যায়িদ ইবন সাবিত (রা)।। ৪র্থ অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

ফিকাহর অন্য সকল অধ্যায়ের চেয়ে ফারায়েজ এর অধ্যায় ছিল হযরত যায়িদের বিশেষ পারদর্শিতা। রাসূলুল্লাহর (সা) একটি হাদীসে এসেছে:৮২ আমার উম্মতের সবচেয়ে বড় ফারায়েজ শাস্ত্রে ফরেজ বিশেষজ্ঞ যায়িধ ইবন সাবিত। রাসূলুল্লাহর (সা) এ নদ দ্বারা বুঝা যায় তিনি ফারায়েজ শাস্ত্রে কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। সাহাবায়ে কিরামও এ শাস্ত্রে তাঁর পন্ডিত্য স্বীকার করতেন। খলীফা উমার (রাা) তাঁর জাবীয়ার ঐতিহাসিক ভাষণে অগণিত শ্রোতার সামনে ঘোষণা করেনঃ ফারায়েজ স্মপর্কে কারো কিছু জিজ্ঞাসার থাকলে সে যেন যায়িদ ইবন সাবিতের নিকট যায়।৮৩ তাঁর সমকালীন লোকেরা বলতো,যায়িদ ফারায়েজ ও কুরআনে অন্যদের অতিক্রম করে গেছেন।৮৪

ফারায়েজ শাস্ত্রটি বেশ জটিল। কুরআনে  এ মাস্ত্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ মাসায়ালা সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। তার বিস্তরিত ব্যাখ্যাÑ বিশ্লেষণ রাসূলুল্লাহর (সা) বানী, কর্ম এবং সাহাবায়ে কিরামের (সা) ফাতওয়া ও বিচার আচার থেকেই গ্রহণ করা হয়। কুরআনে মীরাস ওঅসীয়াত বিষয়ে যা কিছু এসেছে তা অতি চুম্বক কথায়। তাতে স্বমীÑস্ত্রী, পুত্রÑকন্যা, মাতা, পিতা, ভ্রাতাÑভগ্নি ইত্যাতি ধরনের ইত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অংশ ঘোষণা করে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি এ সীমা লংঘন করবে সে হবে মূলত নিজের ওপর অত্যাচারী।

হযরত রাসূলে কারীম (সা) বিচার ফায়সালার  মধ্যোমে এই সংক্ষিপ্ত বিধানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর ইনতিকালের পর যায়িদ (রা) এ শাস্ত্রের এত উন্নতি সাধন করেন যে,তাঁর পরেই এ বিষয়ে গ্রন্থ রচিত হয় এবং বিষয়টি একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রে পরিণত হয়। হযরত আবদুল্লাহ  ইবন উমারের (সা) মত জ্ঞানী ও উঁচু মর্যাদার সাহাবীরাও যায়িদের (রা) এর নিকট ফারায়েজ সংক্রান্ত মাসায়ালর সমাধান জানতে চাইতেন।

ইয়ামামরা নিহত অধিবাসীদের ব্যাপার হযরত আবু বকর (রা) হযরত যায়িদের (রা) ফাতওয়া অনুযায়ী ফায়সারা করেন। অর্থ্যৎ যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদেরই মৃতদের ওয়ারিস নির্ধারণ করেন। মৃতদেরকে পরস্পর ওয়ারিস নির্ধরাণ করেননি।৮৫

আমওয়াসের তা’উন মাহমারীতে যখন গোত্রের পর গোত্র মৃত্যু বরণ করে তখন উমার (রা) যায়িদের (রা) উল্লেখিত মতের ওপর ভিত্তিতে সমাধান দেন। এমন কি হযরত আবদুল্লাহ ইবনর আব্বাস (রা) যাঁকে উম্মাতের তত্ত্বজ্ঞনী ও জ্ঞানের সাগর বলা হয়, তিনিও যায়িদের (রা) সমাধানে নিশ্চিত হতেন।

একদিন তিনি ছাত্র আকরামকে একথা বরে পাঠালেন, তুমি যায়িদকে জিজ্ঞেসা করে এসো যে,এক ব্যক্তি স্ত্রী ও মাতা পিতা রেখে মারা গেছে, তার মীরাস কিভাবে বন্টিত হবে? যায়িদ বললেন, স্ত্রী অর্ধেক এবং বাকী অর্ধেকের একÑতৃতীয়াংশ মাতা এবং অবশিষ্ট যা থাকবে তা পাবে পিতা। ইবন আব্বাসের (রা) ধারনো ছিল ভিন্ন। তিনি মনে করতেনর মাতা পাবে একÑতৃতীয়াংশ। এজন্য আবার জানতে চাইলেন, এরকম বন্টন কি কি কুরআনে আছে, না এা আপনার নিজের মত? যায়িদ (রা) বললেন, এ  আমার ইজতিহাদ। আমি মাতাকে পিতার ওপর প্রাধান্য দিতে পারিনে।৮৬

খিরাফতের প্রতন্ত অঞ্চল থেকে জনগণ লিখিত আকার ফাতওয়া চেয়ে চিঠি লিখতো। তিনিও লিখিত জবাব দিতেন। আমীর মু’য়াবিয় (রা) একবার চিঠি মারফত দাদার অংশ সস্পর্কে  যায়িদের (র) ফাতওয়া জানতে চান। হযরত যায়িদ (রা) জবাবে যে লিখিত ফাতওয়াটি দান করেন তা কানযুল উম্মাল গ্রন্থে বর্ণিত হযেছে। তিনি সেই চিঠিতে খলীফা উমার (রা) ও উসমান যেখাবে দাদার অংশ বন্টন করেছিলেন তা উল্লেখ করেন।৮৭

হযরত যায়িদ (র) ফারয়েজের নানা ধারনের জিজ্ঞসা বা মাসয়ালর সমাধান খলীফা উমারের (রা) আমলেই বিন্যাস করেন।৮৮ তাঁর বোধা ও বুদ্ধিতে নতুন সম্যসার উদয় হতো আর তিনি তার সামাধান বের করতেন। পরবর্তীাকলে এ সব সমাধান এ শাস্ত্রের অবিচ্ছিন্ন অংশে পরিণত হয়।

হযরত যায়িদ (রা) দাদা মীরাসের ব্যাপারে যে সিদ্ধন্ত দান করেন সাহাবাদের মধ্যে অনেকেই তার  বিরোধীতা ছিলেন। তবে জনতার সমর্থর তার পক্ষেই ছিল। ফারায়েজ শাস্ত্রে দাদার মীরাস একটি দারুণ মতবিরোধ পূূর্ণ মাসায়াল। এমন কি হযরত যায়িদ (রা) এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। ইমাম বুখারী আল Ñফারায়েজ অধ্যায়ে দাদার মীরাস শিােনামে একটি অনুচ্ছেদ এনেছেন। তাতে তিনি এ মতবিরোধের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তিনি একাথাও বলেছেন এ বিষয়ে ইবন উমার আলী, ইবন মাসউদ, ও যায়িদের (রা) বিভিন্ন রকম কথা বর্ণিত হয়েছে।৮৯ তবে যে মতের ওপর হযরত যায়িদের (রা) শেষ জীবন পর্যন্ত অটল ছিলেন উামর ও উসমান (রা) সেটাই প্রয়োগযোগ্য মনে করেছেন।

ইসলামের ইতিহাসে হযরত উমার (রা) সর্বপ্রথম দাদার অংশ গ্রহণ করেন। তাঁর এক পৌত্র মারা গেলে তিনি নিজেকে তার যাবতীয় সম্পত্তির অধিকারী মনে করতে থাকেন। লোকেরা এর বিরোধীতা মত পোসন করতে থাকে। একদিন হযরত উমার যখন হযরত যায়িদের (রা) বাড়ীতে উপস্থিত হরেন তখন তিনি চিরুনী করছিলেন এবং দাসী তার চুল পরিপাটি করে দিচ্ছিলেন। হযরত যায়িদ (রা) খলীফাকে বললেন, কষ্ট করে আসার কি প্রয়োজন ছিল, ডেকে পাঠালেই তো পারতেন। খলীফা বললেন একটি মাসায়ালা সম্পর্কে পরামর্শ করতে এসেছি। যদি আপনার ওপর কোন রকম বাধ্যবাধকতা নেই। যায়িদ এ অবস্থায় মতামত দিতে অস্ককৃতি জানালেন। উমার ফিলে গেলেন। অন্য একদিন আবার গেলেন। যায়িদ বললেনম আমার সিন্ধান্ত আমি লিখিতভাবে জানাবো। অতঃপর তিনি শাজারার আকৃতিতে বিন্যাস  করে অংশ বন্টন করেন। হযরত উমার (রা) জনগনের উদ্দেশ্যে ভাষণ দানকালে বলেন, যায়িদ ইবন সাবিত এটি লিখে আামার কাছে পাঠিয়েছেন। আমি তা চালু করছি।৯০

হযরত যায়িদের  (রা) ইলমে ফারায়েজ গ্রন্ধাবন্ধ করেন এবং এর বিভিন্ন খুটিনাটি বিষয়ে গবেষনা করে নতুন নতুন মাসায়ালাও সৃষ্টি করেন। তবে এর মধ্যে তাঁর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উদ্ভবধন হলো মাসায়ালা অওলে। কিছু লোকে ধারণা আওলের উদ্ভাবক হলে হযরত আব্বাস (রা)। কিন্তু এ দারণা বর্ণনা ও যুক্তি উভয়ের পরিপন্থি।

প্রথমত: এ ধারণার পশ্চাতে তেমন কোন সনদ নেই। দ্বিতীয়ত: হযরত আব্বাসের (রা) ফারায়েজ শাস্ত্রে তেমন বুৎপত্তি ছিলনা। এ কারণে এ জাতীয় উদ্ভবনা তাঁর প্রতি আরোপ করা যুক্তির পরিপন্থি।

হযরত যায়িদ (রা) ফারায়েজ শাস্ত্রেও যতটুকু খিদমাত করেছেন তা উপরোক্ত আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীমের বানীÑ আমর উম্মাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারায়েজ বিশেষজ্ঞ হচ্ছে যায়িদ’ Ñ অক্ষরে অক্ষরে  সত্যে পরিণত হয়েছে। হযরত যায়িদের (রা) অসাধারণ বুদ্ধি তীক্ষè, মেধা ও অভিনব চিন্তাশক্তী দেখে সে যুগের উলামাÑমাশায়েখ দারুন বিস্মিত হয়েছেন। উলুমে শারা’য়িয়্যা ছাড়াও পার্থিব জ্ঞান বিজ্ঞানে তিনি যে কতখানি পারদর্শী ছিলেন সে সম্পর্কেও কিছু আলোকপাত করা প্রয়োজন। এখানে তার কিছু তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

যায়িদ (রা) রাসুলে কারীমের (সা) নির্দেশে মুতাবিক হিব্র“ ও সুরইয়ানী ভাষা শিখেছিলেন। তাঁর মেধা এত তীক্ষè ছিল যে মাত্র পনেরো দিনের চেষ্টায় এ ভাষা দুটিতে এতখানি দক্ষতা অর্জন করেন যে, আনায়াসে চিঠি লিখতে সক্ষম হন।  পরে আরো চর্চার ফলে এতখানি উন্নতি হয় যে তাওরাত ও ইনজীলের ভাষাসমূহ একজন আলেমে  পরিণত হন। মাসউদী লিখেছেন, তিনি ফার্সী, রোমান হাবশী ভাষাগুলোও জানতেন। এগুলি তিনি শিখেছিলেন মদীনায় যারা এ ভাষা জানতো তাদের নিকট থেকে।৯১

তৎকালীন আরবে হিসাব বা অংক শাস্ত্রের তেমন প্রচলন ছিলনা। এ কারণে ইসলামের প্রথম পর্বে খারাজের হিসাবপত্র অথবা রোমান অথবা ইরানীরা করতো। আরববাসী হাজারের ওপর গণান করতে জানতো না। আরবীতে হাজারেরও ওপর সংখ্যার জন্য কোন শব্দও ছিলনা। কিন্তু যায়িদের (রা) অংকে এতখানি পারদর্শিতা ছিল যে, ফারায়েজ শাস্ত্রেও অতি জটিল ও সূক্ষè মাসায়ালা সমূহ ও অংক দ্বারা সমাধান করতেন। তাছাড়া অর্থ সম্পর্দেও বন্টনও করতে পারতেন। হিজরী ৮ম সনে হুনাইনর যদ্ধ হয়। এতে প্রায় বারো হাজার মানুষ অংশ গ্রহণ করে। তাঁরই আদমশুমারী ও প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী রাসূলে (সা) মালে গানীমত বন্টন করেন। প্রথমে তিনি মানুষের সংখ্যা অবগত হন। তারপর মালে গানীমত উক্ত সংখ্যার ওপর বিছিয়ে দেন। এননিভাবে ইয়ারমুকের যুদ্ধেও মালে গনীমাত মদীনায় আসলে যায়িদই (রা) তা বন্টন করেন।৯২

ইসলামÑপূর্ব আরবে লেখার তেমন প্রচলন ছিলনা, সুপ্রাচীন কালের বর্ণনা সমূহ তারা স্মৃতিতে বংশপরম্পর ধরে রাখতো। যায়িদ (রা) লিখতে জানতেন এবং তার সমকালে তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত লেখক। বিভিন্ন ফরমান চুক্তিপত্র চিঠিপত্র লেখা ছাড়াও সুন্দও অস্কন ও জানতেন।

খলীফা উমারের (রা) সময়ে আরবের বিখ্যাত দুর্ভিক্ষ আম্মুর রামাদাহ দেখা দেয়। এ দুর্ভিক্ষ মুকাবিলার জন্য তিনি মিসরের গভর্ণর আমর ইবনুল আসাকে (রা) খাদ্যশস্য পাঠতে বলেন। আমার ইবনুল আস (রা) বিশটি জাহাজ বোঝাই  করে খাদ্য শস্য রাজধানী মাদীনায় পাঠান। উমার (রা) অত্যন্ত  বিচলিতভবে জাহাজের প্রতীক্ষায় থাকেন। যায়িদ সহ আরো কিছু সাহাবীকে সংগে নিয়ে তিনি মদীনার নিকটবর্ত জার নামক বন্দরে চলে যান। খাদ্যশস্য ভর্তি জাহাজ এলে সেখানে দুটি গুদাগম বানিয়ে তাতে সংরক্ষন করেন। তিনি যায়িদকে দুর্ভিক্ষ কবলিত মাসুষের একটি তালিকা ও তাদের প্রত্যেকের জন্য বরাদ্দকৃত শস্যেও পরিমাণ লেখা তাকে এমন একটি ফর্দ তৈরী করতে নির্দেশ দেন। এ নির্দেশের ভিত্তিতে যায়িদ একটি রেজিস্টার তৈরী করেন, প্রত্যেককে একটি কাগজের চাকতি দেন যার নিচে উমারের (রা) সীলÑমোহর লাগানো ছিল। চাকতি তৈরী ও তাতে মহোর লাগানোর ঘটনা ইসলামে ছিল এটাই প্রথম। আর এর রুপকার ছিলেন যায়িদ।

ইসলামের আসল উদ্দেশ্য হলো মহত্তম চারিত্রের পূর্ণতা সাধন। তাঁর চরিত্রের যে সকল গুণÑবৈশিষ্ট উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তা হলো হুব্বে রাসূল, ইত্তেবায়ে রাসূল, আমর বিল মারুফ, শাসকদের প্রতি উপদেশ নসীহত ও মুসলি উম্মার কল্যাণ কামনা।

রাসূলের প্রতি প্রবল ভালবাসার কারণে অধিকাংশ সময় তাঁর দরবারে উপস্থিত থাকতেন। প্রত্যূষে ঘুম থেকে উঠে সোজা রাসূলুল্লাহর (সা) খিদমতে হাজির হয়ে যেতেন। কোন কোন সময় এত সকালে যেতেন যে, রাসূলের (সা) সাতেই সেহরী খেতেন। রাসূল (সা) তাঁকে স্বীয় কক্ষে ডেকে নিতেন।৯৩

একদিন রাসূলুল্লাহর (সা) নিকট গিয়ে দেখতে পান, তিনি খেজুর দিয়ে সেহরী খাচ্ছেন। তাঁকেও আহারে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দিলেন। যায়িদ বললেন, আমি রোযা রাখার ইরাদা করেছি। রাসূল (সা) বললেন আমরাও তো এটাই ইরাদা। সেদিন হযরত যায়িদ রাসূলের (সা) সঙ্গে সেহরী খান। কিছুক্ষন পর নামাযের ওয়াকত হলে তিনি রাসূলের (সা) সাথে মসজিদে যান এবং তাঁর সাথে নামায আদায় করেন।৯৪

যায়িদ (রা) অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে বসে যেতেন। রাসূল (সা) তাঁর সাথে এতখানি খোলামেলা ছিলেন যে কখনো কখনো নিজের হাঁটু যায়িদের রানের ওপর রেখে যেতেন। একদিন তো এ অবস্থায় ওহী নায়িল হয়। যায়িদ বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহর (সা) হাঁটু এ সময় এত ভারী মনী হচ্ছিল যে তার ভার সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। মনে হচ্ছিল যে আমার রান ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। কিন্তু বেয়াদবী হয় এ ভায়ে তিনি উহ শব্দটিও উচ্চারণ করেননি। চুপ করে বসে থাকতেন।৯৫

রাসূলুল্লাহর (সা) নির্দেশ পালন বিন্দুমাত্র হেরফের বরদাশত করতেন না। একবার শামে গেলেন আমীর মুয়াবিয়ার (রা) নিকট। তাঁর কাছে একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। মু’য়াবিয়ার (রা) এক ব্যক্তিকে হাদীসটি লিখে রাখার জন্য বললেন। যায়িদ (রা) বললেন, রাসূলুল্লাহর (সা) হাদীস লিখতে নিষেধ করেছেন। এরপর তিনি তাঁর লিখিত অংশটুকু মুছে দেন।৯৬

আমীর উমারাদের সামনেও তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাতের প্রচারের ব্যাপারে চুপ থাকতেন না। মারওয়ান ইবনুল তখন মদীনার গভর্ণর। তিনি মাগরিব নামাযে ছোট ছোট সুরা পড়তেন। যায়িদ বললেন, এমনটি করেন কেন? রামূল (সা) তো বড় বড় সূরাও পড়তেন।৯৭

সাহাবা ও তাবেঈনদের কেউ কখনো অজ্ঞতাবশত সুন্নাতের পনিপন্থী কোন কাজ করে বসলে যায়িদ তাঁকেও সতর্ক করে দিতেন। একবার গুরাইবীল ইবন সা’দ (রা) বাজারে একটি পাখি ধরেন। যায়িদ তো তা দেখে ফেলেন। তিনি তাঁর কাছে গিয়ে তাঁকে এক থাপ্পড় মারেন এবং পাখিটি ছিনিয়ে উড়িয়ে দেন। তারপর তাঁতে লক্ষ্য করে বলেন, ওরে নিজের শক্র, তোমার জানা নেই যে, রাসূল (সা) মদীনাকে হারাম ষোঘণা করেছেন!৯৮

একবার তিনি শুরাহবীলকে বাগানে জাল পাততে দেখে চেঁচিয়ে উঠালেনÑ এখানে শিকার করা নিষেদ্ধ।৯৯

শাম থেকে এক ব্যক্তি মদীনায় এলো যয়তুনের তেল বিক্রী করতে। আনেক ব্যবসায়ী কথাবার্তা বললো। আবদুল্লাহ ইবন উমার কথাবার্তা বলে তেল খরীদ করেন নিলেন। মাল সেখানে থাকতেই দ্বিতীয় ক্রেতা পাওয়া গেল। সে আবদুল্লাহ ইবন উমারকে বললেন, আমি আপনাকে এত লাভ দিচ্ছি। আমার কাছে বিক্রী করে দিন। ইবন উমার রাজী হয়ে গেরেন। তিনি কথা পাকাপাকি করার জন্য তার হাতের ওপর স্বীয় হাত রাখবেন, এমন সময় পিছন থেকে একজন তাঁর হাত টেনে ধরেন। তিনি তাকিয়ে দেখেন যায়িদ ইবন সাবিত। তিনি ইবন উমারকে বললেন, এখন বেচো না। প্রথমে মাল এখানে থেকে সরিয়ে নাও। কারণ রাসূল (সা) এমনভবে বেচাকেনা করতে নিষেধ করেছেন।১০০

একবার তিনি দুপুরের সময় মদীনার গভর্ণর মারওয়ানের বাড়ী থেকে বের হলেন। শিষ্য শাগারিদরা তা দেখে ফেলে। তারা মনে করলো, হয়তো বিশেষ কোন প্রয়োজনে গিয়েছিলেন। তারা এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করেলো। যায়িদ বললেন, এ সময় তিনি কয়েকটি হাদীস জিজ্ঞেসা করেছিলেন। আমি তাঁকে বলেছি, তিনটি অভ্যাসের ব্যাপারে মুসলামনের অন্তর বিরুপ ভাব জন্মবে না। তাহলো আল্লাহর জন্য কাজ রার শাসকদের নসীহত করা জামায়াতের সাথে থাকা।১০১

উবাদা ইবন সামিত ছিলেন একজন উঁচু স্তরের সাহাবী। একবার তিনি বায়তুল মাকদাস গেলেন। সেখানে একজন থাবাতী ব্যক্তিকে  তাঁর বহানটি একটু ধরতে বললেন। সে ধরতে অস্বীকৃতি জানালো। উবাদা তাকে খুব ধমকালেন এবং মারলেন। কথাটি খলীফা উমারের কানে গেল। তিনি উবাদাকে বললেন আপনি এ কেমন কাজ করলেন? উবাদা বললেন আমি তাঁকে ঘোড়াটি একটু ধরতে বলামা আর সে অস্বীকার করলো। উমার মেজাজটা একটু গরম। আমি তাকে মেরে বসলাম। উমার বললেন, আপনি বদলা বা কিসাসের জন্য প্রস্তুত হোন। সেখানে যায়িদ ইবন সাবিত উপস্থিত ছিলেন। তিনি এভাবে একজন সাহাবীর অপমান সহ্য করতে পারলেন না। উমারকে বললেন, আপনি একজন গোলামের বদলায় নিজের ভাইকে মারবেন? তাঁর একথার পর উমার কিসাকেস পরিবর্তে শুধু দিয়াত ধার্য করেন। উবাদাকে (রা) দিয়াত আদায় করতে হয়।১০২

এমনি আর একটি ঘটনা। উমার (রা) যখণ শামে ছিলেন তখন একদিন খবর পেলেন যে, একজন মুসলাম একজন জিম্মীকে হত্যা করেছে। উমার হত্যাকারী মুসলামকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। যায়িদ অতিকষ্টে খলীফাকে বুঝালেন এবং কিসাসের পরিবর্তে দিয়াতে রাজী করেন।১০৩

স্বভাগত ভাবেই তিনি চুপচাপ থাকতে ভালবাসতেন। খলীফাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজার রাখতেন। খলীফা উমারের অন্যতম সঙ্গী ও পারিষদ ছিলেন। খলীফা উসমানের (রা) সাথে তাঁর এত গভীর সম্পর্ক ছিল যে, লোকে তাঁকে উসমান (রা) তাঁকে খুবই ভালোবাসতেন। আলী মুয়াবিয়ার (রা) দ্বন্দ্বে আলীর (রা) পক্ষে কোন যুদ্ধে অংশ নেননি, তা সত্বেও তিনি আলীকে দারুণ ভালোবাসতেন এবং তাঁর মাহাতœ্য ও মর্যাদার প্রবক্তা ছিলেন। আমীর মুয়াবিয়ার (রা) সাথেও সুসম্পর্ক ছিল। শামে গেলে তাঁর গৃহেই উঠতেন।১০৪

মারওয়ান ছিলেন তাৎকালীন আরব বিশ্বের একজন অতি বিখ্যাত রাজনীতিবিদ। যায়িদের (রা) ছিল তাঁর সাথেন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন না। একদিন যায়িদ ইবন সাবিতকে ডেকে রাজনীতি বিষয়ক কিছু প্রশ্ন করেন। যায়িদ জবাব দিচ্ছেন, এমন সময় তিনি বুঝতে পারলেন কিছু লোক পর্দার আড়াল থেকে তাঁর বক্তব্য লিখে নিচ্ছে। যায়িদ তক্ষুণি বলে উঠলেন, মাফ করবেন, এতক্ষণ আমি যা কিছু বলেছি তা সবই আমার ব্যক্তিগত মতামত।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা) তাঁকে খুবই সম্মান করতেন। একদনি যায়িদ (রা) যখন ঘোড়ায় চড়তে যাবেন, ইবন আব্বাস তাঁর জিনিসটি ধরে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন। যায়িদ (রা) বললেনঃ আপনি হচ্ছেন রাসূলুল্লাহর (সা) চাচাতো ভাই। দয়া করে আপনি সরে যান। তিনি বললেনঃ আমাদের উলামা ও বড়দের সাথে এমন আচরণ করার জণ্য আমাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যায়িদ বললেনঃ আপনার হাতটি একটু বাড়িয়ে দিন। ইবন আব্বাস (রা) হাত বাড়িয়ে দিলে যায়িদ হাতে চুমু দিয়ে বললেনঃ আমাদেরকে ও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নবীর (সা) পরিবার পরিজনদের সাথে এমন আচারণ করতে করার জন্য।১০৫

মে মারওয়ান ইবনুল হাকাম, আবু সাঈদ আলÑখুদরী (রা) মতে একজন উচুঁ মর্যদা সাহাবীকে মারার জন্য ছড়ি উঠিয়েছিলেন, তিনিও যায়িদকে (রা) অতন্ত্য সম্মান করতেন। দরাবারে গেলে মারওয়ান তাঁকে আসানের পাশেই বসাতেন।যায়িদ (রা) অন্যান্য সাহাবী ও তাবেঈদেরকে মাঝে মধ্যে চিঠির মাধ্যমে উপদেশ দিতেন। প্রখ্রাত সাহবী উবাই ইবন কা’বকে (রা) তিনি এমনি একটি উপদেশমূলক চিঠি লিখেছিলেন। সীরাত ও হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে তা বর্ণিত হয়েছে।১০৬

সত্য কতা বলতে কাকেও পরোয় করতেন না। তাবারানী বর্ণনা করেছেন। খলীফা উমার (রা) একদিন গোপনে খবর পেলেন আবু মিহ্জান আসÑসাকাফী নামক একব্যক্তি তার এক বন্ধুর সাথে ঘরের মধ্যে মদ পান করছে। তিনি তৎক্ষণাত রওয়না দিলেন এবং সোজা তার ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লেন। সেখানে আবু মিহ্জানকে বললেনঃ একাজটি আপনি ঠিক করেননি। কারণ আল্লাহ ক্ষাপনাকে গুপ্তচাগিরি করতে নিষেধ করেছেন। উমার (সা) সাতে সঙ্গীদের প্রতি লক্ষ্য করে বললেনঃ এ কি বলে? যায়িদ ইবন সাবিত ও আবদুর রহমান ইবন আলÑআরকান (রা)Ñ বললেনঃ আমীরুল মুমিনীন, সে ঠিক বলেছে। এ এক ধরনের গুপ্তচরবৃত্তি। উমার (রা) তাকে ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে আসেন।১০৭

যায়িদ (রা) পরিবার পরিজন ও আতœীয় স্বজনদের প্রতি খুবই সদয় ছিলেন। ঘুমানোর সময় দু’আ করতেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পরিবার পরিজনের স্বাচ্ছন্দ ও প্রাচুর্য কামনা করি। আর কোন আতœীয়ের সাথে আতœীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করলে তার বদ দুআ থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করি। পরিবার পরিজনদের মধ্যে তিনি খুব রসিক হতেন যেসন মজলিসে হতেন অত্যন্ত গম্ভীর।১০৮

তাঁকে নিয়ে তাঁর নিজ গোত্রে খাযরজীদের গর্বের অন্ত ছিলনা। মদীনার চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোত্র আউস ও খাযরাজ।ইসলাম গ্রহণের পরেও তারা মাঝে মাঝে নানা বিষয় নিয়ে একে অপরের ওপর আভিজাত্য ও শ্রেষ্টত্ব দাবী করত। এমনিভাবে একাবর খাযাজীরা বললো, আমাদের মধ্যে এমন  চার ব্যক্তি যাঁদের সমকক্ষ কেউ তোমাদের মধ্যে নেই। তাঁরা রাসূর্লুলাহর (সা) জীবদ্দশায় গোটা কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন। তাঁদের একজন যায়িদ ইবন সাবিত।১০৯

যায়িদের (রা) জীবন ও কর্ম ছোট কোন প্রবন্ধে তুলে ধরা সম্ভব নয়। হাদীস ও সীরাতের গ্রন্থ সমূহে তাঁর সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়।

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar