তাল্‌হা ইবন উবাইদুল্লাহ (রা)– ৩য় অংশ

 

হযরত তালহা আক্রমণ চালালেন। রাসূল সা. আহত হলেন, তাঁর দান্দান মুবারক শহীদ হলো এবং তিনি রক্ত রঞ্জিত হয়ে পড়লেন।

এ অবস্থায় তালহা একাকী একবার মুশরিকদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে একটু দূরে তাড়িয়ে দেন, আবার রাসূলের সা. দিকে ছুটে এসে তাকে কাঁধে করে পাহাড়েরে ওপরের দিকে উঠতে থাকেন এবং এক স্থানে রাসূলকে সা. রেখে আবার নতুন করে হামলা চালান।

এভাবে সেদিন তিনি মুশরিকদের প্রতিহত করেন। হযরত আবু বকর বলেনঃ এ সময় আমি ও আবু উবাইদা রাসূল সা. থেকে দূরে সরে পড়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর আমরা রসূলের সা. নিকট ফিরে এসে তাঁকে সেবার জন্য এগিয়ে গেলে তিনি বললেনঃ ‘আমাকে ছাড়, তোমাদের বন্ধু তালহাকে দেখো’। আমরা তাকিয়ে দেখি, তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় একটি গর্তে অজ্ঞান হয়ে আছে।

তাঁর একটি হাত দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন প্রায় এবং সারা দেহে তরবারী ও তীর বর্শার সত্তরটির বেশী আঘাত। তাই পরবর্তীকালে রাসূল সা. তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেনঃ যদি কেউ কোন মৃত ব্যক্তিকে পৃথিবীতে হেঁটে বেড়াতে দেখে আনন্দ পেতে চায়, সে যেন তালহা ইবন উবাইদুল্লাহকে দেখে। এ কারণে তাঁকে জীবিত শহীদ বলা হতো।

হযরত সিদ্দীকে আকবর রা. উহুদ যুদ্ধের প্রসংগ উঠলেই বলতেনঃ ‘সে দিনটির সবটুকুই তালহার।’

এ যুদ্ধে হযরত তালহার কাছে আল্লাহর রাসুল সা. এত প্রীত হন যে তিনি তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সুসংবাদ দান করেন।

পঞ্চম হিজরী সনের যিলকাদ মাসে আরবের বিভিন্ন গোত্র ও ইহুদীদের সম্মিলিত বাহিনী মদীনা আক্রমণের তোড়জোড় শুরু করে। এদিকে তাদেরকে প্রতিহত করার জন্য রাসূলুল্লাহর সা. নেতৃত্বে মুসিলম বাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে সালা পর্বতের পাশ দিয়ে পূর্ব পশ্চিমে পাঁচ হাত গভীর খন্দক খননের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ খন্দক খননের কাজে হযরত তালহাকে ব্যস্ত দেখা যায়।

খন্দক খননের কাজ শেষ হতে না হতেই মক্কার কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রের সম্মিলিত বাহিনী মদীনা অবরোধ করে। এদিকে মদীনার অভ্যন্তরে ইহুদী গোত্রগুলি, বিশেষতঃ বনু কুরাইজা চুক্তি ভংগ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে।

এ সময় মুসলমানরা ভিতর ও বাইরের শত্রু দ্বারা পরিবেষ্টিত। এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে কিছু সংখ্যক মুসলমান স্ত্রী-পুত্র পরিজনের নিরাপত্তার চিন্তায় স্বাভাবিকভাবেই একটু অস্থির হয়ে পড়েন। কিন্তু অধিকাংশ মুসলমানের মনোবল এবং আল্লাহর প্রতি তাঁদের ঈমান অটল থাকে। তাঁরা নিজেদের জান-মাল সবকিছু আল্লাহর পথে কুরবানী করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন।

হযরত তালহা ছিলেন শেষোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত।

আল্লাহ তায়ালা সূরা আহযাবের দ্বিতীয় তৃতীয় রুকুতে মুসলমানদের এ সময়কার মানসিক চিত্র সুন্দরভাবে অংকন করেছেন।

খন্দকের ধারে দাঁড়িয়ে কতিপয় মুসলমান আলাপ-আলোচনা করছে।

হযরত তালহা যাচ্ছেন পাশ দিয়ে। তাঁর কানে ভেসে এলো, একজন বলছেঃ আমাদের স্ত্রী পরিজনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা উচিত। হযরত তালহা একটু থমকে দাঁড়ালেন।

বললেনঃ ‘আল্লাহু খায়রুন হাফিজান’- আল্লাহ সর্বোত্তম নিরাপত্তা বিধানকারী। যারা নিজেদের শক্তি ও বাহুবলের ওপর ভরসা করেছে, ব্যর্থ হয়েছে। লোকেরা বললোঃ আপনি ঠিকই বলেছেন। তারা তাদের উদ্দেশ্য থেকে বিরত থাকলো।

বাইয়াতে রিদওয়ান, খাইবার ও মুতাসহ সব অভিযানেই তিনি অংশগ্রহণ করে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। মক্কা বিজয়ের দিন মুহাজিরদের যে ক্ষুদ্র দলটির সাথে রাসূল সা. মক্কায় প্রবেশ করেন, তালহা ছিলেন সেই দলে এবং রাসূলুল্লাহর সা. সাথেই তিনি পবিত্র কা’বার অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন।

দশম হিজরী সনের ২৫শে যুলকা’দা রাসুল  সা. হজ্জের উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে যাত্রা শরু করেন।

এটাই ছিল ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জ। রাসূলুল্লাহর সা. সফর সংগী হন তালহাও।

তিনি রাসূলুল্লাহর সা. সাথে যুলহুলায়ফা পৌঁছে ইহরাম বাঁধেন।

এ সফরে একমাত্র রাসূল সা. ও তালহা ছাড়া আর কারও সংগে কুরবানীর পশু ছিলনা। (সহীহুল বুখারীঃ কিতাবুল হজ্জ)

চতুর্থ অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar