সীমালংঘন।। একটি মারাত্নক কবীরা গুনাহ ! ২য় অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

যারা আল্লাহর অপার মহিমায় বিশ্বাসী তারা ইহকালে ও পরকালে উপকৃত হবে। আর যারা এর বিপরীত চিন্তায় মগ্ন তথা অবিশ্বাসী তারা ইহকালেও অভিশপ্ত এবং পরকালে আরও ঘৃণিত ও লাঞ্ছিত। এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, অবিশ্বাসীদের সঞ্চিত পাপরাশি তাদেরকে পৃথিবীর বুকেই প্রত্যক্ষভাবে আক্রমণ করে সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছিল। পবিত্র কুরআনে সীমালংঘনকারী পাপীদের ঐতিহাসিক ধ্বংসকাহিনী সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণিত আছে। মানুষকে  সীমালংঘনের মত পাপের অকল্পনীয় শাস্তি হ’তে নিরাপদ থাকার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবে প্রাচীন কালের কতিপয় ধ্বংসকাহিনী এখানে তুলে ধরা হ’ল।

মহান আল্লাহ বলেন,

وَكَمْ قَصَمْنَا مِنْ قَرْيَةٍ كَانَتْ ظَالِمَةً وَأَنشَأْنَا بَعْدَهَا قَوْماً آخَرِيْنَ- فَلَمَّا أَحَسُّوْا بَأْسَنَا إِذَا هُم مِّنْهَا يَرْكُضُوْنَ- لاَ تَرْكُضُوْا وَارْجِعُوْا إِلَى مَا أُتْرِفْتُمْ فِيْهِ وَمَسَاكِنِكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْأَلُوْنَ- قَالُوْا يَا وَيْلَنَا إِنَّا كُنَّا ظَالِمِيْنَ- فَمَا زَالَت تِّلْكَ دَعْوَاهُمْ حَتَّى جَعَلْنَاهُمْ حَصِيْداً خَامِدِيْنَ-

‘আমি কত জনপদের ধ্বংস সাধন করেছি যার অধিবাসীরা ছিল সীমালংঘনকারী এবং তাদের পর সৃষ্টি করেছি অন্য জাতি। অতঃপর যখন তারা আমার আযাবের কথা টের পেল, তখনই তারা সেখান থেকে পলায়ন করতে লাগল। পলায়ন করো না এবং ফিরে এসো, যেখানে তোমরা বিলাসিতায় মত্ত ছিলে ও তোমাদের আবাসগৃহে। সম্ভবতঃ কেউ তোমাদের জিজ্ঞেস করবে। তারা বলল, হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা অবশ্যই সীমালংঘনকারী ছিলাম। তাদের এই আর্তনাদ সব সময় ছিল, শেষ পর্যন্ত আমি তাদেরকে করে দিলাম যেন কর্তিত শস্য ও নির্বাপিত অগ্নি’ (আম্বিয়া ২১/১১-১৫)

একই বিষয়ে অন্যত্র প্রত্যাদেশ এসেছে, وَتِلْكَ الْقُرَى أَهْلَكْنَاهُمْ لَمَّا ظَلَمُوْا وَجَعَلْنَا لِمَهْلِكِهِمْ مَّوْعِداً ‘এসব জনপদ, যাদেরকে আমি ধ্বংস করে দিয়েছি, যখন তারা সীমালংঘন করেছিল এবং আমি তাদের ধ্বংসের জন্য একটা প্রতিশ্রুত সময় নির্দিষ্ট করেছিলাম’ (কাহফ ১৮/৫৯)

অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَكَأَيِّن مِّن قَرْيَةٍ أَمْلَيْتُ لَهَا وَهِيَ ظَالِمَةٌ ثُمَّ أَخَذْتُهَا وَإِلَيَّ الْمَصِيْرُ ‘আমি কত জনপদকে অবকাশ দিয়েছি। এমতাবস্থায় যে, তারা সীমালংঘনকারী ছিল। এরপর তাদেরকে পাকড়াও করেছি এবং আমার কাছেই প্রত্যাবর্তন করতে হবে’ (হজ্জ ২২/৪৮)

কুরআন মজীদে ঐসব জনপদ ধ্বংসের কারণও উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَلَقَدْ جَاءَهُمْ رَسُوْلٌ مِّنْهُمْ فَكَذَّبُوْهُ فَأَخَذَهُمُ الْعَذَابُ وَهُمْ ظَالِمُوْنَ ‘তাদের নিকট তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল আগমন করেছিলেন; অনন্তর ওরা তাঁর প্রতি মিথ্যারোপ করল। তখন আযাব এসে ওদেরকে পাকড়াও করল এবং নিশ্চিতই ওরা ছিল সীমালংঘনকারী’ (নাহল ১৬/১১৩)

উপরোক্ত আয়াতের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ আরও কিছু আয়াত এসেছে,

وَمَا كَانَ رَبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرَى حَتَّى يَبْعَثَ فِيْ أُمِّهَا رَسُوْلاً يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا وَمَا كُنَّا مُهْلِكِي الْقُرَى إِلاَّ وَأَهْلُهَا ظَالِمُوْنَ-

‘আপনার পালনকর্তা জনপদসমূহকে ধ্বংস করেন না, যে পর্যন্ত তার কেন্দ্রস্থলে রাসূল প্রেরণ না করেন, যিনি তাদের কাছে আমার আয়াত সমূহ পাঠ করেন এবং আমি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করি, যখন তার বাসিন্দারা সীমালংঘন করে’ (ক্বাছাছ ২৮/৫৯)

উপরোক্ত জনপদ সমূহের নানাবিধ সীমালংঘনের মধ্যে শিরক ছিল অন্যতম। আল্লাহ বলেন, وَيَعْبُدُوْنَ مِنْ دُوْنِ اللهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَاناً وَمَا لَيْسَ لَهُمْ بِهِ عِلْمٌ وَمَا لِلظَّالِمِيْنَ مِن نَّصِيْرٍ- ‘তারা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর পূজা করে, যার কোন সনদ নাযিল করা হয়নি এবং সে সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান নেই। বস্ত্ততঃ সীমালংঘনকারীদের কোন সাহায্যকারী নেই’ (হজ্জ ২২/৭১)

উপরের আয়াতগুলোতে প্রাচীনকালের ধ্বংস কাহিনীর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর বাস্তব নমুনা এখনও সে দেশগুলোতে চিহ্নিত হয়ে আছে। যেখানে তারা ধ্বংস হয়েছিল। বিশ্ববিখ্যাত অত্যাচারী ও নাফরমান ফেরআউনের কাহিনীও কুরআনে বর্ণিত হয়েছে। বিশ্ববাসীর সন্দেহ দূরীকরণার্থে মহাজ্ঞানী আল্লাহ তা‘আলা ফেরআউনের লাশকে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন তার জন্মভূমিতে। মিশরের যাদুঘরে আজও তার লাশ পবিত্র কুরআনের সত্যতার মহা স্বাক্ষর বহন করছে। মহান আল্লাহ বলেন, مِنْ فِرْعَوْنَ إِنَّهُ كَانَ عَالِياً مِّنَ الْمُسْرِفِيْنَ ‘ফেরআউন, সে ছিল সীমালংঘনকারীদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়’ (দুখান ৪৪/৩১)। তার কওমকে সমূলে নদীগর্ভে নিমজ্জিত করা হয়েছিল। এতদ্ব্যতীত নূহ (আঃ)-এর কওম, লূত (আঃ)-এর কওম, হূদ (আঃ)-এর কওম, ছামূদ (আঃ)-এর কওম, শোয়াইব (আঃ)-এর কওম ধ্বংসের নির্মম কাহিনী আজও আল্লাহভীরু বান্দাদের সংশোধনের ক্ষেত্রে অনন্য উপকরণ। ঐসব কওমের লোকেরা তাদের নবী-রাসূলদের আনুগত্য করত না, বিশ্বাসও করত না, বরং তাঁদেরকে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত। এমনকি কখনও তাঁদেরকে হত্যাও করত।

বর্তমানে উম্মতে মুহাম্মাদীর জ্ঞানী ব্যক্তি মাত্রই নবী (ছাঃ)-এর অছিয়ত অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে সদা তৎপর। এরা বিশ্বাস করে আল্লাহর বিধান ও রাসূলের বিরোধিতা করলে সীমালংঘনের শিকার হ’তে হবে এবং অনিবার্য ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। কারণ মহান আল্লাহ রাসূল (ছাঃ)-কে বলেছেন, ‘আপনার যে কল্যাণ হয় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আর আপনার যে অকল্যাণ হয়, সেটা হয় আপনার নিজের কারণে’ (নিসা ৪/৭৯)

সুতরাং পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকা বা দেশে যেসব দুর্যোগ বা প্রাকৃতিক ধ্বংসলীলা সংঘটিত হয়েছে, তা সেখানকার অধিবাসীদের সীমালংঘনের কারণেই হয়েছে। সাম্প্রতিকালের ঘন ঘন ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডো, সুনামি, হ্যারিকেন, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির বিধ্বংসী ছোবলও সেখানকার অধিবাসীদের অন্যায়-অত্যাচার ও সীমালংঘনেরই ফল। তবে ইহকালের এসব ধ্বংসলীলা, ক্বিয়ামতের আসন্ন ধ্বংসযজ্ঞের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। মহান আল্লাহ বলেন, وَيَوْمَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ يُقْسِمُ الْمُجْرِمُوْنَ مَا لَبِثُوْا غَيْرَ سَاعَةٍ كَذَلِكَ كَانُوْا يُؤْفَكُوْنَ ‘যেদিন ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন অপরাধীরা কসম খেয়ে বলবে যে, এক মুহূর্তেরও বেশী অবস্থান করিনি। এমনিভাবে তারা সত্য বিমুখ হ’ত’ (রূম ৩০/৫৫)

অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে, فَيَوْمَئِذٍ لاَّ يَنْفَعُ الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا مَعْذِرَتُهُمْ وَلاَ هُمْ يُسْتَعْتَبُوْنَ ‘সেদিন সীমালংঘনকারীদের ওযর-আপত্তি তাদের কোন উপকারে আসবে না এবং তওবা করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের সুযোগও তাদের দেয়া হবে না’ (রূম ৩০/৫৭)। একই মর্মাথে অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِذَا رَأى الَّذِيْنَ ظَلَمُوا الْعَذَابَ فَلاَ يُخَفَّفُ عَنْهُمْ وَلاَ هُمْ يُنْظَرُوْنَ ‘যখন সীমালংঘনকারীরা আযাব প্রত্যক্ষ করবে, তখন তাদের থেকে তা লঘু করা হবে না এবং তাদেরকে কোন অবকাশ দেয়া হবে না’ (নাহল ১৬/৮৫)

ক্বিয়ামত দিবসে সীমালংঘনকারীদের শোচনীয় দুরবস্থার বর্ণনায় প্রত্যাদেশ হয়েছে, ‘যদি সীমালংঘনকারীদের কাছে পৃথিবীর সবকিছু থাকে এবং তার সাথে সমপরিমাণ আরও থাকে, তবে অবশ্যই তারা ক্বিয়ামতের দিন সে সবকিছুই নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মুক্তিপণ হিসাবে দিয়ে দিবে। তারা দেখতে পাবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন শাস্তি, যা তারা কল্পনাও করত না। আর দেখবে তাদের দুষ্কর্মসমূহ এবং যে বিষয়ে তারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করত, তা তাদেরকে ঘিরে নেবে’ (যুমার ৩৯/৪৭-৪৮)

সীমালংঘন সম্পর্কে অপর এক আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যে,

فَإِذَا جَاءَتِ الطَّامَّةُ الْكُبْرَى- يَوْمَ يَتَذَكَّرُ الْإِنْسَانُ مَا سَعَى- وَبُرِّزَتِ الْجَحِيْمُ لِمَنْ يَّرَى- فَأَمَّا مَنْ طَغَى- وَآثَرَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا- فَإِنَّ الْجَحِيْمَ هِيَ الْمَأْوَى-

‘যখন মহাসংকট এসে যাবে, সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম স্মরণ করবে এবং দর্শকদের জন্য জাহান্নাম প্রকাশ করা হবে। তখন যে ব্যক্তি সীমালংঘন করেছে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম’ (নাযি‘আত ৭৯/৩৪-৩৯)

ক্বিয়ামত দিবসের জটিলতার আরও সংবাদ দিয়ে মহান আল্লাহ বলেন,

وَيْلٌ يَوْمَئِذٍ لِّلْمُكَذِّبِيْنَ- الَّذِيْنَ يُكَذِّبُوْنَ بِيَوْمِ الدِّيْنِ- وَمَا يُكَذِّبُ بِهِ إِلاَّ كُلُّ مُعْتَدٍ أَثِيْمٍ- إِذَا تُتْلَى عَلَيْهِ آيَاتُنَا قَالَ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِيْنَ- كَلاَّ بَلْ رَانَ عَلَى قُلُوْبِهِم مَّا كَانُوْا يَكْسِبُوْنَ- كَلاَّ إِنَّهُمْ عَن رَّبِّهِمْ يَوْمَئِذٍ لَّمَحْجُوْبُوْنَ- ثُمَّ إِنَّهُمْ لَصَالُوا الْجَحِيْمِ-

‘সেদিন দুর্ভোগ মিথ্যারোপকারীদের, যারা ক্বিয়ামত দিবসকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। প্রত্যেক সীমালংঘনকারী পাপীই কেবল একে মিথ্যারোপ করে। তার কাছে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করা হ’লে সে বলে, পুরাকালের উপকথা। কখনও না, বরং তারা যা করে, তাই তাদের হৃদয়ে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে। তারা সেদিন তাদের পালনকর্তার থেকে পর্দার আড়ালে থাকবে। অতঃপর তারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে’ (মুতাফফিফীন ৮৩/১০-১৬)

উপরোক্ত আলোচনায় মানুষের জীবনের পাপরাশির সর্বোচ্চ পাপকে বোঝান হয়েছে। এরূপ পাপ সংগ্রহকারী ও বহনকারী যদি সারাজীবনে তার কৃত পাপের জন্য বিন্দুমাত্রও বিচলিত না হয় কিংবা অনুতপ্তও না হয়, তবে নিঃসন্দেহে সে সীমালংঘনকারীই থাকবে। আর যদি আল্লাহর রহমতে নিজের মানসিক চেতনায় কেউ অনুতপ্ত হয়ে সীমালংঘনের পরেও যে কোন পর্যায়ে অন্ততঃ মৃত্যুর পূর্বে হ’লেও আল্লাহর শরণাপন্ন হয়, ক্ষমাপ্রার্থী হয়, তাহ’লে তার ঐ অপরাধ ক্ষমা হ’তে পারে।

আল্লাহ মহাজ্ঞানী কৃপাশীল, দয়াশীল, ক্ষমাশীল, অনুগ্রহশীল, ধৈর্যশীল, সুবিচারক, মহাউন্নত, শ্রেষ্ঠ বাদশাহ ইত্যাদি অসীম গুণের অধিকারী। সুতরাং জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে মানুষ সামান্যতম অবনত চিন্তায় আত্মসমর্পণ করলেও মুক্তির পথ পেতে পারে এবং দয়াশীল আল্লাহ তাকে ক্ষমাও করতে পারেন। কিন্তু আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভের জন্য তাঁর দেখানো পথে না চললে এবং তাঁর নিষিদ্ধ পথকে বর্জন না করলে, তিনি যতই ক্ষমাশীল ও করুণাময় হোন না কেন, ঐ পাপী ব্যক্তি উদ্ধত-দুর্বিনীত সীমালংঘনকারী আল্লাহর ক্ষমা পাবে না।

পরিশেষে বলব, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে তাঁর প্রদর্শিত পথে চলে তাঁর সন্তোষ লাভ করার এবং অসন্তোষ থেকে মুক্তি অর্জনের তাওফীক দান করুন- আমীন!

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar