মুসলমানদের নাহাওয়ান্দ বিজয়।। ১ম অংশ

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

যিয়াদ বিন জুবায়ের বিন  হাইয়্যা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার পিতা আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, ওমর ইবনুুল  খাত্ত্বাব (রাঃ) হারমুযানকে (বন্দি পারসিক সেনাপতি) বললেন, তুমি যখন নিজেকে আমার  তুলনায় দুর্বল ভেবেই নিয়েছ, তখন আমাকে উপদেশমূলক কিছু কথা বল। তাকে তিনি এ কথাও  বললেন যে, তোমার যা ইচ্ছা তাই বল, তোমার কোন ক্ষতি হবে না। অতঃপর তিনি তাকে জীবনের  নিরাপত্তবা দান করলেন। তখন হারমুযান বলল, হ্যাঁ, বর্তমানে পারসিক সেনাবাহিনীর  তিনটি ভাগ রয়েছে। শিরদেশ বা অগ্রবর্তী দল এবং দু’টি ডানা বা দল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,  অগ্রবর্তী দল এখন কোথায়? সে বলল, তারা বুনদারের অধীনে নাহাওয়ান্দে অবস্থান করছে।  তার সাথে রয়েছে কিসরার জেনারেলগণ ও ইস্পাহানের অধিবাসীগণ। তিনি বললেন, আর ডানা দু’টো  (অর্থাৎ অন্য দু’টি দল) কোথায় আছে? হারমুযান একটা জায়গার নাম বলেছিল কিন্তু আমি তা  ভুলে গিয়েছি। হারমুযান তাঁকে এটাও বলল, আপনি দল দু’টো কেটে ফেলুন, দেখবেন শিরদেশ  বা মাথা আপনা থেকেই দুর্বল হয়ে পড়বে। ওমর (রাঃ) তাকে বললেন, আল্লাহর শত্রু, তুই  অসত্য বলেছিস। আমি বরং ওদের মাথা ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিচ্ছি, যাতে আল্লাহ তা  বিচ্ছিন্ন করে দেন। যখন আল্লাহ আমার পক্ষ থেকে মাথাটা কেটে দিবেন তখন দল দু’টো  এমনিতেই কাটা পড়ে যাবে। অতঃপর ওমর (রাঃ) নিজেই উক্ত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রায়  বের হওয়ার অভিমত প্রকাশ করেন। কিন্তু তাঁরা (উপদেষ্টামন্ডলী/মুসলিমজনতা) তাঁকে  বলল, হে আমীরুল মুমিনীন, আমরা আপনাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করতে বলছি। আপনি যদি নিজে  এই অনারব বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে যান আর (আল্লাহ না করুন) আপনি যদি শাহাদাত বরণ  করেন, তাহ’লে মুসলমানদের মধ্যে শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না। তার চেয়ে আপনি বরং  অনেকগুলো সেনাদল প্রেরণ করুন। তিনি তখন মদীনাবাসীদের একটি দল প্রেরণ করলেন, যাদের  মাঝে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ)। আরও প্রেরণ করলেন আনছার ও মুহাজিরদের একটি  দল। সেই সঙ্গে তিনি আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ)-কে বছরার সেনাদল এবং হুযায়ফা ইবনুুল  ইয়ামান (রাঃ)-কে কুফার সেনাদল নিয়ে নাহাওয়ান্দে সকলকে জমায়েত হতে পত্র লিখলেন।  তিনি একথাও লিখে দিলেন যে, তোমরা সব দল একত্রিত হলে তোমাদের আমীর হবে নু‘মান ইবনু  মুকাররিন মুযানী। যখন তারা সবাই নাহাওয়ান্দে সমবেত হলেন তখন বুনদার (আলাজ) তাঁদের  নিকট এই মর্মে আবেদন জানিয়ে একজন দূত পাঠাল যে, হে আরব জাতি, তোমরা আমাদের নিকট  পারস্পরিক আলোচনার জন্য একজন লোক পাঠাও। লোকেরা তখন মুগীরাহ ইবনু শু‘বাকে এজন্য  মনোনীত করল। আমার (বর্ণনাকারীর) পিতা জুবায়ের (রাঃ) বলেন, আমার চোখে এখনও যেন সেই  দৃশ্য ভাসছে- লম্বা, এলোমেলো কেশবিশিষ্ট, এক চোখওয়ালা একজন (দুর্বল) লোক যাচ্ছেন।  তিনি তার নিকট গিয়ে যখন আলোচনা শেষে ফিরে এলেন তখন আমরা তাঁকে বৃত্তান্ত জিজ্ঞেস  করলাম। তিনি আমাদের বললেন, আমি গিয়ে দেখলাম আলাজ (বুনদার) তার পারিষদবর্গের সাথে  পরামর্শ করছে- তোমরা এই আরবীয়র বিষয়ে কী করতে বল? আমরা কি তার সামনে আমাদের  জাঁকজমক, ঠাটবাট, ক্ষমতার আড়ম্বর তুলে ধরব, নাকি তাকে আমাদের অনাড়ম্বর সাদামাটা  অবস্থা দেখাব এবং আমাদের বিত্তবৈভব ও শক্তিমত্তার দিকটা তার থেকে আড়াল করে রাখব?  তারা বলল, না বরং আমাদের যে ঐশ্বর্য ও শক্তি সামর্থ্য আছে তার সেরাটাই তার সামনে  তুলে ধরতে হবে। অতঃপর আমি যখন তাদের দেখা পেলাম তখন তাদের যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র  বল্লম, ঢাল ইত্যাদি আমার দৃষ্টিগোচর হ’ল। সেগুলো এতই জাক-জমকপূর্ণ ছিল যে, চোখে  ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল।

আলাজের পারিষদবর্গকে আমি  তার মাথা বরাবর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলাম। সে ছিল স্বর্ণ নির্মিত চেয়ারে বসা। তার  মাথায় মুকুট শোভা পাচ্ছিল। আমি আমার মত হেঁটে তার কাছে পৌঁছলাম এবং তার সাথে  চেয়ারে আসন গ্রহণের জন্য আমার মাথা একটু নিচু করলাম। কিন্তু আমাকে বাধা দেওয়া হল  এবং ধমক দেওয়া হল। আমি তখন বললাম, দূতদের সাথে তো এমন অশোভন আচরণ করা বিধেয় নয়।  তারা তখন আমাকে বলল, আরে তুই তো একটা কুকুর! একজন রাজার সাথে তুই কি বসতে পারিস?  আমি বললাম, তোমাদের মাঝে এই লোকটার (বুনদারের) যে মর্যাদা, আমি আমার জাতির মাঝে  তার থেকেও বেশী মর্যাদার অধিকারী। এবার বুনদার আমাকে ধমক দিয়ে বলল, আরে বস। আমি  তখন বসে পড়লাম। একজন দোভাষী তার কথা আমাকে অনুবাদ করে দিল। সে বলল, হে আরব জাতি,  তোমরা মানবজাতির মাঝে সবচেয়ে বেশী ক্ষুধার ক্লেশভোগী, তোমাদের মত হতভাগাও আর  দ্বিতীয় নেই, তোমরা এতই নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত যে এ ভুবনে তার জুড়ি নেই, বাড়ি-ঘরের  সঙ্গেও তোমাদের দূরতম কোন সম্পর্ক নেই (তোমরা মরুচারী যাযাবর বেদুঈন)। সব রকম  কল্যাণ থেকে তোমরা বহু দূরে অবস্থিত। এখন আমার চারপাশে যে জেনারেলদের দেখছ, এদেরকে  আমি কেবল এই হুকুমই দেব যে, তারা তীরধনুক ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্রের দ্বারা তোমাদের  গায়ের দুর্গন্ধ দূর করে তোমাদেরকে একেবারে শায়েস্তা করে দেবে। কারণ তোমরা  দুর্গন্ধযুক্ত (অর্থাৎ তারা তোমাদেরকে মেরে ফেলবে)। এখন যদি তোমরা আমাদের এলাকা  ছেড়ে চলে যাও তোমাদের রাস্তা পরিষ্কার করে দেওয়া হবে। আর যদি না যেতে চাও তবে  মৃত্যুর ঠিকানাতেই আমরা তোমাদের আবাস গড়ে দেব। (এবার মুগীরা (রাঃ)-এর বলার পালা)।  মুগীরা (রাঃ) বলেন, আমি তখন আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা ও গুণকীর্তন করলাম। তারপর  বললাম, আল্লাহর কসম, আমাদের গুণ ও অবস্থা বর্ণনায় তুমি একটুও ভুল করনি। আসলেই  বাড়িঘর তথা সভ্যতার থেকে আমরা সকল মানব জাতির তুলনায় অনেক দূরে ছিলাম। ক্ষুধার  তীব্র জ্বালাও আমরা সব মানুষের থেকে বেশী সয়েছি, দুর্ভাগ্যের বোঝাও আমাদের সবচে  বেশী বইতে হয়েছে, সব রকম কল্যাণ থেকে আমরা অনেক দূরে ছিলাম। শেষ অবধি আল্লাহ  তা‘আলা আমাদের মাঝে একজন রাসূল পাঠালেন। তিনি আমাদেরকে দুনিয়াতে বিজয় এবং আখিরাতে  জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিলেন। আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে সেই রাসূলের আগমন থেকে  নিয়ে তাঁর (আল্লাহর) মহান কৃপায় কল্যাণ ও বিজয়ের সঙ্গে আমরা এখন পরিচিত হয়েছি।  শেষাবধি আমরা তোমাদের দরজায় হাযির হয়েছি। আল্লাহর কসম, আমরা তোমাদের যে রাজ্য ও  জীবন-জীবিকা দেখছি তাতে আমরা আর ঐ দুর্ভাগ্যের পানে কখনই ফিরে যাব না। হয় আমরা  তোমাদের মালিকানাধীন যা আছে তা সব জয় করব, নয় তোমাদের দেশেই নিহত হব।

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar