নামের এক চড়ুই প্রতিবাদ করে বলে উঠলে :

কাকলী: আমি এসব মানি না। হাতি বড় প্রাণী বলে অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে তা হয় না। এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। নইলে এই বনে আমরা কেউ বাস করতে পারব না।

কাকলীর যুক্তি ও বলিষ্ঠ বক্তব্য অন্য পাখিরা সমর্থন করল। কিন্তু কেউই হাতির অন্যায়ের প্রতিবাদ করার আগ্রহ দেখাল না। এর পরিবর্তে তারা ওই বন ছেড়ে অন্য স্থানে চলে যাওয়ার পক্ষে মত দিল। কিন্তু কাকলী কিছুতেই তা মেনে নিতে রাজি হলো না। সে বলল : এ বন হচ্ছে আমাদের জন্মভূমি। শত্রুর ভয়ে আমরা যদি এখান থেকে চলে যাই তাহলে আমরা আমাদের জন্মভূমির মর্যাদা রক্ষা করব কী করে? তাছাড়া অপরাধ করেছে হাতি, চলে যেতে হলে তারই যাওয়া উচিত এখান থেকে।

কাকলির পক্ষে এ সময় মুখ খুল এক বুড়ো চড়ুই। সে বলল: ঠিক বলেছো তুমি। কিন্তু অধিকার আদায় করতে গেলে তো লড়াই করতে হবে। আমরা কি হাতির সাথে লড়াই করতে পারব?

কাকলী: কেন পারব না? আমরা সবাই যদি বুদ্ধি খাটিয়ে, নিজেদের সামর্থকে কাজে লাগাই তাহলে নিশ্চয়ই হাতিকে পরাস্ত করতে পারব। তবে লড়াইয়ে নামার আগে আমি হাতিকে শেষবারের মত সাবধান করতে চাই যাতে সে আর আমাদের ঝোপঝাড়ের কাছে না আসে।

বুড়ো চড়ুই: বেশ ভাল কথা। কিন্তু হাতি যদি না মানে তখন কী করবে?

কাকলী : হাতি যদি না শোনে তাহলে তাকে এমন শিক্ষা দেব যা ইতিহাস হয়ে থাকবে।

এসব আলাপ আলোচনার পর কাকলী গেল হাতির কাছে। হাতিকে পেয়ে সে বলল: এই যে হাতি! তুমি আজ ঝোঁপের পাশ দিয়ে পানি খেতে যাওয়ার সময় আমাদের ক’টি বাচ্চাকে পায়ের তলায় পিষে মেরেছে। আমি জানতে এসেছি, তুমি কি ইচ্ছে করে এমনটি করেছ নাকি ভুল করে করেছ?

হাতি : আমি ইচ্ছে করে করি আর ভুল করে করি তাতে হয়েছেটা কী? না হয় ক’টা চড়ুইর বাচ্চা মারাই গেল, তাতে দুনিয়া উল্টে গেছে নাকি?

কাকলী: না, দুনিয়া উল্টে যায়নি। কিন্তু সবাই যদি আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে একে অপরের অনিষ্ট করে চলে তাহলে নিশ্চয়ই একদিন দুনিয়া উল্টে যাবে।
হাতি: ওসব ফালতু কথা বাদ দিয়ে এখান থেকে চলে যাও। নইলে তোমাদের সবাইকে আমার পায়ের নিচে পিষে মারব। জেনে রেখ, তোমার মত হাজারটা চড়ুই’র দাম আমার এক পায়ের সমানও না।

কাকলী : তুমি অনেক বড় প্রাণী-এটা আমি মানি। তবে তুমি শুধু নিজের দেহটার দিকে তাকিও না। আমরা ছোট হলেও আমাদের প্রাণেরও দাম আছে। আর তাছাড়া আমরা যদি ইচ্ছে করি তাহলে তোমার অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে পারি।

হাতি: কী বললি আমার প্রতিশোধ নিবি তোরা? হা হা হা..। ঠিকাছে তোরা যা করতে পারিস করগে। তবে মনে রাখিস আমার নামও হাতি।

কাকলী: ঠিকাছে, যাচ্ছি। তবে তুমি তোমার অহংকার ও পাপের শাস্তি শিগগিরই পাবে।

এই বলে কাকলী নিজের আস্তানায় ফিরে এসে চড়ুইদের কাছে হাতির দুর্ব্যবহারের কথা জানাল। সব শুনে পাখিরা ভীষণ ক্ষেপে গেল এবং হাতিকে কিভাবে শায়েস্তা করা যায় তা জানতে চাইল।

কাকলী বলল আমরা শক্তিতে হাতির সাথে পারব না ঠিকই, তবে হাতি যেহেতু উড়তে পারে না সেহেতু সে আমাদের আকাশে পিষে মারতে পারবে না। বরং আমরাই উপর থেকে নখ ও ঠোঁট দিয়ে হাতির ওপর হামলা করব। আমরা যদি হাতির চোখ ফুটো করে দিতে পারি তাহলে তার পরাজয় নিশ্চিত।

যুদ্ধের কৌশল নিয়ে আলোচনার পর সবাই মিলে একযোগে হামলা শুরু করল হাতির উপর। তারা হাতির চারপাশ ঘিরে ধরল। হাতি প্রতিরোধ গড়ে তোলার আগেই পাখিরা তার চোখ ফুটো করে দিল। কিছু দেখতে না পেয়ে হাতি পাগলের মতো ছুটাছুটি করতে লাগল। এ সময় কাকলী ব্যাঙদের ডাকল এবং হাতির অত্যাচারের কাহিনী শোনাল। তারাও হাতির অত্যাচারের শিকার। হাতিকে সমুচিত শিক্ষা দেয়ার জন্য তারাও শপথ নিল।

এদিকে, পাখিদের হামলায় চোখ হারিয়ে ছুটাছুটি করতে গিয়ে হাতির ভীষণ পিপাসা পেল। এ সময় কাকলীর নির্দেশে সব ব্যাঙ হাতির কাছে গিয়ে ‘মেঘ হো’, ‘মেঘ হো’ বলে ডাকাডাকি শুরু করল। ব্যাঙের ডাক শুনে হাতি ভাবল, ব্যাঙ যেহেতু ডাকছে সেহেতু খুব আশপাশে নিশ্চয়ই পানি পাওয়া যাবে।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। পানি পাবার আশায় ব্যাঙদের শব্দ শুনে শুনে হাতি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। এ সময় কাকলীর নির্দেশে ব্যাঙরা পৌঁছে গেল মস্তবড় এক গর্তের পাশে। সেখানে গিয়ে ব্যাঙরা ‘মেঘ হো’, ‘মেঘ হো’ বলে চিৎকার দিতে দিতে গর্তে লাফিয়ে পড়ল। ব্যাঙের ডাক অনুসরণ করতে গিয়ে হাতিও হুড়মুড় করে পড়ে গেল গর্তে। চোখে না দেখায় শত চেষ্টা করেও আর গর্ত থেকে বের হতে পারল না। এভাবে হাতিকে উচিত শিক্ষা দিতে পেরে চড়ুই আর ব্যাঙরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

Tags: , , , , , , , , , ,
Skip to toolbar