ঝরনা কাঁদে না তবু।। ২য় অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

সত্য বটে, একমাত্র আল্লাহর রহমত, রেজামন্দি, মঞ্জুর ও রহমত ছাড়া এ ধরনের সৌভাগ্য অর্জনও সম্ভবপর হয় না।

শুকরিয়া আদায় করলেন আল হারেসা।

হৃদয়ের সকল আকুতির আর অনুভূতি ও আবেগ নিয়ে হাত উঠালেন প্রভুর দরবারে।

আল্লাহপাক তার হৃদয়কে প্রশস্ত এবং শীতল করে দিলেন। রাসূল (সা) তো সাথেই আছেন। সুতরাং তার আর কিসের ভয়?

না, কোনো শঙ্কা কিংবা পরওয়া নয়।

বদর অভিমুখে রাসূলেল (সা) সঙ্গে হারেসা এগিয়ে চলেছৈন ক্রমাগত। চলতে চলতে এক সময় তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লেন আল হারেসা।

বুকে আছে ঈমানের তেজ।

হৃদয়ে আল্লাহ ও রাসূল (সা) প্রেমের সুবাতাস।

মাথার ওপরে আছে রহমত ও বরকতের ছায়া। তবু, তবুও তৃষ্ণার্ত তিনি। তৃষ্ণার্ত- কারণ, তিনি তো মানুষ।

জাগতিক প্রয়োজন ছাড়া কি কোনো মানুষ বাঁচতে বা চলতে পারে?

চলা সম্ভবও নয়।

মানুষ হিসাবে যা যা দুনিয়ায় প্রয়োজন হয়, তা তো পূরণ করতেই হয়। যেমন ক্ষুধা লাগলে খেতে হয়। পিপসা পেলে পানি পান করতে হয়। এই প্রয়োজন কখনোই মানুষের পিছু ছাড়ে না।

আল হারেসাও দারুণ পিপাসার্ত হয়ে উঠলেন।

পিপাসায় তার কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে।

তার এখন পানির প্রয়োজন।

তিনি নামলেন ঘোড়ার পিঠ থেকে।

তারপর দ্রুত গতিতে চলে গেলেন একটি ঝরনার কাছে। ঝরনা!

কী মোহময় ছন্দে ঝিরঝির করে ঝরে পড়ছে ছরনার পানি।

আহ! কী চমৎকার! কী স্বচ্ছ!

বুকটা জড়িয়ে যাচ্ছে আল হারেসার।

তিনি পানি পান করছেন ঝরনা থেকে।

আর তখন, ঠিক তখনই- একটি তীর এসে বিঁধে গেল তার শরীরে!

পাপিষ্ট হিব্বান ইবন আরাফার নিক্ষিপ্ত তীর।

তীরবিদ্ধ অবস্থায় ছটফট করছেন আল হারেসা।

গড়িয়ে পড়লো তার হাতে ভরা ঝরনায় সুপেয় স্বচ্ছ তৃষ্ণার পানি।

গড়িয়ে পড়লেন তিনি নিজেও।

আর মুহূর্তেই নিস্তেজ হয়ে পড়লেন আল হারেসার শরীর।

জাগতিক পিপাসা নিটলো না তার।

পানির তৃষ্ণারটা রয়েই গেল হারেসার।

কিন্তু তার চেয়েও বড় যে পিপাসা সেই শহীদ হবার পিপসা ও তৃষ্ণা মিটিযে দিলেন মহান রাব্বুল আলামীন।

তিনি শহীদ হলেন।

আনসারদের মধ্যে আল হারেসাই প্রথম শহীদ।

সুতরাং এখানেও রয়ে গেল তার অনন্য মর্যদার আসন।

আল হারেসা ছিলেন মায়ের অত্যন্ত আদরের সন্তান।

তিনিও মাকে ভালোবাসতেন অত্যাধিক।

শুধা মাকে ভালোবাসতেন, তাই নয়। তিনি ছিলেণ মায়ের ভীষণ অনুগত ও বাধ্য ছেলে।

কেন নয়?

সাহাবী মা, তার ওপর খান্দানী বংশ।

তারই তো আদরের সন্তান! সোনার ছেলে!

আদর-সোহাগে আর ইসলারেম সুনিবিড় ছায়ায় ছায়ায় বড় হয়েছেন তিনি। যেমন মা, তেমনি ছেলে।

সেই আদরের ছেলে, সোহাগে ভরা কলিজার টুকরো। তিনি শহীদ হয়েছেন! বদর থেকে মদিনায় ফিরে এলেন সেনাপতি রাসুল (সা)।

রাসূলের (সা) ফিরে আসার খবর শুনেই তাঁর কাছে ছুটে গেলেণ মা রাবী। রাসূলকে কাঁদোস্বরে বললেন,

ইয়া রাসূলাল্লাহ!

আমার ছেলে হারেসাকে আমি কতটা ভালোবাসি, তা আপনি জানেন। সে শহীদ হয়েছে। তাতে আমি খুশি। কিন্তু আমার আশঙ্কা দূর না হওয়া পর্যন্ত আমি কিছুতেই শান্তি ও স্বস্তি পাচ্ছিনে। বলুন, বলুন হে দয়ার নবীজী (সা) আমার হারেসা কি জান্নাতের অধিকারী হয়েছে?

যদি তা্ই হয় তাহলে আমি সবর  করবো হাসি মুখে। ভুলে যাব আমার শোকতাপ। আর যদি সে জান্নাতী না হতে পারে তাহলে দেখবেন, আমি কি করি!

রাসূল (সা) খুব মনোযোগের সাথে শুনলেন হারেসার মা রাবীর কথা। তারপর ম বললেন,

এসব কি বলছো তুমি? জান্নাতের সংখ্যা তো একটু দুটো নয়। জান্নাতের সংখ্যা অনেক। আর তোমার কলিজার টুকরো আল হারেসা সর্বশ্রেষ্ঠ জান্নাত আল ফেরদৌসের অধিকারী হয়েছে।

সত্যিই!

রাসূলের(সা) মুখে ছেলের এই খোশ-খবর শুনেই আনন্দে আত্মহারা মা। তারপর মৃদু হাসতে হাসতে উঠে গাঁড়ালেন। আর তখন তার মুখ থেকে উচ্চারিত হলো,

সাবাশ! সাবাশ! সাবাশ হে আল হারেসা!

মায়ের হৃদয়ের পুঞ্জিভূত কষ্ট মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল।

ছেলের সাফল্যে মায়ের বুকটা আরব সাগরের চেয়েও বিশাল হয়ে গেল। কেন হবে না! কম কথা নয়, তিনি এখন মর্যাদাসম্পন্ন একজন শহীদের গর্বিত মা।

কী সৌভাগ্য তার!

আল হারেসারও আজীবন লালিত স্বপ্ন ছিল শহীদ হবার।

শহীদের তৃষ্ণায় তিনি ছিলেন কাতর।

কোনো মুমিন যদি আল্লাহর কাছে একান্তে এমন কিছু চান, তাহলে মহান বারী তায়ালা কি তা মঞ্চুর না করে পারেন? আর যদি তা সাথে যুক্ত হয় রাসূলের দোয়া? তাহলে তো কথাই নেই।

একবার রাসূলেল (সা) সাথে পথে দেখা হলো হারেসার।

রাসূল (সা) জিজ্ঞেস করলেন,

হারেসা! আজ তোমার সকাল হলো কি অবস্থায়?

হারেসা  বললেন, এমন অবস্থায় যে, আমি একজন খাঁটি মুসলমান।

রাসুল (সা) বললেন, একটু ভেবে বলো হারেসা। প্রত্যেকটি কথার কিন্তু গূঢ় অর্থ থাকে।

আল হারেসা বিনম্র এবং প্রশান্ত কণ্ঠে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! ‍দুনিয়া থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছি। আমার রাত কাটে ইবাদাত-বন্দেগীতে। আর দিন কাটে রোযা রেখে। বর্তমান মুহূর্তে আমি যেন নিজেকে আরশের দিকে যেতে দেখতে পাচ্ছি। আমার মনে হচ্ছে জান্নাতীরা জান্নাতের দিকে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামের দিকে চলছে।

আল হারেসার এই কথা শুনার পর রাসূল (সা) বললেন, আল্লাহ পাক যে বান্দার অন্তরকে আলোকিত করেন, সে অন্তর আর আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।

আল হারেসা প্রাণপ্রিয় রাসূলের (সা) কাছে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি আমার শাহাদাতের জন্য একটু দোয়া করুন। শাহাদাতই আমার একান্ত তৃষ্ণার পানি। হৃদয়ের একান্ত আরাধ্য বিষয়।

আল হারেসার তৃষ্ণা আর হৃদয়ের আকুতি দেখে খুশি হলেন দয়ার নবীজী (সা) তিনি সত্যিই দোয়া করলেন হারেসার শাহাদাতের জন্য।

রাসূলের (সা) দোয়া বলে কথা।

বৃথা যায় কিভাবে?

মহান রাব্বুল আলামীন কবুল করলেন তাঁর হাবীবের দোয়া।

কবুল করলেন আল হারেসার পিপাসিত কামনাও।

অতঃপর শহীদ হলেন তিনি বদরে। আর শাহাদাতের  মাধ্যমে পেয়ে গেলেন আল্লাহর পক্ষ থেকে সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ, মহান েএবং বিরল এক পুরষ্কার।

মূলত শাহাদাতের পিপাসার কাছে অতি তুচ্ছ জাগতিক পিপাসা কিংবা ঝরনার পানি।

আল হারেসা!

তিনি পিপাসা মেটাবার জন্য গিয়েছিলেন ঝরনার কাছে।

হাতে তুলে নিয়েছিলেন তৃষ্ণার পানি।

কিন্তু ঝরনাও হার মানলো।

হার মানলো আল হারেসার শাহাদাতের সুতীব্র পিপাসার কাছে।

এক সম্মানিত মেহমান এসেছিলেন পিপাসা মেটানোর জন্র ঝরনার কাছে।

কিন্তু পারলো না সে!

পরাস্ত হলো ঝরনা।

ঝরনা কাঁদে না তবু।

সে কেবল অপলক চেয়ে থাকে এক সাফল্যের দ্যুতি জোতির্ময় নক্ষত্রের দিকে। তিনি, সেই নক্ষত্রটি আর কেউ নন- আল হারেসা।

এমনি হয়।

আল্লাহ পাক যাকে কবুল করেন, পৃথিবীর সকল কিছুই পরাস্ত হয়ে যায় তার কাছে।

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar