‘ফাতহুম মুবিন’

 

মক্কা নগরী মুক্ত হয়েছে।

কা’বাঘরকে মূর্তিও ও পূজার হাত থেকে মুক্ত করা হয়েছে।

মুসলমনরা মুক্ত আল্লাহর ঘর কা’বায় প্রাণভরে একদিন একরাত তাওয়াফ করেছে।

কিন্ত্র নামায তখনও হয়নি, আযান তখনও উত্থিত হয়নি কা’বায় মক্কার আকাশে।

মক্কা জয়ের পর কে নামাযের সময় হলে মহানবী (সা) বেলালকে আযান দিতে বললেন।

আদেশমাত্র বেলাল কা’বার একটি উচ্চস্থানে উঠে আযান দিতে শুরু করলেন।

কত শতাব্দী পর কে জানে মক্কায় এই প্রথম আযান।

মক্কার আকাশে-বাতাসে, প্রতিটি পাহাড় এবং পাথওে সে আযান প্রতিধ্বনিত হলো।

অভূতপূর্ব আবেগে শিহরিত মুসলমানদের প্রতিটি কণ্ঠ বেলালের প্রথম তাকবির ধ্বনির সঙ্গে সঙ্গেই একযোগে তাকবির দিয়ে উঠলো।

বেলালের আযান এবং সম্মিলিত তাকবির ধ্বনি কিয়ামতকাল পর্যন্ত এক নতুন পৃথিবীর আগমনি সঙ্গীত হিসেবে যেন প্রতিভাত হলো। স্বাধীন সক্কায় প্রথম নামায অনূষ্ঠিত হলো। নামায শেষ হয়েছে।

মহানবী (সা) উঠে দাঁড়ালেন। সারিবদ্ধ মুসলমানরা বসে।

তাদের সকলের চোখ মহানবীর মুখে নিবদ্ধ।

কুরাইশদের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলে সমবেত হয়েছে মহানবী (সা) কি ঘোষণা দেন তা শোনার জন্যে।

মহানবী (সা) যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের নিরাপত্তা দিয়েছেন, এখন যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে পরাজিত মক্কাবাসীদের জন্যে কি ব্যবস্থা তিনি দেন তা শোনার জন্যে তারা উদগ্রীব। তাদের সকলেরই অন্তর কাঁপছে অজানা সব আশংকায়।

মক্কার জীবনে মহানবীকে এমন কষ্ট নেই যা তারা দেয়নি।

তারপর মদীনা গেলে সেখানেও মক্কাবাসীরা একের পর অভিযান পাঠিয়েছে মহানবীসহ মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্যে।

সেই মহানবী আজ বিজয়ী। মক্কাবাসীদের সম্পর্কে তিনি কি ব্যবস্থা নেবেন?

এহনবী (সা) তাঁর ভাষণ শুরু করে বললেন।

জনমন্ডলীকে সম্বোধন করে বললেন তিনি :

“আল্লাহ্র শোকর যিনি নিজের ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, যিনি নিজের দাসকে সাহায্য করেছেন এবং একাকী শত্রুদের যিনি পরাভূত করেছেন।”

(১)  “সকলে শ্রবণ কর! অন্ধকার যুগের সমস্ত অহংকার-তা অর্থগত হোক আর শোণিতগত হোক-সমস্তই আমার এই যুগল পদতলে দলিত, সথিত ও চিরকালের তরে রহিত হয়ে গেল।

 

(২)  অতঃপর যদি কেউ কোন ব্যক্তিকে ইচ্ছাপূর্বক হত্যা করে, তাহলে সেটা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং সে জন্য তাঁকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত কর হবে। ভ্রমজনিত নরহত্যার জন্য নিহত ব্যাক্তির উত্তরাধিকারীগণকে একশত উষ্ট্র ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা হলো। এটাও তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে।

 

(৩)  ‘হে কুরাইশ জাতি। মূর্খতা যুগের অহামিকা এবং কৌলিন্যের গর্ব আল্লাহ আমারেদর থেকে দূর করে দিয়েছেন। মানুষ সমস্তই আদম হতে আর আদম মাটি হতে তৈরী হয়েছে।‘ সকলে শ্রবণ কর, আল্লাহ বলছেন : ‘হে মানব! আমি তোমাদের সকলকেই (একই উপকরণে) স্ত্রী-পুরুষ হতে সমুৎপন্ন করেছি এবং তোমাদেরকে একমাত্র এই জন্য বিভিন্ন শাখা ও বিভিন্ন শাখা ও বিভিন্ন গোত্রে ((বিভক্ত) করেছি যে, তা দ্বারা তোমরা পরস্পরের নিকট পরিচিতি হতে পারবে (অহংকার ও অত্যাচার করার জন্য নয়)। নিশ্চয় জেনো যে, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অধিক সংযমশীল (পরহেযগার), আল্লাহর নিকট সে-ই অধিক মহৎ। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বদশী।’ সকল মানুষই আদম হতে পয়দা হয়েছে। সুতরাং আদমের সন্তানগণ পরস্পর পরস্পরের ভাই এবং তার সকলেই সমান। এরপর এও বলে দেয়া হচ্ছে যে, আদম মাটি থেকে সৃষ্টি। সুতরাং মানুষকেও মাটির মত সর্বসহ, সর্বপালক ও অহংকারশূন্য হওয়া চাই।

(৪)  ‘সকল প্রকার মদ ও মাদক দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়, মুসলমান-অমুসমান সকলের পক্ষে নিষিদ্ধ।’

 

এই সাধারণ ঘোষণা দেয়ার পর মহানবী (সা) কুরাইশদের প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন। সাধারণভাবে তাদের সকলকে সম্বোধন করে বললেন, ‘হে কুরাইশ জাতি, হে মক্কার অধিবাসীবৃন্দ! তোমাদের প্রতি কেমন ব্যবহার করবো বলে মনে করছো?‘

 

এহানবী (সা) থামতেই সমাবেশের চারদিক থেকে শতকণ্ঠে উচ্চরিত হলো : “আমরা কল্যাণের আশা করিিছ।

হে আমাদের মহিমাময় ভ্রাতা, হে আমাদের মাহমাময় ভ্রাতা, হে আমাদের ভ্রাতুষ্পুত্র, তুমি আজ বিজয়ী। তুমি আজ দন্ডদানে সমর্থ। যদিও আমরা অপরাধ তবু তোমার কাছে সদয় ব্যবহার পাবার প্রত্যাশী।” তাদের কণ্ঠে থামলে মহানবী (সা)গুরু-গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন, “আজ তোমাদের প্রতি কোনই অভিযোগ নেই। আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করুন, তিনি দয়াময়।

তোমরা সকলে মুক্ত, সকলে স্বাধীন।”

 

You may also like...

Skip to toolbar