রাসূল আমার আলোর জ্যোতি।। ২য় অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

নবুওয়তের ৬ষ্ঠ বছর।

এই সময়েই ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

ছাফা থেকে মুসলমানদের একটি মিছিল বের হয় রাসূলের (সা) নবুওয়াতের ৬ষ্ঠ  বছরে।

মিছিলে দুই সারির সামনে ছিলেন হামযা (রা) ও উমর ফারুক (রা)।

উভয়ের মাঝে ছিলেন মহান সেনাপতি- রাসূল (সা)।

সবার কণ্ঠে ছিল ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি। এই ঐতিহাসিক প্রথম মিছিলটি শেষ হয় কাবায় গিয়ে।

নবুওয়াতের ৭ম বছরে মুসলমানরা সামাজিক বয়কটের শিকার হন।

মক্কার সকল গোত্র বনি হাশিম গোত্রের সাথে আত্মীয়তা, কেনা-বেচা, খাদ্য বিনিময়সহ সকল প্রকার লেনদেন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

মুসলমানরা ‘শিআবে আবি তালিব’ নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

এই সময় তাঁরা ক্ষুধা, দারিদ্র ও কষ্টের মধ্যে দিয়ে এক চরমতম পরীক্ষার সম্মুখীন হন। মুসলমানদের ওপরে এই দুঃসহ অবরোধ চলে টানা তিনটি বছর।

তবুও হতোদ্যম হননি রাসূল (সা)।

ভেঙ্গে পড়েননি একজন মুসলমানও।

এই কঠিনতম পরীক্ষায় পাশ করলেন রাসূল (সা) সহ সত্যের সাহসী সৈনিকরা।

নবী (সা) এবার মক্কা থেকে ষাট মাইল দূরে, তায়েফে গেলেন দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে। সেখানে তিনি ক্রমাগত দশদিন দাওয়াতী অভিযান চালালেন।

কিন্তু তায়েফবাসীরা রাসূলের (সা) দাওয়াত গ্রহণ করলো না।

বরং তাদের হাতে চরমভাবে লাঞ্ছিত ও রক্তাক্ত হলেন দয়ার নবীজী (সা)। তবুও থেমে থাকলো না রাসূলের (সা) দ্বীনের দাওয়াতী অভিযান।

দাওয়াতের ব্যাপারে রাসূলের (সা) ক্রমাগত চেষ্টা ও দুঃসাহসিক অভিযাত্রার ফলেই তো এক সময় সেই তায়েফের মানুষই ইসলাম গ্রহণ করেছিল।

নবুওয়তের দশম বছর।

এই সময় মানবতার মুক্তির দিশারী নবী মুহাম্মদ (সা) মিরাজের গমন করেন।

মিরাজের শিক্ষার ভেতরই ছিল ইসলামী সমাজ গঠনের একটি প্রাথমিক সুনিপত্র চিত্র। মিরাজ থেকে চৌদ্দটি বুনিয়াদী শিক্ষার সাথে রাসূল (সা) আমাদেরকে পরিচিত করিয়ে দিলেন। এগুলি হলো:

১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও সার্বভৌমত্ব স্বীকার করো না।

২. আব্বা-আম্মার প্রতি সুন্দর ব্যবহার করো।

৩. অবাবগ্রস্ত, আত্মীয়  এবং মুসাফিরদের হক আদায় করো।

৪. সম্পদের অপচয় করো না।

৫. মিতব্যয়ী হও।

৬. রিজিকের হ্রাস-বৃদ্ধি আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন।

৭. অভাবের আশঙ্কায় সন্তান হত্যা করো না।

৮. ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয়ো না।

৯. কাউকে অন্যায়ভাবে হতঅ করো না।

১০. এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করো না।

১১. ওয়াদা ও চুক্তিনামা ভঙ্গ করো না।

১২. সঠিকভাবে পাম ও ওজর করো।

১৩. আন্দাজ-অনুমানের বশবর্তী হয়ো না।

১৪. অহমিকা বর্জন করো।

আল্লাহর মনোনীত ও পছন্দনীয় ইসলামী সমাজ গঠনের জন্য মক্কার পরিবেশ দিনদিনই প্রতিকূলে চলে যেতে লাগলো।

অন্যদিকে মদিনা ছিল ইসলামের জন্য একটি উর্বর ভূমি।

রাসূল (সা) আল্লাহর নির্দেশে সিদ্ধান্ত নিলেন মদিনায় হিজরতের।

হযরত আবুবকরকে (রা) সাথে নিয়ে বহু চড়াই-উতরাই  ও বন্ধুর পথ পেরিয়ে তিনি পৌঁছুলেন মদিনায়।

রাসূলের (সা) এই হিজরাতের সময় থেকেই ‘হিজরী’ সাল গণনা শুরু হয়।

৮ই রবিউল আওয়াল।

মদিনা থেকে তিন মাইল দক্ষিণে কুবা পল্লীতে রাসূল (সা) উপস্থিত হলেন। এই কুবা পল্লীতে রাসুল ছিলেন চৌদ্দ দিন।

এখানেই তিনি স্থাপন করেন মসজিদে কুবা। কুবাই হলো মুসলমানদের প্রথম মসজিদ। এই কুবা মসজিদেই প্রথম সালাতুল জুমআ অনুষ্ঠিত হয়।

কুবা পল্লীতে চৌদ্দদিন অবস্থানের পর রাসূল (সা) আবার যাত্রা শুরু করলেন মদিনার দিকে।

রাসূল (সা) মদিনায় যাচ্ছেন।

পেছনে রয়েছে পড়ে তাঁর প্রিয়তম জন্মভূমি মক্কা।

মক্কা!

মক্কা রাসূলের (সা) জন্মভূমি।

কিন্তু সেই মক্কার দুর্ভাগা মানুষ তার এবং পৃথিবীর শ্রেষ্ঠসন্তানকে চিনতে পারলো না।

তাঁকে কষ্ট দিল নিদারুণ।

মক্কা!

প্রিয় জন্মভূমি মক্কা!

একদিনের জন্যও যেখানে রাসুল (সা) টিকতে পারেননি শান্তিতে। প্রতি পদে পদে যেখানে তিনি পেয়েছেন কষ্ট আর লাঞ্ছনা।

তবুও সেই মক্কার জন্য প্রাণটা কাঁদছে রাসূলের (সা)।

তিনি বারবার পেছনে ফিরে তাকাচ্ছেন। আর দেখে নিচ্ছেন ধূসর-ধূসরতম তাঁর প্রিয় জন্মভূমিটি।

সামনেই মদিনা।

মদিনার পরিবেশ মক্কার সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে বয়ে যাচ্ছে কোমল বাতাস।

শিরশির হাওয়া।

রাসূল (সা) আসছেন!

আসছেন আলোকের সভাপতি।

মুহূর্তেই সুসংবাদটি ছড়িয়ে গেল মদিনার ঘরে ঘরে।]

মদিনার উপকণ্ঠে মানুষের ভীড়।

হৃদয়ে তাদের তৃষ্ণার মরুভূমি। কখন আসবেন রাসূল (সা)?  কখন?

প্রতীক্ষার পালা শেষ। এক সময় মদিনায় পৌঁছুলেন রাসুল (সা)।

রাসূলের (সা) জন্য মদিনাবাসীরা আয়োজন করলো সম্বর্ধনা।

সে কি মনোরম দৃশ্য! সে কি অভাবনীয় ব্যাপার!

রাসূল (সা) আসছেন!

তাঁর আগমনে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে শিশু-কিশোরদের কণ্ঠে ধ্বনিত হলো:

“তালাআল বাদরু আলাইনা

মিন সানিয়াতিল বিদাঈ

ওয়াজাবাশ শুকরু আলাই না

মাদাআ লিল্লাহি দাঈ।”

রাসূল (সা) এসেছেন মদিনায়!

মদিনার ঘরে ঘরে বয়ে যাচ্ছে আজ খুশির ঢল।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষটিকে পেয়ে তারা আনন্দে বাগবাগ।

রাসূল (সা) এসেছেন! রাসূল (সা) এসেছেন মদিনায়।

মুহূর্তেই মদিনার আকাশ-বাতাস মথিত করে ছুটে চললো আনন্দের অপার্থিব, জ্যোতিষ্কমান এক ঘূর্ণি।

হযরত মুহাম্মদ (সা)।

জগতের সর্বশ্রেস্ঠ মানুষ।সর্বশ্রেষ্ঠ নবী।

নূরে ‘আলা নূর।

বস্তুত রাসুল (সা) আমার আলোর জ্যোতি।

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar