হজরত বিলাল ইবনে রাবাহ (রাঃ) -এর মর্যাদা

“হযরত বিলাল ইবনে রাবাহ (রাঃ)। পিতার নাম পর্যন্ত জানা যায় না। দাদার নাম কেউ জানে না। মোটা দীর্ঘ দেহ। কোঁকড়া চুল, গর্তে ঢোকা চোখ। কালো কুচকুচে গায়ের রঙ। দুনিয়াতে তিনি কত সম্মান পেলেন! মসজিদে নবাবীর মুয়াজ্জিন। মুয়াজ্জিনের কত মূল্য! আমরা জানি না। আমরা তো জানি না! আমরা তো জানি জেনারেল, মেজর, কমিশনার আর ডাক্তার সাহেবের মূল্য। মুয়াজ্জিনের মূল্য কতটুকু তা আজ আমরা জানি না।
:
আমদের চিন্তা চেতনার পরিবর্তন হয়ে গেছে। আজ আমরা মূর্খ হয়ে গেছি। মুয়াজ্জিন সে যাকে কবরের মাটি খেতে পারবে না। ‘লা ইয়াদা আদ্দু ফি কাবরিহি।’ বড় বড় বাদশাহকে কবর ছিন্ন ভিন্ন করে দিবে। বড় বড় ক্ষমতাধরকে কবর নিষ্পেষিত করে ফেলবে। যদি ইমান, আমল ও তাকওয়া না থাকে। আর মুয়াজ্জিন! তাকে ছোঁয়া কবরের মাটির জন্য হারাম।
:
– ‘আসওয়ালু আনা কাল্ ইয়াওমাল ক্বিয়ামাহ।’
– ‘কাল কিয়ামতের দিন মুয়াজ্জিন সবচেয়ে উঁচু জায়গায় দাঁড়াবে।’
:
লম্বা গর্দান মানে সে সবচেয়ে উঁচু জায়গায় দাঁড়াবে। গোটা হাশরবাসী এক সাথে তাঁর উজ্জল নুরানী চেহারা দেখতে পাবে। এতো উঁচুতে। ঘোষণা হবে, ‘মুয়াজ্জিন কোথায়?’ ঘোষণা হবে ‘ইমাম কোথায়, কোথায় ওলামা? এদেরকে আগে মোতির মিম্বারে নিয়ে বসাও। বাকিদের পরে হিসাব নিকাশ হবে।’
:
রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার আজানের ফজিলত আলোচনা করলেন। হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, ‘আল্লাহর রসুল তাহলে তো দেখছি আজান দেয়ার জন্য আপনার উম্মত তরবারি বের করে ফেলবে।’ (অর্থাৎ এতো বড় পূণ্য পাবার জন্যে একে ওপরকে হত্যা করতেও কুন্ঠিত হবে না।)
:
‘কাল্লা ইয়া উমার,’ রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘কক্ষোনো তা নয় উমার। এমন একদিন আসবে যখন আমার উম্মত আজান তাদেরকে দিয়ে দেবে, যারা সমাজে অবহেলিত, অপমানিত, দুঃস্হ ও দুর্দশাগ্রস্হ। আর আজান দেয়াকে সবচেয়ে অবমাননাকর মনে করবে।’ এতো মুয়াজ্জিন সম্পর্কে! আজ আমাদের জ্ঞান, বোঝার শক্তি ও চিন্তাধারা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। আমরা আলেম, মুয়াজ্জিন, হাফেজ, ক্বারী এদেরকে কোন মর্জাদাই দিই না। কিন্তু আল্লাহ রব্বুল আলামিনের দরবারে এদের কতো সম্মান দেখুন –
:
– ‘ইন্নাফিল জান্নাতি নাহরান ইসমূহু, রায়আন আলাইহি মাদিনাতুহুম মিম্ মারজান লাহু সাবউলা আল্ সাবার, মিম্ রাদিন্না ফিত্তা লাহুমিন আল্ কুরআন।’
– ‘বেহেশতে একটা ঝর্ণা আছে। যার নাম রায়আন। যার ওপর একটা প্রাসাদ আছে। নাম মারজান। যাতে সত্তরহাজার সোনারূপার দরজা রয়েছে। যা হাফিজে কুরআনকে আল্লাহতায়ালা পুরস্কারস্বরূপ দিবেন।’
:
বিলাল (রাঃ) মুয়াজ্জিন হলেন। আর মর্জাদার এমন স্তরে পৌঁছালেন যে, রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেহেরী খাচ্ছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) সাথে ছিলেন। বকরির গোশত ও রুটি দিয়ে তৈরী সারীদের সেহেরী। এমন সময় বিলাল (রাঃ) এলেন। বললেন, ‘খাওয়া বন্ধ করে দিন।’ মসজিদে চলে গেলেন। ফিরে এলেন আবার। দেখতে, যে যদি খাওয়া শেষ হয় তো আজান দিয়ে দিবেন। দেখলেন তখনও রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবার খাচ্ছেন। বললেন, ‘ইয়া রসুলুল্লাহ! ওয়াল্লাহি লাক্বদ আফতাফতা।’ হে আল্লাহর রসুল, কসম আল্লাহর! সুবহে সাদিক হয়ে গেছে।’
:
রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত সরিয়ে নিলেন খাবার থেকে। বললেন, ‘বেলাল, তোমার ভালো হোক। কোথায় ভোর হয়েছে। তুমি চাঁদের আলো দেখে ভুল করেছো। তবুও তোমার কসম যাতে মিথ্যা না হয়ে যায় সেজন্য আল্লাহতায়ালা ভোর করে দিয়েছেন। আমি নবী খাওয়া না শেষ করা পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা সুবহি সাদিক করবেন না।’
:
যেদিন থেকে রাত কেটে গিয়ে ভোর হয় তখন থেকে সেদিন পর্যন্ত আর কখনো সুবহি সাদিক হবার আগে ভোর হয়নি। কিয়ামত পর্যন্ত আর কখনও হবেও না। কিন্তু মুহাম্মদ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাত ধরার কারণে, তাঁর সাথে আত্মীয়তার জন্যে, তাঁর আদর্শে নিজেকে সাজানোর ফলে এমব ক্ষমতা ও শক্তি পয়দা হয়েছে সে আলাহতায়ালা তাঁর নিয়মকে লঙ্ঘন করে সকাল হবার আগেই সকাল করে দিলেন।
:
হযরত আলী (রাঃ) বলেনঃ ‘যদি বিলাল (রাঃ) না বলতেন, আর কসম না খেতেন, তাহলে রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যতক্ষণ খাবার খেতেন ততক্ষণ পর্যন্ত সুবহি সাদিক হতো না।’
:
আখেরী নবী আকা ই নামদার, তাজিদারে মদীনা, মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অণুসারণকারীদের আল্লাহতায়ালা এই সম্মান দিয়েছেন। আর কি পুরস্কার দিবেন?
:
হজরত বিলাল (রাঃ) এর কবর শ্যাম (বর্তমান সিরিয়া) দেশে। রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ ‘হাশরের মাঠে আমার ডানপাশে উঠবে আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), বাঁ দিকে ওমর ফারুক (রাঃ) আর আমার পায়ের নিচ দিয়ে উঠবে বিলাল (রাঃ)। তাঁর (সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) পায়ের নিচ দিয়ে। হাশরের মাঠে সমগ্র মানব চলবে পায়ে হেঁটে। রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চলবেন বোরাকে।
:
– ‘ইয়াশরুনাসো রিজালা বাইয়ুখশারো রাকিবান আলাল বুররাক্।’
আর বিলাল (রাঃ) সাদা রঙের উটের আগে অগ্রসর হবেন। চালক আগে আর পিছনের সীটে তাঁর মালিক। হাশরের মাঠে বিলাল (রাঃ) যখন নামবেন তখন রসুল সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পিছনে বিলাল আগে আগে। তিনি উটনীর ওপর বসে আজান দিবেন। সমগ্র মানবজাতী সেই আজানের আওয়াজ শুনতে পাবে।
:
যখন ‘আশহাদু আল্লা–ইলাহা-ইল্লাল্লহ’ এখানে আসবে তখন গোটা হাশরবাসী বলবে ‘সাদাকতা-সাদাকতা’। সত্য বলেছ সত্য বলেছ। যখন বলবেন ‘আশহাদু-আন্না-মুহাম্মাদার-রসুলুল্লাহ।’ তখন গোটা হাশরবাসী বলবে ‘সাদাকতা’ ‘সাদাকতা।’ এই হচ্ছে আণুগত্যের পুরস্কার।
আল্লাহ আমাদের সহীহ বুঝ দানন করেন। আমিন।।

[সূত্রঃ “কে সেই জন!” বর্ণণায়ঃ মাওলানা তারিক জামিল (দাঃবঃ)]

You may also like...

Skip to toolbar