হযরত আছিয়া (আঃ)- অষ্টম অংশ

নবম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

আছিয়া দূর থেকে দেখতে পেলেন ভরা মজলিস থেকে এক লোক উঠে দাঁড়িয়ে এর প্রতিবাদ করছেন, ভাল করে তাকিয়ে দেখলেন তিনি হিজকীল। ফেরাউনের নিষ্ঠুর চরিত্রের কথা চিন্তা করে মনে মনে তিনি বললেন—লোকটি এক্লহানে এভাবে না বললেই হয়তো ভাল করতো। হিজকীল তাঁর ভরাট গলায় বলতে লাগলেন—

وَقَالَ رَجُلٌ مُّؤْمِنٌ مِّنْ آلِ فِرْعَوْنَ يَكْتُمُ إِيمَانَهُ أَتَقْتُلُونَ رَجُلًا أَن يَقُولَ رَبِّيَ اللَّهُ وَقَدْ جَاءكُم بِالْبَيِّنَاتِ مِن رَّبِّكُمْ وَإِن يَكُ كَاذِبًا فَعَلَيْهِ كَذِبُهُ وَإِن يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُم بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ مُسْرِفٌ كَذَّابٌ

يَا قَوْمِ لَكُمُ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ظَاهِرِينَ فِي الْأَرْضِ فَمَن يَنصُرُنَا مِن بَأْسِ اللَّهِ إِنْ جَاءنَا قَالَ فِرْعَوْنُ مَا أُرِيكُمْ إِلَّا مَا أَرَى وَمَا أَهْدِيكُمْ إِلَّا سَبِيلَ الرَّشَادِ

তোমরা কি একজনকে এজন্যে হত্যা করবে যে, সে বলে, আমার পালনকর্তা আল্লাহ, অথচ সে তোমাদের পালনকর্তার নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণসহ তোমাদের নিকট আগমন করেছে? যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যাবাদিতা তার উপরই চাপবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে যে শাস্তির কথা বলছে, তার কিছু না কিছু তোমাদের উপর পড়বেই। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী, মিথ্যাবাদীকে পথ প্রদর্শন করেন না।

হে আমার কওম, আজ এদেশে তোমাদেরই রাজত্ব, দেশময় তোমরাই বিচরণ করছ; কিন্তু আমাদের আল্লাহর শাস্তি এসে গেলে কে আমাদেরকে সাহায্য করবে? –সুরা—মুমিন, আয়াত ২৮—২৯।

হিজকীলের কথা শুনে ফেরাউন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। পেরেশান হয়ে সে ভাবতে লাগল—আমার সামনে এভাবে কথা বলার দুঃসাহস সে পেল কোথায়? কতটা অবলীলায় সে মূসার পক্ষ সমর্থন করে তাঁকে আমার উপর প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রকাশ্যে জনসম্মুখে মূসার সাথে একাত্মতার ঘোষণা দিতে তাঁর বুকটা একটুও কাঁপল না? এটা কিভাবে সম্ভব হল? অথচ আমিই তো তাঁর প্রভু ও মালিক। হিজকীল কিন্তু তখনো থেমে নেই। এক নাগাড়ে তিনি বলেই চলেছেন। সকল সভাসদকে উপদেশমূলক পরামর্শ দিয়ে তিনি বলতে লাগলেন—

وَقَالَ الَّذِي آمَنَ يَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُم مِّثْلَ يَوْمِ الْأَحْزَابِ

مِثْلَ دَأْبِ قَوْمِ نُوحٍ وَعَادٍ وَثَمُودَ وَالَّذِينَ مِن بَعْدِهِمْ وَمَا اللَّهُ يُرِيدُ ظُلْمًا لِّلْعِبَادِ

وَيَا قَوْمِ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ يَوْمَ التَّنَادِ

يَوْمَ تُوَلُّونَ مُدْبِرِينَ مَا لَكُم مِّنَ اللَّهِ مِنْ عَاصِمٍ وَمَن يُضْلِلِ اللَّهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ

হে আমার কওম, আমি তোমাদের জন্যে পূর্ববর্তী সম্প্রদায়সমূহের মতই বিপদসঙ্কুল দিনের আশংকা করি।

যেমন, কওমে নূহ, আদ, সামুদ ও তাদের পরবর্তীদের অবস্থা হয়েছিল। আল্লাহ বান্দাদের প্রতি কোন যুলুম করার ইচ্ছা করেন না।

হে আমার কওম, আমি তোমাদের জন্যে প্রচন্ড হাঁক-ডাকের দিনের আশংকা করি।

যেদিন তোমরা পেছনে ফিরে পলায়ন করবে; কিন্তু আল্লাহ থেকে তোমাদেরকে রক্ষাকারী কেউ থাকবে না। আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তার কোন পথপ্রদর্শক নেই।–সুরা—মুমিন, আয়াত ৩০—৩৩।

আছিয়া হিজকীলের কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন এবং তাঁকে নিয়ে প্রবল উৎকণ্ঠায়ও ভোগছিলেন। হয়তো এখনি সে ফেরাউনের রোষানলে দগ্ধ হয় কিনা? যা ভাবনা তাই। ফেরাউন অনতিবিলম্বে হিজকীলকে বন্দী করে হত্যা করে ফেলার নির্দেশ জারী করল। কেননা ফেরাউনের স্বগোত্র কিংবা সভাসদদের কেউই আজ পর্যন্ত এমন দুঃসাহস কখনো দেখাতে পারেনি। যে ফেরাউনের জন্য এ দুঃসাহস সে ফেরাউনের সামান্য পরিবর্তনও হল না। উল্টো তাঁর হিংস্রতা ও শয়তানী বেড়ে গেল কয়েকগুণ। হিজকীল কিন্তু সহজে ধরা দিলেন না। পালিয়ে আত্মগোপন করলেন তিনি; বরং বলা উচিৎ, আল্লাহ পাকই তাঁকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করলেন। কারণ তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও সত্যানুরাগী একজন মানুষ। মানুষকে কল্যাণের পথ দেখাতে গিয়ে কখনোই কারো নন্দা ও ভর্ৎসনার পরোয়া করতেন না।

ফেরাউন নিজের খাস কামরায় বসে মূসা (আঃ) সম্পর্কে সীমাহীন উদ্বেগ নিয়ে আছিয়ার সাথে আলোচনায় প্রবৃত্ত হল। বলতে লাগল—এই মূসাকে আমরা আদর যত্ন করে প্রতিপালন করলাম। আর সে কি না আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উঁচিয়ে ধরছে। কিসের এক নতুন ধর্মের দাওয়াত দিচ্ছে মানুষকে। দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি আমরা। একথা বলে জ্যোতিষীর সেই কথাকে স্মরণ করিয়ে দিল সে। অচিরেই বনী ইসরাঈলের ঘরে এক সন্তান জম্ম নিবে যে আপনার রাজত্বের পতন ঘন্টা বাজাবে। সে লক্ষ্য করল আছিয়া এই ভাবনানুভূতি ও আবেগকে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছে না। তেমন একটি মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথাগুলো শুনছে না। ফেরাউন চিৎকার করে বলল মূসাকে নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় পাথর হয়ে যাচ্ছি আর আমাকে সহানুভূতি জানানো তো দূরে থাক আমার কথার সামান্য গুরুত্ব্বও তুমি দিচ্ছ না। তুমি কি ভুলে গেছ যে, তুমি আমার স্ত্রী? আছিয়া নিজের পথ ধরে এগুলেন। পাল্টা প্রশ্ন করলেন তিনি। তুমি মূসাকে অপছন্দ কর কেন? বিস্মিত হয়ে ফেরাউন জবাব দিল সে আমার প্রভুত্ব অস্বীকার করে অন্য কাউকে প্রভু বলে বিশ্বাস করে। আছিয়া বললেন—মূসাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা ও বাড়াবাড়ি করো না। যে ঘটনা ও বাস্তবতা আজ স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করলে তা নিয়ে একটু ভেবে দেখ, গভীর চিন্তায় একটু ডুব দাও, তারপর বলো কী অন্যায়টা মূসা করেছে। কেন সৎ পথের দিশারী বলে তাঁকে স্বীকার করবে না?

তুমি তো প্রবঞ্চক হামানের নির্জলা মিথ্যা কথাগুলোকেই প্রত্যাদেশের মত গুরুত্ব দাও। আর হামান মূসাকে শুরু থেকেই অপছন্দ করে। সে চায় তুমি মূসার সাথে শত্রুতা কর। তাঁর প্রত্যাশা তোমার অন্তরে কেবল সে একাই বসবাস করবে। তুমি কখনো একথা বলছ না কেন যে, মূসা হকের পথেই আমাদের ডেকে যাচ্ছে আর হামানই মূলতঃ ভুলের পসরা বিকিনি করছে?

আছিয়ার নতুন মূর্তি দেখে এবং তাঁর কথাগুলো শুনে ফেরাউন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আশ্চর্য হয়ে সে ভাবতে লাগল এ হতভাগী এ কী কথা বলছে আমাকে? এরপর থেকে সে আছিয়াকে সন্দেহজনক চোখে দেখতে লাগল। তাঁর চাল চলন, কথাবার্তা সব কিছু সন্দেহজনক মনে হতে লাগল। এমনকি তাঁর কন্যাদের পরিচারিকা হিযকীলের স্ত্রীকেও সন্দেহের আওতায় নিয়ে আসল সে, তাঁর সব কাজকর্ম গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য গোয়েন্দা নিযুক্ত করল সে, অবশেষে তাঁর কাছে নিশ্চিত সূত্রে সংবাদ পৌঁছল এ পরিচারিকাটি মূসা (আঃ) এর একান্ত ভক্ত ও অনুসারী। এবার ফেরাউনের ক্রোধের কোন সীমা পরিসীমা রইল না। তারই রাজ প্রাসাদে মূসার ধর্ম ঢুকে গেছে। তাঁর স্ত্রী, দাস দাসী, পরিচারিকা, সিপাহী প্রহরী, কর্মচারী এবং তাঁকে প্রভুত্বের আসনে সমাসীনকারী লোকগুলোক ও আজ মূসার দ্বীনের সামনে মাথা নুইয়ে দিয়েছে। নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে বজ্রের মত গর্জন করে উঠল সে। আছিয়া! এ পরিচারিকা ও তাঁর স্বামীর মরণই একমাত্র প্রাপ্য। তাদেরকে এমন ভয়ানক শাস্তি দাও, যার প্রচন্ডতায় তারা যেন মৃত্যু বরণ করতে বাধ্য হয়। আছিয়া তাঁর পরিচারিকার ব্যাপারে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন। কিছুটা প্রকৃতিস্থ হয়ে তিনি বললেন—এ মেয়েটি আসলে এসব কিছু সুঝে না। কথাগুলো তিনি মূলতঃ নিরাপরাধ মেয়েটিকে ফেরাউনের কবল থেকে বাঁচানোর জন্যই বললেন। কিন্তু ফেরাউন আছিয়ার কথার দিকে সামান্য ভ্রূক্ষেপও করল না; বরং কিছুটা রাগচটা হয়ে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল তুমিও কিন্তু সন্দেহভাজনদের মাঝে আছ। মূসার পক্ষপাতিত্বে তুমিও কিন্তু কম যাও না। বিরক্তি ও আক্রমণাত্মক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে এক নজর তাকিয়ে ফেরাউন উঠে দাঁড়াল। তাঁর কড়া নির্দেশ হিজকীলের স্ত্রী কোথায়? এক্ষুণি তাঁকে আমার সামনে হাজির কর।

ফেরাউনের প্রহরীরা বেরিয়ে এল। তাঁর কন্যাদের কেশ পরিপাটি ক্লরার দায়িত্ব নিযুক্ত পরিচারিকা হিজকীলের স্ত্রীকে আটক করল তারা। কেউ বাহু ধরে, কেউ চুলের মুঠি ধরে নির্মমভাবে টেনে হিঁচড়ে ফেরাউনের সামনে হাজির করল তাঁকে। প্রশ্ন প্রস্তত করাই ছিল। সরাসরি বলে ফেলল সে আরে কুলাঙ্গার মহিলা! তোর প্রভু কে! নিঃশঙ্ক ভঙ্গিতে সে উত্তর দিল—আমার ও তোমাদের সকলের প্রভু একমাত্র আল্লাহ। যিনি আমাদের সকলকে সৃষ্টি করেছেন। বিকট গর্জন করে উঠল ফেরাউন। বদবখত! এত বড় স্পর্ধা তোর। মুখের উপর আমাকে অপমান। প্রহরী! পুড়িয়ে মেরে ফেল এ নেমকহারামীটাকে। আর শোন!   এর ছেলেটাকে আগে ওর সামনে জ্বালিয়ে দাও। বুঝুক আমাকে অবজ্ঞা করার মজা কাকে বলে।

নবম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar