দুঃসাহসী বীর বিশর বিন আমরের ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

দশম হিজরীর কথা। কতিপয় সাহাবী রাসূল(সা) এর পাশে বসেছিলেন। সহসা বিশর বিন আমর আল জারূদের আবির্ভাবে রাসূল(সা) এর পবিত্র মুখমন্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সাহাবীগণ এই বিশরের রহস্য নিয়ে কৌতুহলী হয়ে উঠলেন। তারা কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই রাসূল(সা) পূর্বদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, “এখানে একটু পরেই উপস্থিত হবে সেই কাফেলা, যাতে শ্রেষ্ঠ প্রাচ্যবাসীদের সমাবেশ ঘটেছে।”

সাহাবীগণ পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন। এই কাফেলার পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে তাদের সকলের মন আকুপাকু করছিল যে, তারা কোন্ গোত্র এবং কোন্ এলাকার লোক। কিন্তু লজ্জ্বায় কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারলেন না। তবে হযরত ওমর(রা) আর দেরী সইতে পারলেন না। তিনি নিজের ঘোড়ায় চড়ে দূর হতে যে কাফেলাটি ধূলা উড়িয়ে আসছে তা দেখতে এগিয়ে এলেন। একেবারে কাজে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ আপনারা কোন্ গোত্রের লোক?

তাদের নেতা জবাব দিলেন, “বনু আবদিল কায়েস গোত্রের”।

হযরত ওমর(রা) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কেন এসেছেন? ব্যবসার জন্য?”

তারা বললো, না।

রাসূল(সা) এইমাত্র আপনাদের কথা উল্লেখ করেছেন এবং খুব ভালো বলেছেন।

অনতিবিলম্বে কাফেলা রাসূল(সা) এর সামনে উপনীত হলো। তিনি তাদেরকে মোবারকবাদ জানালেন, ইসলামী নিয়মে সালাম দিলেন এবং তাদের আগমনে আনন্দ প্রকাশ করে বললেনঃ “আগন্তুক কাফেলাকে অভিনন্দন; সসম্মানে ও নিঃসঙ্কোচে আসুন।” কাফেলার নেতা ছিলেন আবু গিয়াস বিশর বিন আমর বিন আল মুয়াল্লা আল আবদী। তিনি বনু আব্দুল কায়েসের শাখা বনু আবসের প্রবীণতম নেতা, সরদার ও সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তি। প্রতিপক্ষীয় এক গোত্রের ওপর আক্রমণ করে তাদেরকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার কৃতিত্বের জন্য তারা তাকে জারুদ বা নিপাতকারী নামে আখ্যায়িত করে। তারা এসেছিলেন আরব সাগরের উপকূলবর্তী এলাকা হতে। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার খ্যাতি সমগ্র আরব উপকূলে ছড়িয়ে পড়েছিল।

জারুদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করলো, তিনি তার নিকট ইসলাম পেশ করলেন এবং তাকে ইসলাম প্রহণের দাওয়াত ও উপদেশ দিলেন। জারুদ বললো, “ইয়া রাসূলুল্লা। আমার একটা ধর্ম আছে। এখন আপনার ধর্ম গ্রহণের উদ্দেশ্যে আমি নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে রাজী আছি। তবে নিজ ধর্ম ত্যাগ করায় আমার কোন ক্ষতি হবে না- আমাকে এ নিশ্চয়তা আপনি দিতে পারেন কি?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হ্যা, আমি তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি ইসলাম গ্রহণের অর্থ দাঁড়াবে এই যে, আল্লাহ তোমার ধর্মের চেয়েও ভাল ধর্ম গ্রহণ করার সুযোগ দিলেন।”

এ কথা শুনে জারুদ ও তার সঙ্গীরা ইসলাম গ্রহণ করলো। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দেশে ফিরে যাওয়অর জন্য সওয়ারী [বাহন] প্রার্থনা করলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারী প্রদানে অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। তখন জারুদ বললো, “ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের স্বদেশ গমনের পথে অনেক লাওয়ারিশ পথভ্রষ্ট উট পাওয়া যায়। সেগুলোতে চড়ে আমরা যেতে পারি কি?” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “না,খবরদার। এগুলোতে আরোহণ করো না। ওগুলো দোযখে যাওয়ার বাহন হবে।”

অতঃপর জারুদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছ থেকে বেরিয়ে স্বদেশ মুখে রওনা হলেন। তিনি মৃত্যুকাল পর্যন্ত ইসলামের ওপর অবিচল ছিলেন এবং খুবই ভালো মুসলমান ছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর যখন কিছু লোক ইসলাম ত্যাগ করে, সে সময়ও তিনি বেঁচে ছিলেন।

তাঁর গোত্রের এক ব্যক্তি বলে উঠলোঃ “মুহাম্মদ(সা) যদি নবী হতেন, তাহলে মরতেন না।”

সঙ্গে সঙ্গে গোত্রের আরো অনেকে তাকে সমর্থন করলো এবং মুরতাদ হয়ে যেতে লাগলো।

জারুদ তাদের সবাইকে এক জায়গায় সমবেত করে বললেনঃ “হে বনু আবদুল কায়েস, আমি তোমাদের কাছে একটি কথা জিজ্ঞেস করছি। যদি তোমাদের জানা থাকে জবাব দিও, নচেত জবাব দিওনা।”

তারা বললোঃ “ঠিক আছে, জিজ্ঞেস করুন।”

জারুদ বললেন, “তোমরা কি জান যে, অতীতেও আল্লাহর বহু নবী এসেছেন?”

তারা বললোঃ শুনেছি।

জারুদঃ তারা এখন কোথায়?

তারা বললোঃ তারা মারা গেছেন।

জারুদঃ তারা যেমন মারা গেছেন, মুহাম্মদ(সা)ও তেমনি মারা গেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোন মা’বুদ নেই এবং মুহাম্মদ(সা) আল্লাহর রাসূল। আমি হযরত আবু বকরের কথার পুনরাবৃত্তি করছি যে, মুহাম্মদ(সা) যদি মারা গিয়ে থাকেন, তাতে কিছু যায় আসে না। আল্লাহ চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী।

এবার তাঁর গোত্রের লোকেরাও কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে বললোঃ “আমরাও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল”।

এরপর হযরত জারুদের আর একটি সৌভাগ্য লাভ করা বাকী ছিল। সেটি হলো শাহাদাত। আল্লাহ তাঁর সে আশাও পূর্ণ করলেন। একুশ হিজরীতে হযরত ওমরের(রা) আমলে পারস্যে প্রেরিত একটি সেনাবাহিনীর সেনাপতি হিসেবে লড়াই করতে করতে তিনি শহীদ হন।

You may also like...

Skip to toolbar