যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।। ১ম অংশ

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

রাসূলুল্লাহর (সা) অন্যতম শ্রেষ্ট সাহাবী হযরত যায়িদ (রা) এর বেশ কয়েকটি উপনাম বা ডাকনাম সীরাত গ্রন্থসূমহে পাওয়া যায়। যেমনঃ আবু সাঈদ, আবু খারিজা, আবু আবদির রহমান ও আবু সাবিত।১ মুসলিম উম্মাহ তাকে অনেকগুলি উপধিতে ভূষিত করেছে। যেমনঃ হাবরুল উম্মাহ, কাতিুবুল ওহী ইত্যাদি। মদীনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার সন্তান। পিতা সাবিত ইবন  দাহহাক এবং মাতা নাওয়ার বিনতু মালিক।২ নাওয়ার ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিকের (রা) খান্দনের মেয়ে।

রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় আসার পূর্বে মদীনার অধিবাসীদের পরস্পরের মধ্যে যে সব রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও সংঘর্ষ হয় তার মধ্যে বুয়াস যুদ্ধটি সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। এ যুদ্ধে যায়িদের পিতা সাবিত নিহত ন। এটা হিজরতের পাঁচ বছর পূর্বের ঘটনা। তখন যায়িদের বয়স মাত্র ছয় বছর। তিনি মায়ের তত্ত্বাধানে বড় হন। রসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিযরাতের সময় যায়িদ এগারো বছরের এক বালক মাত্র।৩

তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন মদীনায় ইসলামের ভিত্তি কুব একটা মজবুত হয়নি। মক্কা  থেকে হযরত রাসূলে কারীম (সা) প্রেরিত সুবাল্লিগ হযরত মুসা’য়াব ইবন উমাইর (রা) যখন মাদীায় ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চলেছেন  তখন কোন এক সময়ে আতি অল্প বয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বালেগ হওয়ার পূর্বে ঈমান আনা যাদি কোন গৌরবের বিষয় হয় তাহলে হযরত যায়িদ সেই গৌরবের বিষয় হয় তাহলে হযরত যায়িদ সেই গৌরবের অধিকারী। জীবনের সূচনা থেকেই এভাবে তিনি শিরকের পস্কিলতা থেকে মুক্তি থাকেন।

তিনি ইসলাম গ্রহন পর থেকেই কুরআন পড়তে শুরু করলেন। মানুষ ও তাকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো। তিনি ছিলেন প্রচন্ড মেধাবী ও তীক্ষè ধীশক্তির অধিকারী।৪ রাসূলুল্লাহর (সা) রবার নিয়ে গেল এবং এই বলে পরিচয় করে দিল যে, ছেলেটি নাজ্জার গোত্রের। এরই মধ্যে সে সতেরটি সূরার পাঠ শেষ করেছে। রাসূল (সা) তাঁর মুখ থেকে কুরআন তিলওয়াত শুনে খুব খুশি হলেন।৫ যায়িদ বলেনঃ তখন আমার বয়স মাত্র এগারো বছর।৬ বদর যুদ্ধের সময় তিনি তের (১৩Ñ) বছরের এক বালক মাত্র। যুদ্ধে যাওয়ার বয়স তখনো হয়নি। তবুও আনসারও মুহাজিরগণ যখন বদরের দিকে যাত্রা  করলেন তখন এ বালকও যুদ্ধে যাওয়ার সিন্ধান্ত নিলেন। তাঁরই মত ছোটদের একটি দলের সাথে রাসূলুল্লাহর (সা) সামনে উপস্থিত  হয়ে যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। যুদ্ধের বয়স না হওয়ার কারনে রাসূল (সা) তাদেরকে সান্তনা দিয়ে ফিরিয়ে দেন।৭

হযরত যায়িদ সর্ব প্রথম কোন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন সে বিষয়ে সীরাত বিশেঙ্গদের মতভেদ আছে। আনেকের ধারণা তিনি উহুদে যোগদান করেন। এটাই তাঁর বয়স ষোল পূর্ণ হয়ে গেছে। আবার আনেকে বলেছেন, খন্দক তাঁর জীবনের প্রথম যুদ্ধ।৮ আল ওয়াকিদী বর্ণনা করেছেন, যায়িদ ইবন সাবিত বলেনঃ আমাকে বদর ও উহুদে অংশ গ্রহনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। খন্দকে প্রথম অনুমতি পাই।৯ ইবন হিশামও বলেন, তাঁর বয়স কম হওয়ায় রাসূল (সা) অন্যদের সাথে তাঁকেও উহুদে ফিরিয়ে দেন।১০

হায়াতুস সাহাবা গ্রন্থে যায়িদ ইবন সাবিতের একটি বর্ণনা সংলিত হয়েছে। তাদ্বারা বুঝা যায়, তিনি উহুদে অংশ গ্রহন করেছিলেন। তিনি বলেনঃ উহুদের দিন যুদ্ধ শেষে রাসূল (সা) আমাকে সা’দ ইবনুর রাবীকে খুঁজতে পাঠালেন। যাবার সময় বলে দিলেনঃ যাদি তাঁকে পাও আমার সালাম জানাবে। আর তাকে বলবে রাসূলুল্লাহ (সা) জানতে চেয়েছেন, তুমি নিজেকে কেমন দেখতে পাচ্ছো?

যায়িদ বলেনঃ আমি শহীদদের মাঝে ঘুরে ঘুরে তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। এক সময় পেয়ে গেলাম। তখন তাঁর অন্তিম মুহূর্ত। সারা দেহে তাঁর তীর,বর্শ ও তারবারির সত্তরটি আঘাত। বললামঃ সা’দ  রাসূলুল্লাহ (সা) প্রতি সালাম এবং তোমার প্রতিও। তুমি বলবে, আমি জান্নাতের খোশবু লাভ করছি।১১

যাইহোক, খন্দক যুদ্ধে যে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই। যায়িদ (রা) বলেনঃ রাসূল (সা) আমাকে খন্দকে আংশগ্রহণের অনুমতি দেন এবং এক খন্ড কুবতী (মিসরীয় সূক্ষè ও শুভ্র) বস্ত্র ও দান করেন।১২ খন্দক খনন ও মাটি বহনে অংশ নেন। এ অবস্থায় আম্মার একবার রাসূলুল্লাহর (সা) দৃষ্টিতে পড়লে তিনি মন্তব্য করেনঃ বেশ ভালো ছেলে তো।১৩ এই ঘটনাক্রমে একমসয় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। এই অবস্থায় ইবন হাযাম একটু রসিকাত করে তাঁর কাঁধ থেকে অস্ত্র সরিয়ে নেন। যায়িদ টের পেলেন না। রাসূলুল্লাহ (সা) কাছেই ছিলেন। তিনিও একটু রস করে ডাক দিলেনঃ ইয়া আবা রুকাদ! ওহে নিদ্রাকাতর ব্যক্তি ওঠো। তারপর তিনি লোকদের এ ধরনের মশাকারা করতে নিষেধ দেন।১৪ এই খন্দক থেকে নিয়ে পরবর্তীকালের সকল যুদ্ধ ও অভিযানে তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে অংশগ্রহণ করেন।১৫

তাবুক যুদ্ধের সময় হযরত যায়িদের (রা) গোত্র মালিক ইবন নাজ্জার ঝান্ডা প্রথম ছিল আম্মারা ইবন হাযামের হাতে। পরে রাসূল (সা) সেটি যায়িদের হাতে অর্পণ করেন। এতে আম্মার মানে করেন, হয়তো তাঁর কোন ক্রটি হয়েছে। তিনি প্রশ্ন করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার কোন ক্রটি হয়েছে কি? তিনি জবাব দেনঃ না, তেমন কিছু নয়। আমি কুরআনের বিষয়টি প্রতি লক্ষ্য রেখে একাজ করেছি। যায়িদ তোমার চেয়ে বেশি কুরআন পড়েছি। কুরআনই অগ্রাধিকারযোগ্য।১৬

খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) খিলাফাতকালে ভন্ড নবী মুসায়ালামা আল-কাজ্জাবের সাথে ইয়ামামার যুদ্ধ হয়। এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে যায়িদও (রা) অংশগ্রহণ করেন এবং তাঁর গায়ে একটি তীর লাগে। কিন্তু তিনি মারাতœক আঘাত থেকে বেঁচে যান।১৭ খলীফা উমারের (রা) আমালে খাইবার থেকে ইহুদীদের বিতাড়নের পর তথাকার ওয়াদি-উল-কুরা’ মুসলামানদের মধ্যে বন্টন করা হয়। যায়িদও (রা) একটি অংশ লাভ করেন।১৮

খলীফা উসমান (রা) যখন বিদ্রোহীদের দ্বারা গ্রহবন্দী তখন মদীনার বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি বিদ্রোহীদের সাথে লড়াবার জন্য খলীফার অনুমতি চান। এ সময় যায়িদ ইব্ন সাবিতও (রা) খলীফার সাথে দেখা করে বলেনঃ আনসাররা আপনার দরজায় হাজির আপনি চাইলে তারা আবারও আল্লাহর আনসার হিসাবে কাজ করতে প্রস্তুত। খলীফা বলেনঃ তোমারা যদি লড়াই করার ইচ্ছা করে থাক তাহলে তাতে আমার সম্মতি নাই।১৯

হযরত যায়িদ ইবন সাবিতের (রা) গোটা জীবন সৎকর্মের সমষ্টি। তিনি ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সা) সেক্রেটারী। ওহী লিখতেন। রাসূলুল্লাহর (সা) চিঠি-পত্র লিখতেন এবং যে সব চিঠি-পত্র আসতো তা পাঠ করে শোনাতেন। পরবর্তীকালের খলীফা উমারেরও (রা) সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করেন।২০

পবিত্র কুরআন ইসলারে মূল ভিত্তি। এর সংগ্রহ ও সংকলন করার মহা গৌরবের অধিকারী হলেন কতিবুল ওহী যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।২১ হযরত রাসূলে কারীমের (সা) জীবনকাল পর্যন্ত হাড়, চামড়া খেজুরের পাতা  ও মুসামান হাফেজদের স্মৃতিতে কুরআন সংরক্ষিত ছিলো। বহু সাহাবী কুরআন মুখস্থ করেছিলেন। এ কল হাফেজদের মধ্যে যায়িদও একজন।

হযরত রাসূলের কারীমের (সা) ইনতিকালের পর আরব উপদ্বীপের একদল মানুষ মুরতাদ (ইসলাম ত্যাগ করা) হয়ে মুসায়লামা আলÑকাজ্জাবের দলে ভিড়ে যায়। সে ইয়ামামায়ে নিজেকে নবী বলে ঘোষনা করে। হযরত আবু বকর (রা) তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষনা করেন। মুসয়ালামা ইয়ামামার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। তবে এ যুদ্ধে ৭০ জন হাফেজ  কুরআন শাহাদাত বরণ করেন।

এ ঘটনার পর হযরত উমারের (রা) অন্তরে কুরআন সংগ্রহ করার অনুভূতি সৃষ্টি হয়। তিনি খলীফা আবু বকরকে (রা) বলেন, এভাবে হাফেজদের শাহাদাতের ধারা অব্যাহত থাকলে কুরআনের বিরাট অংশ এক সময় হারিয়ে যাবার আশংকা আছে। সুতারং বিলম্ব না করে গোটা কুরআন এক স্থানে সংগ্রহ করার ব্যবস্থা নিন। খলীফা তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেন। তিনি যায়িদ ইবন সাবিতকে ডেকে বলেন,  তুমি একজন বুদ্ধিমান নওজোয়ান। তোমার প্রতি সবার আস্থা আছে। তুমি রাসূলুল্লাহর (সা) জীবদ্দশায় ওহী লিখেছিলে। সুতারা এ কাজটি সম্পাদন কর।২২

হযরত যায়িদ (রা) বলেনঃ আল্লাহর কসম! তাঁরা আমাকে কুরআন সংগ্রহ করার যে নির্দেশ দিয়েছিলেন তা করার চেয়ে একটি পাহাড় সরানোর দায়িত্ব দিলে তা আমার কাছে অধিকতর সহজ হতো।২৩ তিনি খলীফাকে বললেনঃ তা ঠিক। তবে ভালো কাজে অসুবিধা কি? তারপরেও যায়িদ কাজটি করতে ইতস্তত করতে থাকেন। খলীফা বিভিন্নভাবে বুঝানোর পর তিনি রাজী হয়ে গেলেন।২৪

এ কাজে যায়িদকে সহোযোগিতার জন্য খলীফা আবু বকর (রা) আরও একদল সাহাবাকে দিলেন। দলটির সংখ্যা ৭৫ বলে বর্ণিত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে উবাই ইবন কা’ব ও সা’ ঈদ ইবনুল আসও (রা) ছিলেন। হযরত যায়িদ খেজুরের পাতা, পাতলা পাথর ও হাড়ের ওপর লেখা কুরআনের সকল অংশ সংগ্রহ করলেন। হাফেজদের পাঠের সাথে তা মিলিয়ে দেখলেন। তিনি নিজেও আল কুরআনের একজন হাফেজ ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনকালে আল কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন।২৫

আয়াতের সত্যতা এবং বিশুদ্ধাতা যাচাইয়ের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে বিতর্ক ও ঝগড়ার পর্যায়ে চলে যেত। এক স্থানে পৌঁছে যায়িদ বললেন, এরপর আমি রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট রজমের আয়াত থেকে শুনেছিলাম। হযরত উমার (রা) বললেনঃ কিন্তু রাসূল (সা) তা লেখার  আনুতি দেননি।২৬ মোট কথা কঠোর পরিশ্রম করে হযরত যায়িদ (রা) এ গুরুত্বপূর্ন কাজ সমাপ্ত করেন।তাঁর দ্বারাই সম্পর্ণ আল কুরআন সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করা হয়।

একটি আয়াতের ব্যাপারে দ্বিতীয় কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছিল না। প্রমানের নিয়ম ধরা হয়েছিল প্রতিটি আয়াতের ব্যাপারে কম পক্ষে দু’ ব্যক্তি সাক্ষ্য। আয়াতটি ছিল হযরত আবু খুযায়মার (রা) নিকট। ইনি সেই আবু খুযায়মা যাঁরা একার সক্ষ্যকে রাসূল (সা) দুজনের সাক্ষোর সমান বলে ঘোষনা দিয়েছিলেন। একারণে হযরত যায়িদ উক্ত আয়াতিটি ব্যাপারে দ্বিতীয় কোন সাক্ষ্যের প্রযোজন মনে করেননি। তাছাড়া আয়তটি তাঁর নিজের জানা ছিল।২৭ হযরত যায়িদ (রা) কর্তৃক সংগৃহীত ও লিখিত কুরআন মাজীদের এ কপিটি খলীফা হযরত আবু বকর (রা) নিজের হিফাজতে রাখেন। তাঁর ইনতিকালের পর দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমারের (রা) হাতে হয়ে তা তাঁর কণ্যা উম্মুল মুমিনীন হযরত হাফসার (রা) এর হাতে পৌঁছে এবং সেখানে সংরক্ষিত হয়।২৮

তৃতীয় খলীফা হযরত উসমানের (রা) খিলাফতকালে বিভিন্ন অঞ্চলে যখন আল কুরআনের পাঠে তারতম্য দেখা দেয় তখন হযরত হুজায়ফা ইবনুল ইয়মান (রা) খলীফাকে পরামর্শ দেন যে, ইহুদি ও নাসারাদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হওয়ার পূর্বেই আননি তা রোধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। খলীফাও এর গুরুত্ব ও প্রয়োজন অনুধাবন করেন। তিনি হযরত যায়িদের (রা) সংগৃহিত আল কুরআনের কপিটি হযরত হাফসার (রা)নিকট থেকে চেয়ে নেন। তারপর হযরত যায়িদ ইবন সাবিত,আবদুল্লাহ ইবনুয্য়ুবাইর, সা’ঈদ ইনুল আসও আবদুর রহমান ইবনুল হারেস ইবন হিশাম (রা) এ চারজন বিশিষ্ট সাহাবিকে তার থেকে কপি করার নির্দেশ দেন। তাঁর হযরত আবু বকর (রা) ঐ মূল কটি থেকে পাঁচ কপি নকল করে দেন। খলীফা উসমান (রা) এই কপিগুলো খিলাফতের পাঁচটি অঞ্চেলে পাঠিয়ে দেন এবং হযরত আবু বকর (রা) কর্তৃক প্রস্তুকৃত মূল কপটি যা মাহসাফে সিদ্দীকী নামে প্রসিদ্ধ -আবার হযরত হাফসার (রা) নিকট ফিরিয়ে দেন।২৯ নিরক্ষর নবী মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ (সা) ওহী লেখার দায়িত্ব বিভিন্ন সাহাবীর ওপর অর্পণ করেছিলেন। এ সকল ভাগ্যবান সাহাবীর অন্যতম হলেন হযরত যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।

হযরত যায়িদ কলম, কাগজ, দোয়াত, খেজুর পাতা, চাওড়া ও পাতলা হাড়, পাথর ইত্যাদি নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে বসে যেতেন। যখন ওহী অবতীর্ণ হতো রাসূল (সা) বলে, যেতেন, আর তিনি লিখে চলতেন। লেখা সম্পর্কে বিশেষ কোন নির্দেশ থাকলে রাসূল (সা) তা বলে দিতেন, আর যায়িদ তদানুযায়ী কাজ করতেন।

ইমামা বুখারী (রহ) আল-বারা (রা) থেকে বর্ণনা করেছের। যখন সূরা আন-নিসার ৯৫ নং আয়াতটি-

(গৃহে উপবিষ্ট মুসলমান এবং ঐ মুসলমান য়ারা জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে-সমান নয়।) নাযিজ হলো তখন রাসূল (সা) বললেনঃ কাঠ দোয়াত হাড়, নিয়ে যায়িদকে আমার কাছে আসতে বলো, যায়িদ এলে তিনি আয়াতটি লিখতে বললেন। রাসূলুল্লাহর (সা) পিছনে তখন অন্ধ সাহাবী আমার ইবন উম্মে মাকতুম বসা ছিলেন। তিনি বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ!আমার ব্যাপারে কি হুকুম? আমি তো একজন অন্ধ মানুষ। তখন যাদের কোন সঙ্গত ওযর নেই অংশটি নাযিল হয়। তখন রাসূল (সা) যায়িদকে আয়াতটি এভাবে সাজিয়ে বলেনঃ৩০ যায়িদ পরে অবতীর্ণ অংশটুকু হড়ের ফাটার মধ্যে লিখে নেন। কারন, যে হাড়টি মধ্যে পূর্বে আয়াতটি লেখা হয়েছিল তা ফাটা ছিল।৩১

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের সাথে সাথে আনসাদের মধ্যে খিলাফতের বিষয়টি প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁরা সাকীফা বনী সায়িদায় সমবেত হন এবং তাদের নেতৃত্বের আসন অলস্কৃত করেন প্রখ্যাত আনসারী সাহাবী হযরত সাদ ইবন উবাদা (রা) তাঁরই মনোনীত ব্যক্তিরা সেখানে বক্তৃতা করছিলেন এবং আনসারদের একটি বড় দল ছিলেন তাঁর সমর্থক। এ মজলিসে যায়িদ ইবন সাবতও উপস্থিত  ছিলেন। কিন্তু জনতার মতেন বিরুদ্ধে তখন কথা বলা সহজ ছিল না। এ জন্য তিনি চুপ করে বসে থাকতেন।

তারপর হযরত আবু বকর উমার ও আবু বকর উবাইদাহ (রা) সাকীফা বনী সায়িদাÑয় পৌঁছালেন এবং মুহাজিরদের পক্ষ থেকে উমার (রা) খিলাফাতের বিষয়টি আলোচনা শুরু করলেন। তখন সর্ব প্রথম যে আনসারী ব্যক্তি তাঁর বক্তব্য সমর্থন করেন তিনি যায়িদ ইবন সাবিত।

হযরত হুবাব ইবনুল মুনজির (রা) একজন আনসারী ও বদরী সাহাবী।  তিনি যখন তাঁর বক্তৃতায় দুই আমীরের তত্ব পেশ করে মুহাজিরদের লক্ষ্য করে বললেনঃ আপনাদের মধ্য থেকে একজন এবং আমাদের মধ্যে থেকে একজন আমীর হবেন। এছাড়া আর কিছুতেই আপোষ হবেনা। তখন যায়িদ ইবন সাবিত উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর বক্ত্যব্যের প্রতিবাদ করে এক নতুন তত্ব দিলেন। তিনি বলেনঃ রাসূল (সা) ছিলেন একজন মুহাজির। এখন ইমাও হবেন একজন মুহাজির। আর আমরা যেমন ছিলাম রাসূলের (সা) আনসার তেমনিভাবে এখন হবো ইমামের আনসার। একথা বলে তিনি আবু বকরের (রা) একটি হাত ধরে আনসারদের লক্ষ্য করে বলেনঃ এই তোমাদের বন্ধু তোমার হাতে বাইয়াত কর।৩২

হযরত যায়িদ (রা) এ বক্তব্য ছিল তারই গোত্রের লোকদের বিপক্ষে। তা সত্ত্বেও  স্বীয় অনুভূতি প্রকাশ করতে কুন্ঠবোধ করেননি। তাঁর বক্তব্য শেষ হরে হযরত আবু বকর (রা) দাঁড়িয়ে যায তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বরেন, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান দিন। যদি এর বিপরীত কিছু বলা হতো তাহলে  আমার  হয়তো মনতাম না।৩৩

হযরত রাসূলে করীম (সা) মদীনায় আসার পর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশ ও এলকার রাজা বাদশা, আমীর উমা, ও গোত্র প্রধানদের চিঠিপত্র বিভিন্ন সময় তাঁর নিকট আসতে থাকে। যার বেশীর ভাগই হতো সুরইয়সী ও ইবরানী হিব্র“ ভাষায়। মদীনায় তখন এ দুটি ভাষা জানতো শুধু ইহুদিরা। তাদের ছির আাবার ইসলামের সাথে চরম দুশমনী। এ কারণে উক্ত ভাষা দুটি আয়ত্ত করা ছিল মুসলমাদের একান্ত প্রয়োজন।

হযরত রাসূলে করীম (সা) এ প্রয়োজনে তীব্রভাবে অনুভব করলেন। তিনি হযরত যায়িদের (রা) মেধার পরিচয় পেয়ে তাঁকেই এ কাজের জন্য নির্বাচিত করলেন। এ প্রসঙ্গে হযরত যায়িদের (রা) একটি বর্ণনা উদ্ধৃত হলোঃ

রাসূল (সা) মদীনায় এলে আমাকে তাঁর সামনে হাজির করা হয়। তিনি আমাকে বললেনঃ যায়িদ আমার জন্য তুমি ইহুদিদের লেখা শিখ। আল্লাহর কসম! তারা আমার পক্ষ থেকেইবরানী ভাষায় যা কিছু লিখা থাকে তার ওপর আমার আস্থা হয় না। তাই আমি ইবরনী ভাষা শিখলাম। মাত্র আধা মাসের মধ্যে এতে দক্ষতা অর্জন করে ফেললাম। তারপর রাসূলুল্লাহর (সা) ইহুদীদেরকে কিছু লেখার দরকার হলে আমিই লিখতাম এবং রাসূলকে (সা) কিছু লিখলে আমিই তা পাঠ করে শুনাতাম।

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar