বড়ো ক্লাউস আর ছোটো ক্লাউসের কথা – হ্যান্স অ্যাণ্ডারসন।। ১ম অংশ

অনেককাল আগে এক গ্রামে একই নামের দুজন লোক থাকত। একজনের ছিল চারটে ঘোড়া, অন্যজনের মোটে একটি। কাজেই দুজনকে আলাদা করে চিনবার জন্য যে লোকটার চারটে ঘোড়া তাকে সবাই বলত বড়ো ক্লাউস আর যার একটি ঘোড়া তাকে বলত ছোটো ক্লাউস।
        সারা সপ্তাহ ছোটো ক্লাউসকে বড়ো ক্লাউসের খেতে লাঙল দিতে হত আর ঘোড়াটি ধার দিতে হত। তার বদলে সপ্তাহে একটি দিন বড়ো ক্লাউস তাকে তার চারটি ঘোড়া ধার দিত; সে দিনটি ছিল রবিবার।
        সেদিন ছোটো ক্লাউসের কী গর্ব! পাঁচ ঘোড়ার মাথার উপর সে চাবুক ঘোরাত আর মনে মনে ভাবত, অন্তত এই একটা দিনের মতো সে পাঁচ ঘোড়ার মালিক! সেদিন গাঁয়ের সবাই সেজেগুজে গির্জা যাবার পথে দেখত ছোটো ক্লাউস তার পাঁচটি ঘোড়া হাঁকাচ্ছে। তার আহ্লাদ দেখে কে? বারে বারে চটাৎ চটাৎ করে শূন্যে চাবুক ঘোরায় আর চীৎকার করে বলে, “কেয়াবাৎ! কেয়াবাৎ! পাচ-পাঁচটা সেরা ঘোড়া আর সবকটি আমার!”
        তাই শুনে বড়ো ক্লাউস বলল,“ও কথা বোলো না। তুমি তো ভালো করেই জান যে মোটে একটা ঘোড়া তোমার। কিন্তু আবার যেই একদল লোক গির্জা যাবার পথে ওর পাশ দিয়ে চলে গেল, ছোটো ক্লাউস সে-সব কথা ভুলে গিয়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল, “কেয়াবাৎ! কেয়াবাৎ! পাঁচ-পাঁচটা সেরা ঘোড়া আর সবকটি আমার!”
        তাই শুনে বড়ো ক্লাউস বেজায় রেগে গেল। চটে বলল, “বলিনি তোমাকে মুখ সামলে কথা কইতে? ফের যদি ও কথা বল, তা হলে তোমার ঐ একটা ঘোড়ার কপালে এমনি এক বাড়ি দেব যে সঙ্গে সঙ্গে ওর ভবলীলা সাঙ্গ হবে আর পাঁচ-পাঁচটা সেরা ঘোড়া নিয়ে তোমার জাঁক করাও ঘুচে যাবে!”
        ছোটো ক্লাউস বলল, “দোহাই, দাদা, আর ও কথা মুখে আনব না, সত্যি আনব না।” সেইরকম ইচ্ছাই তার ছিল, কিন্তু দুঃখের বিষয়, একটু পরে যেই আরো কয়েকজন লোক ঐ পথ দিয়ে যেতে যেতে ওকে দেখে খুশি হয়ে নমস্কার জানাল, ওর এমনি ফুর্তি লাগল যে মনে হল ঐটুকু এক ফালি জমি চযতে পাঁচটা ঘোড়া জুতে আনা চাট্টিখানি কথা নয়। ব্যস্, আর যাবে কোথা, মাথার উপর চাবুকটি ঘুরিয়ে ছোটো ক্লাউস চেঁচিয়ে উঠল, “কেয়াবাৎ! কেয়াবাৎ। পাঁচ-পাঁচটা সেরা ঘোড়া, সবকটি আমার!”
        এবার রাগে অন্ধ হয়ে বড়ো ক্লাউস বলে উঠল, “দাঁড়াও তোমার রোগের ওষুধ দিচ্ছি।” এই না বলে প্রকাণ্ড একটা পাথর তুলে ছোটো ক্লাউসের ঘোড়ার মাথায় ছুড়ে মারল। ঐ ভারী পাথর মাথায় লাগামাত্র ঘোড়া বেচারা মরে পড়ে গেল।
        তাই দেখে ছোটো ক্লাউস কেঁদে উঠল, “হায়, হায়, এখন আমার একটাও ঘোড়া নেই!” খুব খানিকটা কেঁদে, তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে, ছোটো ক্লাউস মরা ঘোড়ার ছালটা ছাড়িয়ে, বেশ করে হাওয়ায় শুকিয়ে, একটা থলিতে ভরে, থলিটা কাঁধে ফেলে শহরের দিকে চলল। চামড়াটা বেচতে হবে।
        অনেক দূরের পথ, মাঝখানে আবার একটা প্রকাণ্ড ঘন বন। সেখানে পৌছতে-না-পৌছতে ভয়ংকর ঝড় উঠল। সে কী মেঘের ঘনঘটা আর ঝমঝমে বৃষ্টি, তার উপর কালো কালো ঝাউগাছগুলোর বাতাসে সে কী দোল খাওয়া! তাই দেখে ছোটো ক্লাউস বেচারা এমনি ভড়কে গেল যে পথটথ ভুলে একাকার। পথ খুঁজে পাবার আগেই সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামল।

You may also like...

Skip to toolbar