দুয়া/মুনাজাতের আদব ও আমলসমূহ -মাওলানা মুহাম্মদ হেমায়েত উদ্দিন

(ক) দুয়া কবুল হওয়ার জন্য সর্বক্ষণ যা যা করনীয়ঃ
১। খাদ্য, পানীয়, পোশাক-পরিচ্ছেদ ও আয়-উপার্জন হালাল হওয়া।
২। পিতা-মাতার নাফরমানী থেকে বিরত থাকা।
৩। আমর বিল’ মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার করা তথা ভাল কাজের আদেশ করা ও মন্দ কাজ থেকে বারণ করা।
৪। আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন না করা।
৫। কোনো মুসলমানের সাথে অন্যায়ভাবে তিন দিনের বেশি কথা বন্ধ না রাখা।
৬। গীবত না করা। গীবতকারী ব্যক্তির দুয়া কবুল হয় না।
৭। হাছাদ বা হিংসা না করা। হিংসুকের দুয়া কবুল হয় না।
৮। বখীলী বা কৃপনতা না করা। কৃপণ ব্যক্তির দুয়া কবূল হয় না।
৯। দুয়া কবূল হওয়ার জন্য তাড়াহুড়া না করা। উল্লেখ্য, যিকির না করলে, বেশি হাসলে, বেশি কথা বললে হৃদয় মরে যায়।
(খ) দুয়ার সময় বসার আদবঃ
১। কেবলামুখী হয়ে বসা।
২। হাঁটু গেড়ে বসা।
৩। আদব, তাওয়ায়ু ও বিনয়ের সাথে বসা।
৪। পাক-সাফ হয়ে বসা।
৫। উযূ সহকারে বসা।
৬। দুয়ার সময় আসমানের দিকে নজর না উঠানো।
(গ) দুয়ার সময় হাত উঠানোর নিয়মাবলিঃ
১। সীনা বা কাঁধ বরাবর হাত উঠানো।
২। উভয় হাতের তালু আসমানের দিকে রাখা মোস্তাহাব।
৩। উভয় হাতের আঙ্গুলসমূহ কেবলামুখী রাখা মোস্তাহাব।
৪। উভয় হাতের মাঝখানে সামান্য পরিমাণ ফাঁক রাখা মোস্তাহাব।
৫। উভয় হাতের আঙ্গুলসমূহ মিলিয়ে নয় বরং সামান্য ফাঁক রাখা মোস্তাহাব।
৬। দুয়া শেষপূর্বক বরকতের জন্য মুখে হাত বুলিয়ে নেয়া।
(ঘ) দুয়া শুরু এবং শেষ করার বাক্যসমূহঃ
১। দুয়ার শুরু এবং শেষে আল্লাহর হামদ ও ছানা (প্রশংসা) বয়ান করা।
২। দুয়ার শুরু এবং শেষে দুরুদ ও সালাম পড়া।
বিঃদ্রঃ এ দুটি আমলের জন্য নিম্নোক্ত বাক্য দিয়ে দুয়া শুরু করা যায়
“আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন অসসালাতু অসসালামু আলাল মুরসালিন”।
এবং দুয়ার শেষে নিম্নোক্ত বাক্য বলা যায়ঃ
“সুবহানা রব্বিল ঈজ্জাতি আম্মা ইয়াছিকূন ওয়া সালামু আল্লাল মুরসালিন ওয়াল হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন”।
৩। “আমীন” বলে দুয়া শেষ করা।
(ঙ) দুয়ার সময় মনের অবস্থা যেরকম রাখতে হয়ঃ
১। এখলাসের সাথে খালেস মনে দুয়া করা অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যতিত কেউ তার উদ্দেশ্য পূর্ণ করতে পারে না-এই মনোভাব বদ্ধমুল রাখা।
২। দ্ব্যর্থহীন মনোভাব নিয়ে দুয়া করা।
৩। আগ্রহ এবং অনুপ্রানিত মনে দুয়া করা।
৪। যথাসম্ভব মনোযোগ সহকারে দুয়া করা।
৫। না-ছোড় মনোভাব নিয়ে দুয়া করা।
৬। দুয়া কবুল হওয়ার দৃঢ় আশা রাখা।
(চ) চাওয়ার আদবসমূহঃ
১। আল্লাহর আছমায়ে হুছনা (উত্তম নামসমূহ) ও মহান গুণাবলি উল্লেখপূর্বক চাইতে হয়।
২। প্রথমে নিজের জন্য, তারপর পিতা-মাতা ও অন্যান্য মুসলমান ভাইদের জন্য চাওয়া। ইমাম হলে জামাআতের সকলের জন্য চাইবেন।
৩। বারবার চাওয়াঃ অন্তত তিনবার চাওয়া। একই মজলিসে তান বার বা তিন মজলিসে তিন বার। তবে তিন বার চাওয়ার এই নিয়ম একাকী দুয়া করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
৪। নিম্নস্বরে চাওয়া। তবে মজলিসের লোকদেরকে শোনানোর প্রয়োজনে জোর আওয়াজে দুয়া করা যায়। কিন্তু যদি নামাযী ব্যক্তির নামাযে ব্যাঘাত ঘটে, তাহলে তখন জোর আওয়াজে দুয়া করা নিষিদ্ধ।
৫। কোন নেক কাজের উল্লেখ পূর্বক দুয়া কবূল হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন প্রার্থনা করা। যেমনঃ হে আল্লাহ! এই তিলাওয়াত, কিংবা দান-সদকার ওছিলায় আলাদের দুয়া কবূল করুন।
৬। আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং অন্যান্য নেককার ও বুযুর্গদের ওছীলায় দুয়া কবুল হওয়ার প্রার্থনা করা।
(ছ) দুয়ার বিষয়বস্তু বিষয়ক আদবসমুহঃ
১। আখেরাত ও দুনিয়া উভয় জগতের প্রয়োজনসমুহকে অন্তর্ভৃক্ত করে দুয়া করা।
২। কোন পাপের বিষয় না চাওয়া।
৩। এমন বিষয় প্রার্থনা না করা, যার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছেঃ (যেমনঃ নারী দুয়া করবে না যেন সে পুরুষ হয়ে যায়, কিংবা বেটে মানুষ লম্বা হওয়ার বা কাল মানুশ ফর্সা হওয়ার দুয়া করবে না, ইত্যাদি।)
৪। কোনো অসম্ভব বিষয়ের দুয়া না করা।
৫। নিজের মুখাপেক্ষিতা, প্রয়োজন ও অক্ষমতার বিষয় উল্লেখ করা।
(জ) দুয়ার ভাষা বিষায়ক আদবসমূহঃ
১। হযরত রসূল (সাঃ) থেকে বর্নিত বা কুরয়ানে বর্ণিত ভাষায় দুয়া করা।
২। কথার ছন্দ মিলানোর জন্য কসরত না করা।
৩। কবিতার মাধ্যমে দুয়া করলে গানের ভঙ্গি থেকে বিরত থাকা।
দুয়া সম্পর্কে আরও বিশেষ কয়েকটি কথাঃ
১। দুয়া কবূল হওয়ার জন্য ওলী বা মুত্তাকী হওয়া শর্ত নয়, পাপীদের দুয়াও আল্লাহ কবূল করে থাকেন। অবশ্য আল্লাহর খাস বান্দাদের দুয়া আল্লাহ বেশি কবূল করে থাকেন। অতএব আমি পাপী বা আমি নগন্য-এরূপ ধারণার বশবর্তী হয়ে দুয়া করা ছেড়ে দেয়া সমীচীন নয়।
২। কয়েকবার দুয়া করে হতাশ হয়ে দুয়া করা ছেড়ে দেয়া উচিত নয়। কেননা, মানুষের কল্যাণের জন্যই কখনও কখনও দুয়া বিলম্বে কবূল করা হয়ে থাকে।
৩। দুয়া কখনো বৃথা যায় না। কখনও এমন হয় যে, মানুষ যা দুয়া করে হুবহু তা পায়। কখনও যা চাওয়া হয় তা না দিয়ে তার পরিবর্তে অন্য কোন নেয়ামত প্রদান করা হয় অথবা কোন বিপদকে তার থেকে হঠিয়ে দেয়া হয় বা দুয়ার ওছীলায় তার গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয় কিংবা দুনিয়াতে যা চাওয়া হয় তা না দিয়ে পরকালের সঞ্চায় হিসাবে রেখে দেয়া হয়। মোটকথা, দুয়া কখনও বৃথা যায় না, তবে তা কবূল হওয়ার প্রক্রিয়া এক নয়।
৪। সব সময়ই দুয়া করা যায়, তবে এমন কিছু সময় রয়েছে যখন দুয়া করেল আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে কবূল করে থাকেন।
আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তৌফিক দান করুন।
সূত্রঃ আহকামে যিন্দেগী । পৃষ্ঠা নং- ১৯৫-১৯৮

You may also like...

Skip to toolbar