সমুদ্র: নি‘আমতের অফুরান ভাণ্ডার।। ২য় অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

কেন এ অদৃশ্য পর্দা?

মিষ্টি পানি হলো সুপেয় নদীর পানি। এ পানি মানুষের তৃষ্টা নিবারণের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। নদীর মিষ্টি পানি না থাকলে সভ্যতা মরে যেত। আর লোনা পানি হলো সাগরের অতল জলরাশি। নদীর পানির মিষ্টতার মতো সাগরের পানির লবণাক্ততাও বিশাল অতি প্রয়োজনীয়। সাগরের পানি মিঠা হলে বাতাস দূষিত হয়ে যেত। জলে-স্থলে সব প্রাণী মরে যেত। সাগরের পানি লবণাক্ত হওয়ায় বাতাস সর্বদা আর্দ্র থাকে এবং এতে মারা যাওয়া প্রাণীর দেহ পচে না। সাগরের মরদেহ পচে গেলে বাতাস দূষিত হত এবং এর প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ত।

সাগর নিয়ে কিছু তথ্য

পৃথিবীর বারিমণ্ডল ৪ ভাগে বিভক্ত : সাগর, মহাসাগর, নদী ও হ্রদ। পৃথিবীতে ৫টি মহাসাগর রয়েছে। যথা : ১. প্রশান্ত মহাসাগর, ২. আটলান্টিক মহাসাগর, ৩. ভারত মহাসাগর, ৪. উত্তর মহাসাগর এবং ৫. দক্ষিণ মহাসাগর। এসব ছাড়াও অনেক সাগর আছে।

বিশ্বের সব সাগরের পানিতে গড়ে ৩.৫% খনিজদ্রব্য আছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০০ গ্রাম পানিতে ৩৫ গ্রাম লবণ জাতীয় উপাদান থাকে। অন্যান্য উপাদানগুলো হলো- সোডিয়াম-ক্লোরাইড ৭৭.৫৫%, ম্যাগনেশিয়াম-ক্লোরাইড ১০.৮৭ %, ম্যাগনেশিয়াম-সালফেট ৪.৭৩%, ক্যালসিয়াম-সালফেট ৩.৬%, পটাশিয়াম-সালফেট ২.৪৬%, ক্যালসিয়াম-কার্বনেট ০.৩৪%, ম্যাগনেশিয়াম-ব্রোমাইট ০.২৫%। যাকে সহজ বাংলায় বলা হয় খাবার লবণ এবং এটা পানিতে দ্রবণীয় থাকে।

ব্রাজিলের বিশাল নদী আমাজানের মোহনা থেকে ২০০ মাইল বা ৩২০ কি. মি. পর্যন্ত সমুদ্রের পানি লোনা নয় বরং মিষ্টি। ফিলিপাইনের উপকূলেও মিষ্টি পানি দেখা যায়। আবার সাগরের পানির নিচের দিকে যতই যাওয়া যায় ততই পানি লোনা। তাছাড়া সমুদ্রের পানিতে মোট ৪৫ প্রকার ধাতব লবণ মিশ্রিত থাকে। আরো আছে ৬৫ প্রকার মৌলিক ও যৌগিক পর্দাথের মিশ্রণ।[5]

বাংলাদেশের সমুদ্র জয়

৭ জুলাই ২০১৪ সোমবার নেদারল্যান্ডসের স্থায়ী সালিসি আদালতের রায়ে বঙ্গোপসাগরের বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা বাংলাদেশ পেয়েছে। বাকি ছয় হাজার ১৩৫ বর্গকিলোমিটার পেয়েছে ভারত। ইতিপূর্বে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার টেরিটোরিয়াল সমুদ্র, ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের ওপর অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুসংবাদ।

সমুদ্রের নি‘আমত কাজে লাগানো দরকার

এখন বাংলাদেশের কর্তব্য হবে তেল-গ্যাসসহ বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার মধ্যে যেসব নি‘আমত ও সম্পদ রয়েছে, তা সংরক্ষণ ও সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারের দিকে মনোযোগী হওয়া। দুঃখজনক হলো, দুই দফায় বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে বৃহৎ নতুন সমুদ্রসীমা যোগ হলেও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সমুদ্রসম্পদকে যেভাবে কাজে লাগানোর কথা সেভাবে কাজে লাগানো হয়নি। এ ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করে অনেক দেশ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করলেও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য নগণ্য।

নতুন সমুদ্রসীমা ও সমুদ্রসীমা থেকে সম্পদ আহরণে ২০১৪ সালে সরকারের সফলতা-ব্যর্থতা সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট সায়েন্স অনুষদের ডিন এবং দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, সমুদ্রে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়াতেই সরকার বহুলাংশে সন্তুষ্ট থেকেছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সমুদ্রসম্পদকে যেভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন সেভাবে কাজে লাগানো হয়নি। সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনকারী দেশের কাছে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়, প্রশিক্ষণের জন্য সেসব দেশে প্রতিনিধি প্রেরণ, তাদের কাছে সমুদ্রসম্পদ অর্জন করার অভিজ্ঞতা লাভ করা, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে কীভাবে তারা সম্পদ কাজে লাগিয়েছেন- এ বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপকভাবে সরকারের কাজ করার কথা থাকলেও সেভাবে নজর দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, আমাদের স্থলসীমায় কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে সেটি আমাদের জানা। এসব কূপ থেকে আমরা ১৪ ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট গ্যাস পাব। ব্যবহারের দিক দিয়ে আগামী ১০ বছরের মধ্যে এসব সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যাবে। সমুদ্র এলাকাতে সরকার ২৪টি গ্যাস ব্লক চিহ্নিত করেছে।

মাকসুদ কামাল মনে করেন, এতদিন সমুদ্রের বিশাল সম্পদের দিকে আমাদের নজর ছিল না। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সমুদ্রের অপার সম্পদকে কাজে লাগানোর ব্যাপারে ব্যাপকভাবে নজর দেওয়া উচিত। দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সত্যিকার অর্থে কোনো পরিকল্পনা সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। তাদের সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে সরকার নজর দেয়নি। যতদিন সরকার এটি নিয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না  করবে, ততদিন চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত হবে না। সমুদ্রসীমায় আমাদের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হয়েছে বটে, কিন্তু সার্বভৌমত্বের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক যে অর্জন হওয়ার কথা সেটি আমরা পাব না। রাজনৈতিকভাবে সরকার লাভবান হয়েছে কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দেশ লাভবান হয়নি। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো সমুদ্রসম্পদ ব্যবহার করেই অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে। আমাদের সমুদ্রেও অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

ভূ-কেন্দ্রিক উন্নয়নকার্যক্রমের পাশাপাশি ব্লু ইকোনমি আমাদের সামনে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। সেজন্য সমুদ্র ও সমুদ্রসম্পদের অপার সম্ভাবনাকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। সমুদ্রের জলরাশি এবং তলদেশে বিদ্যমান জানা-অজানা জৈব ও খনিজসম্পদের ভাণ্ডার উত্তোলনে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার করতে শিল্পোন্নত দেশগুলোর সহায়তা নিতে হবে।

বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে দেশ সমুদ্রকে যত বেশি ব্যবহার করতে পেরেছে, সে দেশ তার অর্থনীতিকে তত এগিয়ে নিতে পেরেছে। সামুদ্রিক সম্পদের প্রাপ্যতা, উত্তোলন এবং ব্যবহার সম্পর্কে আমাদের পর্যাপ্ত জনবলের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ এবং বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিদ্যমান খনিজ সম্পদের উত্তোলনেও আমাদের প্রযুক্তির অভাব রয়েছে।

সাধারণভাবে অর্থশাস্ত্রে ‘ব্লু ইকোনমি’ বলতে পণ্যভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সিস্টেম-ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপান্তরকে বোঝানো হলেও এখানে ব্লু ইকোনমি বলতে সমুদ্রসম্পদের অর্থনীতি বুঝানো হচ্ছে। সমুদ্রসম্পদ এবং এর সুষ্ঠু ব্যবহার নিঃসন্দেহে যেকোনো দেশের অর্থনীতির গতি পাল্টে দিতে পারে। স্থলবেষ্টিত দেশের অনেক সম্পদ বা সম্ভাবনা থাকলেও সমুদ্র না থাকায় তাদের সম্ভাবনাকে নানাভাবে সীমিত ও পরনির্ভর করে ফেলে। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, ভুটানসহ এ রকম আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে এ ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ এ দিক থেকে বেশ সৌভাগ্যবান। এ দেশের দক্ষিণ প্রান্তের বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশি দেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। এ সম্ভাবনা শুধু সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্যের অবারিত সুযোগের জন্য নয়, একই সঙ্গে সমুদ্র এলাকা থেকে মৎস্য, জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পদ আহরণের বিপুল সম্ভাবনার কারণেও।

আমাদের যা করণীয়

সমুদ্রের এমনসব অফুরন্ত নি‘আমতের দাবী হলো, নি‘আমতদাতাকে নিয়ে চিন্তা করা। তিনি কীভাবে এত সাগর-মহাসাগর মানুষের পদানত করেছেন, তাতে এত নি‘আমতসম্ভার সন্নিবেশিত করেছেন, তা নিয়ে ভাবনা-গবেষণা করা। বহুবিধ ঝুঁকি ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সাগরতলের নি‘আমতরাজি মানবকল্যাণে আবিষ্কার করা। মানুষের আরও কর্তব্য হবে, একমাত্র আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকার করা এবং তাঁরই ইবাদত করা। পাশাপাশি প্রাণহীন মূর্তি ও প্রতিমাসহ আল্লাহ ছাড়া সব কিছুর প্রভুত্ব অস্বীকার করা। আল্লাহ তা‘আলা এ কথাই বলেছেন নিচের আয়াতে:

﴿أَمَّن جَعَلَ ٱلۡأَرۡضَ قَرَارٗا وَجَعَلَ خِلَٰلَهَآ أَنۡهَٰرٗا وَجَعَلَ لَهَا رَوَٰسِيَ وَجَعَلَ بَيۡنَ ٱلۡبَحۡرَيۡنِ حَاجِزًاۗ أَءِلَٰهٞ مَّعَ ٱللَّهِۚ بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ ٦١﴾ [النمل: ٦١]

“বল তো কে পৃথিবীকে বাসপযোগী করেছেন এবং তার মাঝে মাঝে নদ-নদী প্রবাহিত করেছেন এবং তাকে স্থির রাখার জন্য পর্বত স্থাপন করেছেন এবং দুই সমুদ্রের মাঝখানে অন্তরায় রেখেছেন? অতএব, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ৬১]

লেখক: আ্লী হাসান তৈয়ব

সম্পাদক: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar