ভাড়া বাড়ি(শেষ অংশ)

হাফ টাইম শেষে দুপুরে খাবার খেতে বাসায় আসছিল হামিদ মিঞা। দূর থেকে টিনের গেটটা হাট করে খোলা দেখে বিরক্ত বোধ করে সে। যাওয়ার সময় লাকিকে বারবার বলে গেছে নতুন এলাকা তাই সামনের গেটটা বন্ধ রাখতে। এই সময় হঠাৎ দেখে ভেতর থেকে শশব্যস্ত হয়ে বের হয়ে আসে একবুড়ি। মুখে কাপড় চাঁপা দিয়ে ব্যস্ত পায়ে ঢুকে গেল পাশের গলিতে। উদ্বেগ আর উৎকন্ঠা নিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ি ঢুকলো হামিদ মিঞা। চৌকিতে বসে আছে লাকি। মানুষের সাড়া পেয়ে ম্যাও করে হাড়ি পাতিল উল্টে পালিয়ে গেল একটা কালো বিড়াল। কাছে গিয়ে জোরে কয়েক বার ঝাকি দেয়ার পর ধীরে ধীরে মুখ তুলে চাইলো লাকি। স্বামীকে দেখে ঝাপিয়ে কান্না এলো তার দুচোখে।
নাহ্, হামিদ মিঞা বিশ্বাস করলো নালাকির কথা। ঘুরে ফিরে শ্বান্তনা দিতে গিয়ে বলল দুঃস্বপ্ন দেখেছে সে। দিনে দুপুরে তার রুদ্ধঘরে কিভাবে ঢুকবে বুড়ি! আর বাতাসেই বা ভাসবে কিভাবে? লাকি যতই বলুক হামিদ শ্বান্তনা দেয় তাকে। বলে নতুন বাসা গোছানোর ক্লান্তিতে গভীর ঘুম হয়েছিল তার আর ঘুমের ঘোরে দেখেছিল দুঃস্বপ্ন। লাকির শারীরিক আর মানসিক অবস্থা দেখে সিদ্ধান্ত নেয় যে আজ আর কাজে যাবেনা।
লোডশেডিং এ হারিকেনের টিমটিমে আলোতে রাতের খাবার খেতে বসে হামিদ আর লাকি। বিকেল থেকে লাকি ধীরে ধীরে সুস্থ্য হয়ে উঠে। আর কোন অসুবিধা হয়নি তার পর। বরং সন্ধ্যায় চা বানিয়ে আগুন গরম পুরি সিঙ্গারা দিয়ে খেয়েছিল দুই টোনাটুনি। আর গুটগুট করে গল্প করেছিল ভবিষ্যতের। খেতে বসে হামিদ ভাবে এক ফালি লেবু হলে ভাল জমতো খাবারটা। লাকি কে বলতেই রহস্যময় হাসি হেসে উঠে গেল সে।
একমনে খাচ্ছিল হামিদ মিঞা। হঠাৎ সামনের দেয়ালে ঝিকমিক করে উঠলো ধাতব প্রতিফলন। তড়িৎ গতিতে পেছনেফিরে পাথরের মত জমে গেল হামিদ। লাকি এক হাতে ছোরা উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার পেছনে। হামিদের মাথার তালুর দিকে তাক করা। চোখে কোন কালো অংশ নেই, পুরোটাই সাদা। বন বন করে ঘুরছে চার পাশে। আরেক হাতেঅর্ধ কাটা কাগজী লেবু থেকে ঝর ঝর করে গড়িয়ে পড়ছে তাজা রক্ত। লাকির হাতের তালু বরাবর ফালি ফালি গভীর ক্ষত। ‘লাকি’! বলে তীব্রকন্ঠে আর্তনাদ করে উঠে হামিদ। কা কা করে কর্কশ কন্ঠে ডেকে উঠে পাশের আমগাছে আশ্রয় নেয়া কয়েক শত কাক। নরক গুলজার শুরু হয়ে গেছে যেন চারপাশে।
এবার বিস্ফোরিত চোখে হামিদ দেখে লাকির লম্বা চুলগুলো উপরে উঠে যাচ্ছে। সাথে সাথে লাকিও। চুল ধরে কেউ তাকে ঝুলিয়ে রেখেছে ছাদের সাথে। হঠাৎ হঠাৎ মুখের চামড়া কুঁচকে গিয়ে রূপ নিতে চায় কোন বিভৎস বুড়ির। যেন ভেতর থেকে জোর করে ফেঁড়ে ফুঁড়ে বের হতে চায় অন্য কোন স্বত্তা। এমনি সময় কোথা থেকে এক বুক সাহস এসে ভর করলো হামিদ মিঞার কলিজায়। লাকির প্রতিস্নেহে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল মন।এক লাফে চৌকির উপর দাঁড়িয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে লাকির হাটু ধরে নীচের দিকে টান দিল সে। নারিকেল গাছের মৃত শাখার মত ঝুপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো লাকি। জ্ঞানহীন।
ফস করে শাড়ির আঁচল ছিড়ে লাকির হাতের ক্ষত বাঁধলো হামিদ। তারপর তাকে পাঁজাকোলে তুলে ছুট দিল বাহিরে। আপাততঃ কোন হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ভর্তি করতে হবে তাকে। মালপত্র যা আছে পড়ে থাক, এই সর্বনাশা অভিশপ্ত বাড়িতে আর এক মুহূর্তও নয়। মানুষের জীবন বাঁচলে তবেই তো মাল পত্র! উদ্ধশ্বাসে হামিদ ছুটতে থাকে সদররাস্তা ধরে।
অন্ধকার ফুঁড়ে আঁধার গলি থেকে বের হয়ে এলো এক বুড়ি। নাক উচিয়ে এদিক ওদিক কি যেন শুকলো বাতাসে। রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিল রক্তে ভেজা এক টুকরো শাড়ির আঁচল। কুচকুচে কালো আর সরু জিভ বের করে একটু চাটলো সেটা। মুখের মধ্যে টাস টাস করে শব্দ করলো দুবার। কোমরে গুঁজে নিল টুকরোটি। তারপর চাপা কন্ঠে খল খল করে হাসতে হাসতে স্বাগোক্তি করলো ‘যাবি কই’! আবারো অন্ধ গলিতে ঢুকে গেলো বুড়িটা
সমাপ্ত

You may also like...

Skip to toolbar