মানুষ ও তার সৃষ্টির রহস্য

পৃথিবী সৃষ্টি, মহাজগত সৃষ্টি, পৃথিবীর সমস্ত প্রানী, উদ্ভিদ সম্পদ, পাহাড় পর্বত, নদ নদী, সাগর দড়িয়া সৃষ্টি নিয়ে অনেক ধরেনর কথা আমাদের জানা আছে। কিছু ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে কিছু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে। তবে লক্ষ্যনিয় যে এই সব সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ধর্ম ও বিজ্ঞান কোনটাই কারোর সাথে বিরোধ নাই। ধর্ম এই সব সৃষ্টির পিছনে একজন সৃষ্টিকর্তার কথা সরাসরি বলছে। সৃষ্টিকর্তা কিভাবে এগুলো সৃষ্টি করেছেন তা বলছে। অন্যদিকে বিজ্ঞান এই সব সৃষ্টি’র পিছনে সৃষ্টিকর্তা আছে বা নাই সে বিষয়ে কোন ধরনের কথা বলছে না। বরং এই সব সৃষ্টি কিভাবে সংঘঠিত হতে পারে বা এখন কিভাবে তারা কাজ করছে তা নিয়ে কিছু ব্যাক্তি বিশ্বাস বা ধারনা যুক্তি প্রমান দ্বারা উপস্থাপন করছে। যেমন ধরা যাক মানুষ সৃষ্টির রহস্য। ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিতে আল্লাহ সোবহানা তালা মাটি থেকে প্রথম মানুষ সৃষ্টি করেছেন বলে স্পষ্ট বর্ননা করেছেন। কিন্তু বিজ্ঞান এখনো প্রমান করতে সমর্থ হয় নি যে আদৌ মাটি থেকে মানুষ বা জীবের সৃষ্টি সম্ভব কিনা। আবার মাটি থেকে মানুষ বা জীবের সৃষ্টি যে অসম্ভব তাও বিজ্ঞান বলছে না। কাজেই দেখা যায় মানুষ সৃষ্টির প্রাথমিক উপকরন হিসেবে মাটির ভূমিকা নিয়ে বিজ্ঞান ধর্মের সাথে কোন ধরনের কনফ্রন্টেশনে যাচ্ছে না যতক্ষন পর্যন্ত বিজ্ঞান কোন প্রমান দাঁড় করাতে না পারছে।

আমাদের মধ্যে যারা ক্কোরআন বোঝার চেষ্টা করি তারা হয়তো নিশ্চই অবগত আছি মানুষ সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে।

আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻟِﻠْﻤَﻼَﺋِﻜَﺔِ ﺇِﻧِّﻲْ ﺧَﺎﻟِﻖٌ ﺑَﺸَﺮًﺍ ﻣِّﻦ ﺻَﻠْﺼَﺎﻝٍ ﻣِّﻦْ ﺣَﻤَﺈٍ ﻣَّﺴْﻨُﻮْﻥٍ، ﻓَﺈِﺫَﺍ ﺳَﻮَّﻳْﺘُﻪُ ﻭَﻧَﻔَﺨْﺖُ ﻓِﻴْﻪِ ﻣِﻦ ﺭُّﻭﺣِﻲْ ﻓَﻘَﻌُﻮْﺍ ﻟَﻪُ ﺳَﺎﺟِﺪِﻳْﻦَ – ‘স্মরণ কর সেই সময়ের কথা, যখন তোমার প্রভু ফেরেশতাদের বললেন, আমি মিশ্রিত পচা কাদার শুকনো মাটি দিয়ে ‘মানুষ’ সৃষ্টি করব।
অতঃপর যখন আমি তার অবয়ব পূর্ণভাবে তৈরী করে ফেলব ও তাতে আমি আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার প্রতি সিজদায় পড়ে যাবে’ (হিজর ১৫/২৮-২৯) ।
অন্যত্র তিনি বলেন, ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻳُﺼَﻮِّﺭُﻛُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺣَﺎﻡِ ﻛَﻴْﻒَ ﻳَﺸَﺂﺀُ ﻵ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺍﻟْﻌَﺰِﻳﺰُ ﺍﻟْﺤَﻜِﻴﻢُ – ‏( ﺁﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ ৬)- ‘তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকে মাতৃগর্ভে আকার-আকৃতি দান করেছেন যেমন তিনি চেয়েছেন। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। তিনি মহা পরাক্রান্ত ও মহা বিজ্ঞানী’ (আলে ইমরান ৩/৬) ।
তিনি আরও বলেন, ﻳَﺨْﻠُﻘُﻜُﻢْ ﻓِﻲْ ﺑُﻄُﻮْﻥِ ﺃُﻣَّﻬَﺎﺗِﻜُﻢْ ﺧَﻠْﻘًﺎ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِ ﺧَﻠْﻖٍ ﻓِﻲ ﻇُﻠُﻤَﺎﺕٍ ﺛَﻼَﺙٍ – ‏( ﺯﻣﺮ ৬)- ‘তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করেন একের পর এক স্তরে তিনটি অন্ধকারাচ্ছন্ন আবরণের মধ্যে’ (যুমার ৩৯/৬) ।
তিনটি আবরণ হ’ল- পেট, রেহেম বা জরায়ু এবং জরায়ুর ফুল বা গর্ভাধার।
উপরোক্ত আয়াতগুলিতে আদম সৃষ্টির তিনটি পর্যায় বর্ণনা করা হয়েছে।

আল্লাহ সোবহানা তালা চার উপায়ে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। ১। মাটি থেকে শুধু মাত্র পুরুষ মানুষ (আদম) ২। স্ত্রী জাতীয় মানুষের সাথে কোন প্রকার যৌনসংশ্রব ছাড়াই শুধুমাত্র পুরুষ (আদম) মানুষের সোমাটিক টিসু বা কোষ থেকে পুর্নাঙ্গ স্ত্রী জাতীয় মানুষ(হাওয়া), ৩। পুরুষ মানুষের সাথে কোন প্রকার যৌনসংশ্রব ছাড়াই শুধুমাত্র স্ত্রী জাতীয় মানুষ (মরিয়ম) এর এম্ব্রায়োনিক টিসু বা কোষ থেকে পুর্নাঙ্গ পুরুষ মানুষ (ঈসা বা যিসাস), এবং ৪। পুরুষ ও স্ত্রী এর মধ্যে যৌন সংগমের দ্বারা সৃষ্ট জাইগটিক টিসু থেকে পুরুষ বা স্ত্রী উভয় জাতীয় মানুষ (আমরা)। এর বাহিরে আর কোন উপায়ের কথা ক্কোরআনে বলা হয়নি।

প্রাচীনযুগে ৩য় বা ৪র্থ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের তেমন প্রসারতা না থাকায় সেই সময়কার দার্শনিকরা মানুষ সৃষ্টির রহস্য উতঘাটনে তাদের বাস্তবতার নিরিখে নিজস্ব ধারনাকেই ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র। আর এ কাজটা করতে গিয়ে তারা কেবলমাত্র জাইগটিক টিসু থেকে মানুষ বা জীব সৃষ্টির রহস্যকেই ব্যাখ্যা করেছেন। শুকনো মাটি, মানুষের শুধুমাত্র সোমাটিক বা এম্ব্রায়োনিক টিসু থেকে পূর্নাঙ্গ মানুষ সৃষ্টির উপর কোন দার্শনিক আলোচনা আসেনি। আধুনিক বিজ্ঞানের সফলতায় জাইগটিক টিসু থেকে মানুষ সৃষ্টির রহস্য উতঘাটন করতে গিয়ে এম্ব্রায়োলোজী’র উদ্ভব ঘটে যা ক্কোরআনে সুরা আলাকে ১৫০০ বছর আগে বর্ননা করা হয়। যদিও এই সুরার বক্তব্য প্রাচীন দার্শনিকদের ত্বত্ত নকল করা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে আমি সে বিতর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির প্রথম অন্য তিন উপায়ের উপর বহুকাল কোন দার্শনিক বা বৈজ্ঞানিক ত্বত্ত আমাদের কাছে আসেনি। সম্প্রতি প্রায় ১০০ বছর আগ থেকে সোমাটিক টিসু এবং এম্ব্রায়োনিক টিসু থেকে জীবের সৃষ্টির উপর অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষনার ফলশ্রুতিতে জানা গেছে যে এও সম্ভব যা আধুনিক বিজ্ঞানে “টিসুকালচার” নামে পরিচিত। কিন্তু এখনো বিজ্ঞান যে বিষয়টাতে সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সেটা হলো বিপরিত লিঙ্গের সোমাটিক বা এম্ব্রায়োনিক টিসু থেকে টিসুকালচার এর মাধ্যমে অপর লিঙ্গের মানুষ সৃষ্টি করা সম্ভব কিনা। অর্থ্যাত পুরুষ এর সোমাটিক টিসু থেকে স্ত্রী বা স্ত্রী’র এম্ব্রায়োনিক টিসু থেকে পুরুষ মানুষ সৃষ্টি করা আদৌ সম্ভব কিনা। একই প্রশ্ন উদ্ভিদ বা অন্যান্য প্রানী’র বেলাও উঠেছে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম মহিলা ভেড়ার এম্ব্রায়োনিক টিসু থেকে “ডলি” নামের অপর একটা মহিলা ভেড়া সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এম্ব্রায়োনিক টিসু’র টিসুকালচার করে একটা পুর্নাঙ্গ স্ত্রী জাতীয় প্রানী তৈরী করা সম্ভব হলেও পুরুষ প্রানী তৈরী করা সম্ভব হয়নি। আবার সোমাটিক টিসু’র টিসু কালচার করে পুর্নাঙ্গ পুরুষ বা স্ত্রী জাতীয় কোন প্রানীই তৈরী করা এখনও সম্ভব হয়ে উঠেনি। হয়তো সেটাও সম্ভব হবে অদূর ভবিষ্যতে যদি আল্লাহ সোবহানা তালা ইচ্ছা করেন। তবে সোমাটিক টিসু’র টিসু কালচার করে প্রানী দেহের কিছু অঙ্গ প্রতঙ্গ যেমন কিডনী, লিভার, প্রভৃতি তৈরীর চেষ্টা চলছে। বিজ্ঞানীরা তাতে কিছুটা সফলও হয়েছেন। সবচেয়ে সফলতা এসেছে কৃত্রিম রক্ত ও মাংস পেশী তৈরীর ক্ষেত্রে।

You may also like...

Skip to toolbar