দূর সাগরের ডাক ।। ১ম অংশ

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

খলিফা হযরত উমর (রা)।

খলিফা হবার আগেও তিনি গরিব-দুঃখীদের খোঁজ খবর নিতেন। তাদের পাশে এসে দাঁড়াতেন।

গরিব-দুঃখীদের খবর নেবার জন্যে তাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করার জন্য হযরত উমর (রা) রাতের গভীর মহল্লায়-মহল্লায় ঘুড়ে বেড়াতেন। একাকী। ঘুরতে ঘুরতে একবার তিনি মদীনার একপ্রান্তে এস পৌঁছুলেন।

সেই এলাকার একপাশে থাকেন এক অসহায় বুড়ি। দারুণ দুঃখ-কষ্টে বুড়ির দিন কাটে।

হযরত উমর (রা) বুড়ির দুঃখের  কথা জেনে বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাকে সাহায্য করার জন্য তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন। ভাবলেন, নিজের হাতেই তাকে সাহায্য  করবেন।

পরদিন হযরত উমর (রা) একাকী চলে গেলেন বুড়ির বাড়িতে।

বুড়ির সাথে দেখা করলেন।

শুনলেন, কে একজন এসে তার কষ্ট দূর করে দিয়ে গেছেন।

অবাক হলেন হযরত উমর (রা)।

বড় আশর্যের কথঅ!

কে সেই ব্যক্তি, যিনি উমরের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চান? সে কোন ব্যক্তি, যিনি মানুষের সেবায় উমরকে পরাজিত করেন!

তাকে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে পড়লেন হযরত উমর (রা)।

যে করেই হোক, তাকে খুঁজে বের করতেই হবে।– ভাবলেন তিনি।

প্রতিদিন তিনি লুকিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। চেষ্টা করেন সেই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে।

এভাবে কেটে যায় সময়। কেটে যায় প্রহর। কিন্তু পান না তার প্রার্থিত সেই ব্যক্তিকে।

আর কত অপেক্ষা করতে হবে? তিনি ভাবেন।

এক রাতে লুকিয়ে আছেন হযরত ওমর (রা)।

একটু পরেই তিনি দেখলেন, একজন ব্যক্তি এলেন বুড়ির বাড়িতে।

বুড়ির কাছে গিয়ে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন।

বুড়ি খুশি হলেন।

খুব ভালোকরে তাকিয়ে দেখলেন হযরত উমর (রা)।

দেখলেন, যিনি বুড়ির দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তিনি আর কেউ নন- হযরত আবু বকর (রা)।

দুই প্রতিদ্বন্দীর মুখোমুখি সাক্ষাৎ হলে দু’জনই হেসে উঠলেন। সে এক মধুর হাসি।

উমর (রা) বললেন, আল্লাহর দরবারে হাজার শোকর যে, স্বয়ং খলিফা ছাড়া আমি আর কারো কাছে পরাজিত হইনি।

এই হলেন প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা)।

হযরত আবু বকর (রা) ছিলেন রাসূলের (সা) সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম। জ্ঞানে-পজ্ঞায় বিদ্যা-বুদ্ধিতে তিনি ছিলেন অসাধারণ।

হযরত আবু বকর ছিলেন অত্যন্ত দয়ালূ এবং সহনশীল।

নম্রতা, ভদ্রতা এবং বিনয় ছিল তার একান্ত ভূষণ।

ইসলামপূর্ব সময়ে সেই জাহেলি যুগেও হযরত আবু বকর ছিলেন চরিত্র, ব্যবহার আর আচরণগত দিক থেকে অনুকরণীয়।

জাহেলী সমাজের কোনো কালিমাই তাক কখনো স্পর্শ করতে পারেনি।

এ কারণে মক্কাবাসীরা তাকে শ্রদ্ধা করতো একান্ত হৃদয় থেকে।

আর বিশ্বাস করতো তাকে সর্বান্তকরণে।

কুরাইশদের মধ্যে তার মর্যাদা ছিল অনেক উচ্চে।

খুব ছোটকাল থেকে, সেই শৈশবকাল থেকেই আবু বকরের (রা) বন্ধুত্ব এবং গভীর সম্পর্ক ছিল রাসূলের (সা) সাথে।

বয়সের দিক থেকেও তারা ছিলেন প্রায় সমবয়সী। এক সাথে, একই পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছিলেন দু’জন। ব্যবসা, বাণিজ্যেও যেতেন একই সাথে।

একবার ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া যাচ্ছেন রাসুল (সা)।

তখন তাঁর বয়স বিশ বছর।

আর তাঁর সাথে বন্ধু আবু বকর। তার বয়স তখন আঠার।

সিরিয়া সীমান্তে পৌঁছে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। একটু বিশ্রামের প্রয়োজন।

একটি গাছের নিচে বসে পড়লেন রাসুল (সা)।

তাঁর থেকে একটু দূরে গিয়ে এদিকে-ওদিক তাকিয়ে দেখছেন আবু বকর (রা)।

এমনি সময়ে তিনি দেখতে পেলেন একজন পাদ্রিকে। খ্রিস্টান পাদ্রির নাম- ‘বুহাইরা’ বা ‘নাসতুরা’।

পাদ্রির সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা হলো আবু বকরের। না, অন্য কোনো প্রসঙ্গে নয়। তাদের আলাপ ছিল ধর্মীয় বিষয়েল মধ্যে সীমাবদ্ধ।

আলাপের এক ফঁকে পাদ্রি জিজ্ঞেস করলেন, ঐখানে, ঐ গাছের নিচে বসে আছেন কে?

আবু বকর জবাব দিলেন, উনি মক্কার কুরাইশ গোত্রের মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ!

নামটি শুনেই পাদ্রি একটু থমকে গেলেন।

তারপর বললেন, ঐ ব্যক্তি আরবের নবী হবেন।

পাদ্রির কথাটি শুনেই পাদ্রি একটু থমকে গেলেন।

তারপর বললেন, ঐ ব্যক্তি আরবদের নবী হবেন।

পাদ্রির কথাটি শুনেই আনন্দের এক অপার্থিব ঢেউ খেলে গেল আবু বকরের মধ্যে। তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো, হ্যাঁ- সত্যিই একদিন নবী হবেন আমার বন্ধু-মুহাম্মদ।

পাদ্রির কথাটি মিথ্যা ছিল না।

এতটুকু ভুল ছিল না তার ধারণায়।

সত্যিই একদিন আল্লাহর পক্ষথেকে নবুওয়াতের নিয়ামত হযরত মুহাম্মদ (সা)।

নবুওয়াত প্রাপ্তির পর যখনই রাসুল (সা) ইসলামের দাওয়াত দিলেন আবু বকরকে, আর সাথে সাথে তিনি তা কবুল করলেন।

রাসূলও (সা) বলতেন, ‘আমি যাকেই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছি, একমাত্র আবু বকর ছাড়া প্রত্যেকের মধ্যে কিছু না কিছু দ্বিধার ভাব লক্ষ্য করেছি।’

হযর আবু বকর (রা) ছিলেন বয়স্ক আজাদ লোকদের মধ্যে প্রথম মুসলমান।

ইসলাম গ্রহণের পর হযরত আবু বকর নিজেকে উৎসর্গ করে দেন আল্লাহর পথে।

রাসূলের (সা) প্রদর্শিত পথে।

তাঁর যাবতীয় সম্পদ এবং শক্তি কুরবানী করে দেন আল্লাহর রাস্তায়। হাসিমুখে।

দয়ার নবীজী (সা) যখন প্রকাশ্যে নবুওয়াতের ঘোষণা দিলেন, হযরত আবু বকরের কাছে তখন ছিল চল্লিশ হাজার দিরহাম।

মুহূর্তেই তিনি তার এই বিপুল অর্থ ওয়াক্‌ফ করে দিলেন ইসলামের জন্য। তার অর্থ দিয়েই দাসের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি লাভ করে ইসলামের খেদমতে নিজেদেরকে উৎসর্গ করার সুযোগ পেয়েছিল হযরত বিলাল, খাব্বা, আম্বার, আম্মারের মা সুমাইয়্যা, সুহাইব, আবু ফুকাইহাসহ আরও অনেক দাস-দাসী।

হযরত আবু বকরের দান সম্পর্কে রাসূল (সা) বলতেন:

‘আমি প্রতিটি মানুষের ইহসান পরিশোধ করেছি। কিন্তু আবু বকরের ইহসানসমূহ এমন যে, তা পরিশোধ করতে আমি অক্ষম। তার প্রতিদান আল্লাহ দেবেন। তার অর্থ আমার উপকারে যেমন এসেছে, অন্যকারো অর্থ তেমন আসেনি।’

দয়ার নবীজীল মুখে মিরাজের কথা শুনে অনেকেই বিশ্বাস করতে দ্বিধান্বিত হন। কিন্তু আবু বকর তাহননি।

তিনি রাসূলের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন:

‘হে আল্লাহর নবী! আপনি কি জনগণকে বলেছেন যে, আপনি  গতরাতে বাইতুল মাকদাস ভ্রমণ করেছেন?’

রাসূল (সা) বললেন, হ্যাঁ।

রাসূলের মুখ থেকে একথা শুনার সাথে সাথেই তিনি বললেন,

‘আপনি ঠিকই বলেছেন হে আল্লাহর রাসূল! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূল।’

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar