স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো?।। ১ম অংশ

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

ল্যাম্পপোষ্টের অস্পষ্ট আলোয় একজন বয়স্ক লোকের ছায়ামূর্তি আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো।গায়ে মোটা একটি শাল জড়ানো। পৌষের শীত। লোকটা হালকা কাঁপছেও।

আমরা খুলনা থেকে ফিরছিলাম। আমি আর সাজিদ।

ষ্টেশান মাষ্টারের রুমের পাশের একটি বেঞ্চিতে লোকটা আঁটসাঁট হয়ে বসে আছে।

ষ্টেশানে এরকম কতো লোকই তো বসে থাকে।তাই সেদিকে আমার বিশেষ কোন কৌতুহল ছিলো না।কিন্তু সাজিদকে দেখলাম সেদিকে এগিয়ে গেলো।

লোকটার কাছে গিয়েই সাজিদ ধপাস করে বসে পড়লো।আমি দূর থেকে খেয়াল করলাম, লোকটার সাথে সাজিদ হেসে হেসে কথাও বলছে।

আশ্চর্য! খুলনার ষ্টেশান।এখানে সাজিদের পরিচিত লোক কোথা থেকে এলো? তাছাড়া, লোকটিকে দেখে বিশেষ কেউ বলেও মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোন বাদাম বিক্রেতা।বাদাম বিক্রি শেষে প্রতিদিন ওই জায়গায় বসেই রাত কাটিয়ে দেয়।

আমাদের রাতের ট্রেন। এখন বাজে রাত দু’টো।এই সময়ে সাজিদের সাথে কারো দেখা করার কথা থাকলে তা তো আমি জানতামই। অদ্ভুত!

আমি আরেকটু এগিয়ে গেলাম। একটু অগ্রসর হতেই দেখলাম, ভদ্রলোকের হাতে একটি বইও আছে।দূর থেকে আমি বুঝতে পারি নি।

সাজিদ আমাকে ইশারা দিয়ে ডাকলো। আমি গেলাম।

লোকটার চেহারাটা বেশ চেনা চেনা লাগছে,কিন্তু সঠিক মনে করতে পারছি না।

সাজিদ বললো,- ‘এইখানে বোস।ইনি হচ্ছেন হুমায়ুন স্যার।’

হুমায়ুন স্যার? এই নামে কোন হুমায়ুন স্যারকে তো আমি চিনি না।সাজিদকে জিজ্ঞেস করতে যাবো যে কোন হুমায়ুন স্যার, অমনি সাজিদ আবার বললো,- ‘হুমায়ুন আজাদকে চিনিস না? ইনি আর কি।’

এরপর সে লোকটার দিকে ফিরে বললো,- ‘স্যার, এ হলো আমার বন্ধু, আরিফ।’

লোকটা আমার দিকে তাকালো না। সাজিদের দিকে তাকিয়ে আছে।ঠোঁটে মৃদু হাসি।

আমার তখনো ঘোর কাটছেই না।কি হচ্ছে এসব? আমিও ধপাস করে সাজিদের পাশে বসে গেলাম।

সাজিদ আর হুমায়ুন আজাদ নামের লোকটার মধ্যে আলাপ হচ্ছে।এমনভাবে কথা বলছে, যেন তারা পরস্পর পরস্পরকে অনেক আগে থেকেই চিনে।

লোকটা সাজিদকে বলছে,- ‘তোকে কতো করে বলেছি, আমার লেখা ‘আমার অবিশ্বাস’ বইটা ভালোমতো পড়তে। পড়েছিলি?’

সাজিদ বললো,- ‘হ্যাঁ স্যার। পড়েছি তো।’

– ‘তাহলে আবার আস্তিক হয়ে গেলি কেনো? নিশ্চয় কোন ত্যাদড়ের ফাঁদে পড়েছিস? কে সে? নাম বল? পেছনে যে আছে, কি জানি নাম?’

– ‘আরিফ……’

– ‘হ্যাঁ, এই ত্যাদড়ের ফাঁদে পড়েছিস বুঝি? দাঁড়া, তাকে আমি মজা দেখাচ্ছি……..’

এই বলে লোকটা বসা থেকে উঠতে গেলো।

সাজিদ জোরে বলে উঠলো,- ‘না না স্যার। ও কিচ্ছু জানে না।’

– ‘তাহলে?’

– ‘আসলে স্যার, বলতে সংকোচ বোধ করলেও সত্য এটাই যে, নাস্তিকতার উপর আপনি যেসব লজিক দেখিয়েছেন, সেগুলো এতটাই দূর্বল যে, নাস্তিকতার উপর আমি বেশিদিন ঈমান রাখতে পারি নি।’

এইটুকু বলে সাজিদ মাথা নিঁচু করে ফেললো।

লোকটার চেহারাটা মূহুর্তেই রুক্ষ ভাব ধারন করলো। বললো,- ‘তার মানে বলতে চাইছিস, তুই এখন আমার চেয়েও বড় পন্ডিত হয়ে গেছিস? আমার চেয়েও বেশি পড়ে ফেলেছিস? বেশি বুঝে ফেলেছিস?’

সাজিদ তখনও মাথা নিঁচু করে আছে।

লোকটা বললো,- ‘যাক গে! একটা সিগারেট খাবো।ম্যাচ নেই। তোর কাছে আছে?’

– ‘জ্বি স্যার।’- এই বলে সাজিদ ব্যাগ খুলে একটি ম্যাচ বের করে লোকটার হাতে দিলো।সাজিদ সিগারেট খায় না।তবে, প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তার ব্যাগে থাকে সবসময়।

লোকটা সিগারেট ধরালো।কয়েকটা জোরে জোরে টান দিয়ে ফুঁস করে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লো।ধোঁয়াগুলো মূহুর্তেই কুন্ডুলি আকারে ষ্টেশান মাষ্টারের ঘরের রেলিং বেয়ে উঠে যেতে লাগলো উপরের দিকে।আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি।

লোকটার কাশি উঠে গেলো। কাশতে কাশতে লোকটা বসা থাকে উঠে পড়লো। এই মূহুর্তে উনার সিগারেট খাওয়ার আর সম্ভবত ইচ্ছে নেই।লোকটা সিগারেটের টুকরোটিকে নিচে ফেলে পা দিয়ে একটি ঘষা দিলো।অমনি সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরোটি থেঁতলে গেলো।

সাজিদের দিকে ফিরে লোকটা বললো,- ‘তাহলে এখন বিশ্বাস করিস যে স্রষ্টা বলে কেউ আছে?’

সাজিদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।

– ‘স্রষ্টা এই বিশ্বলোক, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছে বলে বিশ্বাস করিস তো?’

আবারো সাজিদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।

এবার লোকটা একটা অদ্ভুত ভয়ঙ্কররকম হাসি দিলো।এই হাসি এতটাই বিদঘুটে ছিলো যে আমার গা ছমছম করতে লাগলো।

লোকটি বললো,- ‘তাহলে বল দেখি, স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো?’

এই প্রশ্নটি করে লোকটি আবার সেই বিদঘুটে হাসিটা হাসলো। গা ছমছমে।

সাজিদ বললো,- ‘স্যার, বাই ডেফিনিশন, স্রষ্টার কোন সৃষ্টিকর্তা থাকতে পারে না।যদি বলি X-ই সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি করেছে, তৎক্ষণাৎ আবার প্রশ্ন উঠবে, তাহলে X- এর সৃষ্টিকর্তা কে? যদি বলি Y, তাহলে আবার প্রশ্ন উঠবে, Y এর সৃষ্টিকর্তা কে? এভাবেই চলতে থাকবে। কোন সমাধানে যাওয়া যাবে না।’

লোকটি বললো,- ‘সমাধান আছে।’

– ‘কি সেটা?’

– ‘মেনে নেওয়া যে- স্রষ্টা নাই,ব্যস!’- এইটুকু বলে লোকটি আবার হাসি দিলো। হা হা হা হা।

সাজিদ আপত্তি জানালো। বললো,- ‘আপনি ভুল, স্যার।’

লোকটি চোখ কপালে তুলে বললো,- ‘কি? আমি? আমি ভুল?’

– ‘জ্বি স্যার।’

– ‘তাহলে বল দেখি, স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো? উত্তর দে।দেখি কতো বড় জ্ঞানের জাহাজ হয়েছিস তুই।’

আমি বুঝতে পারলাম এই লোক সাজিদকে যুক্তির গ্যাড়াকলে ফেলার চেষ্টা করছে।

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar