বড়ো ক্লাউস আর ছোটো ক্লাউসের কথা – হ্যান্স অ্যাণ্ডারসন।। ২য় অংশ

অল্প কিছু দূরেই একটা খামারবাড়ি দেখা গেল। জানলার সব খড়খড়ি বন্ধ, কিন্তু র‌্যাক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছিল। ছোটো ক্লাউস এগিয়ে গিয়ে, দরজায় টোকা দিল। চাষী-বৌ এসে দরজা খুলল বটে, কিন্তু ক্লাউস একটু আশ্রয় চায় শুনবামাত্র, দয়া করে বলে দিল, “অন্য জায়গায় চেষ্টা করে, বাপু। এখানে হবে না। কর্তা বাড়ি নেই। তিনি না এলে বাইরের লোককে ঘরে ঢুকতে দেওয়া যায় না।”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “বেশ, তা হলে এই ঝড়-বাদলায় রাতটা আমাকে বাইরে কাটাতে হবে।” তাই শুনে চাষী-বৌ ওর নাকের উপর দড়াম্ করে দরজা বন্ধ করে দিল।
        কাছেই একটা খড়ের গাদা। সেটার আর বাড়ির মধ্যিখানে খড়ের চাল দেওয়া একটা মাচা। তাই দেখে ছোটো ক্লাউস মনে মনে বলল, ঐখানে উঠে পড়া যাক। দিব্যি খাস খাটের মতো হবে। এখন বাড়ির ছাদের ঐ সারসটা না আবার বুদ্ধি করে নেমে এসে আমার পায়ে ঠোকরায়? বাড়ির ছাদে সারসের বাসা। সেখানে সারস পাহারায় দাঁড়িয়ে ছিল, তার চোখে এক ফোটা ঘুম নেই, অথচ বেশ রাত হয়ে গেছিল।
        তার পর ছোটো ক্লাউস আঁকড়ে-মাকড়ে মাচায় উঠে, এপাশওপাশ করে খড়টড় সরিয়ে, নিজের জন্য দিব্যি আরামের একটা ঘুমোবার জায়গা করে নিল। মাচার পাশেই বাড়ির জানলার খড়খড়ি। সেগুলো আবার ভালো করে বন্ধ হয় না। মাচার উপর থেকে ছোটো ক্লাউস বাড়ির ভিতর কি হচ্ছে না হচ্ছে সব দেখতে পাচ্ছিল।
        দেখল মস্ত একটা টেবিলে রুটি, মদ, ঝলসানো মাংস আর মাছভাজা সাজানো রয়েছে। চাষী-বৌ আর গির্জার পাশে গোরস্থানে যে লোকটা কবর খোড়ে, তারা দুজনে টেবিলে বসে আছে। ঘরে আর কেউ নেই। চাষী-বৌ তার অতিথিকে এক গেলাস মদ ঢেলে দিচ্ছিল আর সে ব্যাটা ছুরি দিয়ে বড়ো গোছের এক টুকরো মাছ কেটে নিচ্ছিল; মনে হল মাছভাজা তার ভারি পছন্দ।
        ব্যাপার দেখে ছোটো ক্লাউস মনে মনে বলল, “দেখেছ সব খাবার নিজেদের জন্য রেখেছে! কাজটা তো ভালো নয়। আহ, আমাকে যদি একটুখানি দিত।’ এই ভেবে যতটা পারে জানলার কাছে এগিয়ে মাথা বাড়িয়ে দেখতে লাগল। এবার চোখে পড়ল চমৎকার একটা কেক। আরে, এ যে রীতিমতো ভোজ!
        একটু বাদেই রাস্তা থেকে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শোনা গেল। চাষী বাড়ি ফিরছে।
        চাষী লোকটা ছিল ভারি অমায়িক, তবে তার একটা বিশেষ দুর্বলতা ছিল যে যারা কবর খোঁড়ে তাদের উপর সে হাড়ে চটা ছিল, তাদের দেখলেই ক্ষেপে উঠত। এদিকে পাশের শহরে যে লোকটা কবর খুঁড়ত, সে আবার চাষীর বৌয়ের আপন মাসতুতো ভাই। দুজনে এক সঙ্গে মানুষ হয়েছিল, তাদের মধ্যে ভারি ভাব ছিল। আজ চাষী বাড়ি থাকবে না জেনেই বেচারা বোনকে দেখতে এসেছিল। বোনও আহ্লাদে আটখানা হয়ে ভাড়ারে যা কিছু ভালো জিনিস ছিল, সব বের করে এনে তাকে পেট ভরে খাওয়াতে বসেছিল।
        এখন ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনে দুজনে আঁতকে উঠল। ঘরের কোণে মস্ত একটা খালি সিন্দুক ছিল; চাষী-বৌ ভাইকে বলল, “শিগগির ওর মধ্যে ঢোক।” ভাইও তাড়াতাড়ি সিন্দুকে ঢুকে পড়ল, সে তো ভালো করেই জানত বাড়িতে হঠাৎ একজন কবর-খোঁড়ার লোক দেখলে চাষী ক্ষেপে প্রায় পাগল হবে।
        চাষী-বৌ তখন তাড়াহুড়ো করে মদের বোতল, খাবার জিনিস ইত্যাদি তার পাউরুটি করার তন্দুরে ভরে রাখল। স্বামী যদি ঘরে ঢুকে টেবিলে এত খাবার-দাবার দেখে তা হলেই সে জানতে চাইবে কার জন্য এত আয়োজন!
        মাচা থেকে ছোটো ক্লাউস ভোজ-সামগ্রী লুকিয়ে ফেলার ব্যাপার দেখে, দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলল, “ইস্! কি কাণ্ড!” তাই শুনে চাষী চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “কে ওখানে?” এই বলে উপরে তাকিয়েই ছোটো ক্লাউসকে দেখতে পেল। চাষী বলল, “ও কি, ওখানে শুয়ে আছ কেন? এসো, আমার সঙ্গে বাড়ির ভিতরে এসো।”
        ছোটো ক্লাউস তখন বুঝিয়ে বলল যে সে পথ হারিয়েছে, চাষী কি তাকে এক রাত্তিরের মতো আশ্রয় দেবে না? লোকটা ভারি অমায়িক, শুনেই বলল, “সে কী কথা, নিশ্চয়ই দেব। শিগগির এসে আমার সঙ্গে, কিছু খাওয়া-দাওয়া করা যাক৷”
        চাষী-বৌ দুজনকে খুব আদর দেখিয়ে ডেকে নিল। তার পর লম্বা টেবিলটার এক দিকে একটা চাদর পেতে মস্ত এক গামলা জাউ এনে দিল। চাষী তো মহা তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া শুরু করে দিল, কিন্তু ছোটো ক্লাউস ও-খাবার মুখে তুলতে পারল না। তার কেবলই মনে হচ্ছিল তন্দুরের মধ্যে সেই চমৎকার কেক, মাছ, মাংস পোরা রয়েছে!
        থলির মধ্যে ঘোড়ার চামড়াটা ছিল; থলিটাকে সে নামিয়ে টেবিলের তলায় রাখল। মুখে জাউ রোচে না, কি আর করে, পা দিয়ে থলিটাকে দিব্যি করে মাড়াতে লাগল। মাড়ানির চোটে শুকনো চামড়া থেকে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ বেরুতে লাগল।
        ছোটাে ক্লাউস বলল, “এই, চুপ, চুপ!” যেন থলিটাকেই বলছে। বলেই আবার থলি মাড়াল, তাতে আরো জোরে ক্যাঁচ, ক্যাঁচ শব্দ হল।
        চাষী অবাক হয়ে বলল, “তোমার থলিতে কি?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “ও কিছু না, ও আমার একটা ক্ষুদে ভেল্কিওয়ালা ও বলছে আমাদের নাকি এই জইয়ের জাউটা খেতে হবে না। ও নাকি ভেল্কি করে আমাদের জন্য ঝলসানো মাংস, মাছভাজা আর কেক তন্দুরের মধ্যে এনে রেখেছে!”
        চাষী বলল, “কি বললে, ভেল্কিওয়ালা? কই, দেখি তো।” এই বলে হুড়মুড় করে উঠে তন্দুর খুলে দেখতে গেল ভেল্কিওয়ালা সত্যি কথা বলেছে কি না। তন্দুর খুলে দেখে ওমা, সত্যিই তো, তন্দুরের মধ্যে মাছ, মাংস, কেক! ভেল্কিওয়ালা তো তার কথা রেখেছে দেখা যাচ্ছে! এদিকে চাষী-বৌ ভয়ের চোটে একটি কথাও বলতে পারল না, তা ছাড়া সেও চাষীর চাইতে কম অবাক হয় নি। কি আর করে, খাবার-দাবারগুলো বের করে স্বামীর আর তার অতিথির সামনে সাজিয়ে দিল আর তারা দুজনে মহানন্দে ভোজ শুরু করল।
        একটু বাদে ছোটাে ক্লাউস আবার থলি মাড়াতে লাগল, আবার ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ বেরুল।
        চাষী বলল, “ভেল্কিওয়ালা আবার কি বলে?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “বলছে ও নাকি ভেল্কি করে আমাদের জন্য তিন বোতল মদ আনিয়েছে। তন্দুরের আড়ালে রয়েছে।” কাজেই চাষী-বৌ বাধ্য হয়ে সেগুলোকেও বের করে আনল। চাষী এক গেলাস মদ ঢালতে ঢালতে ভাবতে লাগল ঐরকম একটা ভেল্কিওয়ালা পাওয়া গেলে তো খাসা হয়।
        শেষটা সে ছোটো ক্লাউসকে বলল, “তোমার ঐ ভেল্কিওয়ালাটি তো বেড়ে। একবার দেখতে ইচ্ছে করছে। দেখা দেবে নাকি? তুমি কি বল?”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “তা, আমি যা বলব ও তাই করবে! কি হে করবে না?” এই বলে থলিটাকে একটু মাড়িয়ে বলল, “শুনলে না? বলছে দেখা দেবে। তবে আগে থাকতেই তোমাকে সাবধান করে রাখছি, কেলে বিটকেল দেখতে। সত্যি কথা বলতে কি, ওকে দেখে কি হবে?”
        “আরে না, না, আমি ঘাবড়াব না। কেমন দেখতে?”
        “কেমন আবার হবে? একটা কবর-খোঁড়া লোকের মতোই হবে। তা ছাড়া আর কি!”
        চাষী বলল, “এ্যাঁ! বল কি? কবর-খোঁড়া লোকের মতো? এই মাটি করেছে! আমি যে তাদের দেখতে পারি না, তা জান? সে যাই হোক গে, এতো আর সত্যিকার কবর-খোঁড়া নয়, এ আসলে তোমার ভেল্কিওয়ালা, আচ্ছা তাই সই। আমার যথেষ্ট বুকের পাটা আছে, কিন্তু ব্যাটাকে বেশি কাছে আসতে দিও না, তাই বলে।” ক্লাউস বলল, “দেখি,ভেল্কিওয়ালাকে বলে দেখি, কি বলে।” এই বলে থলি মাড়িয়ে মহা ক্যাঁচ – কোঁচ শব্দ তুলে, কান পেতে শোনার ভান করতে লাগল।
        “কি, বলছে কি?”
        “বলছে যে ঘরের কোণে ঐ সিন্দুকের ভিতরে গিয়ে ও ঢুকবে। তার পর সিন্দুকের ডালা তুললেই ওকে দেখতে পাবে। দেখা হয়ে গেলে, কিন্তু ডালাটা আবার ভালো করে বন্ধ করে দিও, ভাই।”
        “ডালাটা তুলে ধরতে তুমি সাহায্য করবে তো? বেজায় ভারী যে।” এই বলে চাষী সিন্দুকের কাছে গেল। এখন ঐ সিন্দুকটার মধ্যেই চাষী-বৌ তার ভাইকে লুকিয়ে রেখেছিল।
        সে বেচারার যা অবস্থা! হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, সমস্ত গা কাঁপছে, পাছে ধরা পড়ে যায় এই ভয়ে নিশ্বাস পর্যন্ত ফেলতে পারছে না!
        চাষী তো ডালাটা একটু তুলে, তলা দিয়ে উকি মারল। উকি মেরেই, “উঃফ!” বলে ভয়ে পেছিয়ে এল। “উরি বাবা! দেখলাম ওকে! সত্যি হুবহু আমাদের এই শহরের কবর-খোড়া লোকটার মতো দেখতে–ইস্‌! কী ভীষণ।”
        সে যাই হোক, চাষী আবার টেবিলে এসে বসে, ভয় তাড়াবার জন্য, গেলাসের পর গেলাস মদ খেতে লাগল। তার সাহস ফিরে এল। চাষী কিম্বা তার অতিথি, দুজনার মধ্যে কারও শুতে যাবার কথা মনে হল না। গভীর রাত পর্যন্ত ওরা ঐখানে বসে খাওয়া-দাওয়া গাল-গল্প করল।

You may also like...

Skip to toolbar