মুসলমানদের নাহাওয়ান্দ বিজয়।। ২য় অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

বুনদার বলল, এই কানা  লোকটা তার মনের কথা সত্যই তোমাদের বলেছে। অতঃপর আমি তার নিকট থেকে উঠে এলাম।  আল্লাহর কসম, ইতোমধ্যে আমার চেষ্টায় আমি আলাজের মনে ভয় ধরাতে সক্ষম হয়েছি। এরপর  আলাজ আমাদের নিকট দূত পাঠাল যে, তোমরা (দজলা নদী) পাড়ি দিয়ে নাহাওয়ান্দে আমাদের  নিকট এসে যুদ্ধ করবে, নাকি আমরা পাড়ি দিয়ে তোমাদের নিকট গিয়ে যুদ্ধ করব? আমাদের  সেনাপতি নু‘মান আমাদেরকে বললেন, তোমরা নদী পার হও। ফলে আমরা নদী পার হলাম। আমার  পিতা বলেন, এ দিনের মত দৃশ্য আমি আর কখনো দেখিনি। আলাজের পারসিক বাহিনী যেন লোহার  পাহাড় হয়ে ধেয়ে আসছিল। তারা পরস্পর অঙ্গীকারা বদ্ধ হয়েছিল যে, তারা আরবদের ভয়ে  পলায়ন করবে না। তাদের একজনকে অন্য জনের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যার সংখ্যা  দাঁড়িয়েছিল সাত। তারা তাদের পেছনে কাঁটা তারের বেড়া দিয়ে রেখেছিল। তারা বলাবলি  করছিল, আমাদের মধ্যে যে পালাতে চেষ্টা করবে সে লোহার কাঁটাতারে জড়িয়ে খুন হবে। মুগীরা  ইবনু শু‘বা (রাঃ) তাদের সংখ্যাধিক্য দেখে বললেন, আজকের মত হতাশা আর কোন দিন লক্ষ  করিনি। আমাদের শত্রুরা আজ ঘুম ত্যাগ করবে, তারা আগে আক্রমণ করবে না। আল্লাহর কসম,  যদি দায়িত্ব আমার কাঁধে থাকত তাহ’লে আমি তাদের আগে আক্রমণ করতাম। এদিকে সেনাপতি নু‘মান  (রাঃ) ছিলেন অধিক কাঁন্নাকাটি করা মানুষ। তিনি মুগীরা (রাঃ)-কে বললেন, আল্লাহ  তা‘আলা যদি আপনাকে অনুরূপ অবস্থার মুখোমুখি করেন, তখন যেন তিনি আপনাকে দুঃখ-বেদনার  মুখোমুখি না করেন এবং আপনার ভূমিকায় আপনাকে দোষী না বানান। আল্লাহর কসম! তাদের  সাথে দ্রুত যুদ্ধে লিপ্ত হতে আমার একটাই বাধা , যা আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) থেকে  লক্ষ করেছি। তিনি যখন যুদ্ধে যেতেন তখন দিনের পূর্ব ভাগে আক্রমণ করতেন না। যতক্ষণ  না ছালাতের ওয়াক্ত হয়, বাতাস বইতে থাকে এবং যুদ্ধ অনুকূলে হয় ততক্ষণ তিনি আগবাড়িয়ে  আক্রমণে যেতেন না। তারপর নু‘মান (রাঃ) এই বলে দো‘আ করলেন যে, হে আল্লাহ! আমি তোমার  নিকট প্রার্থনা করছি। তুমি এমন বিজয় দ্বারা আমার চোখ ঠান্ডা করবে যাতে ইসলাম ও  মুসলিমদের সম্মান এবং কুফর ও কাফিরদের লাঞ্ছনা নিহিত থাকবে। তার পরে তুমি  শাহাদাতের অমিয় সুধা পানের মাধ্যমে আমার জীবনের অবসান ঘটাবে। দো‘আ শেষে তিনি  বললেন, আল্লাহ তোমাদের উপর রহম করুন, তোমরা সবাই আমীন বল। আমরা বললাম, আমীন (হে  আল্লাহ, কবুল কর)। দো‘আ করে তিনি কেঁদে ফেললেন, আমরাও কেঁদে ফেললাম। তারপর আক্রমণ  কীভাবে শুরু হবে সে প্রসঙ্গে নু‘মান (রাঃ) বললেন, আমি যখন আমার পতাকা দুলাব তখন  তোমরা অস্ত্র নিয়ে প্রস্ত্তত হবে। দ্বিতীয়বার যখন আমি পতাকা দুলাব তখন তোমরা  তোমাদের বরাবর যে শত্রু থাকবে তার উপর হামলার প্রস্ত্ততি নেবে। তৃতীয়বার দুলালে  প্রত্যেকেই যেন তার সামনাসামনি অবস্থিত শত্রুর উপর আল্লাহর বরকত কামনা করে আক্রমণ  চালিয়ে যাবে।

অতঃপর যখন ছালাতের সময়  হল এবং বাতাস বইতে লাগল তখন সেনাপতি আল্লাহু আকবার ধ্বনি করলেন, আমরাও তাঁর সাথে  আল্লাহু আকবার বললাম। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম, আল্লাহ চাহে তো এটি বিজয়ের বাতাস।  আমি নিশ্চিত আশা করি যে, আল্লাহ আমাদের দো‘আ কবুল করবেন এবং আমাদের বিজয় অর্জিত  হবে। এই বলে তিনি পতাকা দুলালেন। সৈন্যরা সবাই যুদ্ধের জন্য প্রস্ত্তত হল। তিনি  দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার পতাকা দুলালেন, তখন আমরা একযোগে প্রত্যেকেই নিজের সামনের জনের  উপর আক্রমণ করলাম। মহান সেনাপতি নু‘মান (রাঃ) যুদ্ধের প্রারম্ভে বলেন, আমি নিহত হ’লে  হুযায়ফা ইবনুুল ইয়ামান (রাঃ) দলপতি হবেন। যদি হুযায়ফা নিহত হন তবে অমুক (তারপর  অমুক)। এভাবে তিনি সাত জনের নাম উল্লেখ করেন যাঁদের সর্বশেষ ব্যক্তি ছিলেন মুগীরা  ইবনু শু‘বা (রাঃ)। আমার পিতা বলেন, আল্লাহর কসম, মুসলমানদের এমন একজনও আমার  জানামতে ছিল না, যে নিহত কিংবা জয় ব্যতীত নিজ পরিবারে ফিরে যেতে আগ্রহী ছিল।  প্রতিপক্ষ আমাদের বিপক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে গেল। তখন আমরা কেবল লোহার উপর লোহার আঘাত  ছাড়া আর কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না। এতে করে মুসলমানদের মধ্য থেকে একটি বড় দল নিহত  হ’ল কিন্তু যখন তারা আমাদের ধৈর্য ও দৃঢ়তা দেখতে পেল এবং বুঝতে পারল যে আমরা ফিরে  যেতে ইচ্ছুক নই তখন তারা পিঠ টান দিল। তখন তাদের একজন লোক ঘায়েল হ’লে রশিতে আবদ্ধ  সাত জনই পড়ে যাচ্ছিল এবং সবাই নিহত হচ্ছিল। আর পিছন থেকে লোহার কাঁটা তারের বেড়া  তাদের প্রাণহানি ঘটাচ্ছিল। তখন নু‘মান (রাঃ) বললেন, তোমরা পতাকা নিয়ে সামনে এগিয়ে  যাও। আমরা পতাকা নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকলাম, আর তাদের হত্যা ও পরাস্ত করতে  লাগলাম। তারপর নু‘মান (রাঃ) যখন দেখলেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দো‘আ কবুল করেছেন এবং  তিনি বিজয়ও দেখতে পেলেন ঠিক তখনই একটি তীর এসে তাঁর কোমরে বিঁধল, আর তাতেই তিনি শাহাদত  বরণ করলেন।

এ সময় তাঁর ভাই মা‘কাল  ইবনু মুকার্রিন এগিয়ে এসে একটি কাপড় দিয়ে তাঁকে ঢেকে দেন। তারপর তিনি পতাকা ধারণ  করে এগিয়ে যান এবং বলেন, আল্লাহ তোমাদের উপর রহম করুন, তোমরা সামনে এগিয়ে চল। আমরা  তখন এগিয়ে চললাম এবং তাদের পরাস্ত ও হত্যা করতে লাগলাম। তারপর আমরা যখন যুদ্ধ শেষ  করলাম এবং লোকেরা এক জায়গায় জমা হ’ল তখন তারা বলল, আমাদের আমীর (সেনাপতি) কোথায়?  তখন মা‘কাল বললেন, এই যে তোমাদের আমীর। আল্লাহ বিজয় দ্বারা তাঁর চোখকে ঠান্ডা  করেছেন, আর তাঁর শেষ যাত্রায় শাহাদাত নছীব হয়েছে। তারপর লোকেরা হুযায়ফা ইবনুুল  ইয়ামান (রাঃ)-এর হাতে বায়‘আত হ’ল।

রাবী বলেন, এদিকে ওমর  ইবনুুল খাত্ত্বাব (রাঃ) মদীনায় বসে আল্লাহর কাছে দো‘আ করছিলেন। আর প্রসূতি যেমন  সদ্যপ্রসূত সন্তানের কান্নার আওয়ায শোনার প্রতীক্ষা করে তেমন করে তিনি যুদ্ধের  সংবাদ শোনার প্রতীক্ষা করছিলেন। ইত্যবসরে হুযায়ফা (রাঃ) একজন মুসলিমের হাতে ওমর  (রাঃ)-এর নিকট বিজয় বার্তা লিখে পাঠালেন। সে তাঁর নিকট পৌঁছে যখন বলল, আমীরুল মুমিনীন,  এমন একটা বিজয়ের সুসংবাদ গ্রহণ করুন, যার মাধ্যমে আল্লাহ ইসলাম ও মুসলমানদের  সম্মানিত করেছেন এবং শিরক ও মুশরিকদের অপদস্থ করেছেন। তখন তিনি বললেন, তোমাকে কি  নু‘মান পাঠিয়েছে? সে বলল, আমীরুল মুমিনীন, নু‘মান (রাঃ) পরপারে যাত্রা করেছেন।  একথা শুনে ওমর (রাঃ) কেঁদে ফেললেন এবং ইন্নালিল্লাহ পড়লেন। তারপর বললেন, তোমার উপর  রহম হোক, আর কে কে মারা গেছে? সে বলল, অমুক, অমুক- এভাবে সে বেশ কিছু লোকের নাম  বলল, তারপর বলল। হে আমীরুল মুমিনীন, অন্য আরো অনেকে মারা গেছেন, যাদের আপনি চিনবেন  না। ওমর (রাঃ) তখন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ওমর তাঁদের না চিনলেও তাঁদের কোন ক্ষতি নেই।  কারণ আল্লাহ তা‘আলা তো তাঁদের অবশ্যই চিনবেন।

(ইবনু হিববান হা/৪৭৫৬, বুখারী হা/৩১৫৯, ৩১৬০, সংক্ষিপ্তাকারে; তাবারানী,  তারীখ ২/২৩৩-২৩৫; সিলসিলা ছহীহা হা/২৮২৬)।

-আব্দুল মালেক

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar