হযরত আছিয়া (আঃ)- ষষ্ঠ অংশ

সপ্তম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

এ জবাব শুনে ফেরাউনের ক্রোধ কয়েকগুণ বেড়ে গেল। তাঁর আওয়াজে ক্ষিপ্রতা এসে গেল। দরবারের কথাবার্তা শুনে আছিয়া নিজ কামরায় ফিরে এসে বলতে লাগলেন—মূসার উপর এবং যে দ্বীনের দাওয়াত তারা নিয়ে এসেছে আমি তাঁর উপর পূর্ণ ঈমান আনলাম। রাব্বুল আলামীনের সমীপে নিজেকে সর্বোতভাবে সমর্পণ করলাম। এ দিকে ফেরাউনের বিকট আওয়াজ দরবার ছাড়িয়ে বাইরে এসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। সে বলছে, তোমরা কি এর কথা শুনছ? এদের জিজ্ঞেস কর, কাকে তারা প্রভু মানে, তাদের রব কে? মূসা (আঃ) বললেন—যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্বপুরুষের প্রভু, তিনিই আমাদের প্রভু। নিখিল পৃথিবী ও এর মধ্যকার সবকিছুর যিনি স্রষ্টা তিনিই আমাদের রব। তোমাদের সুস্থ বিবেক থাকলে তোমরাও এটা বুঝতে পারবে।

ফেরাউন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, যদি আমি ভিন্ন অন্য কাউকে তোমরা মাবুদ মনে কর তাহলে অবশ্যই আমি তোমাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করব। একান্ত ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে প্রশান্ত চিত্তে মূসা (আঃ) বললেন, যদি আমার দাবীর স্বপক্ষে সুস্পষত কোন দলীল কিংবা অলৌকিক কোন    প্রমাণ পেশ করতে পারি তাহলে কি আমার কথার সত্যায়ন তোমরা করবে? তাপরেও কি তোমাদের মনের অমূলক সন্দেহ—সংশয় দূর হবে না। ফেরাউন বলল, আচ্ছা তুমি যদি নিজ দাবীতে সত্যবাদী হয়ে থাক তাহলে আমাদেরকে কোন মুজিযা দেখাও।

আছিয়া আবার আগের জায়গায় ফিরে এসেছেন। এবার তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবতে লাগলেন—মূসা কি কোন জাদুকর? নাকি সত্যিই সে একজন মুজিজাধারী যে,তাঁর স্বেচ্ছাচারী স্বামীর অহংকার ও দম্ভকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারবে। তিনি মনে মনে বলতে লাগলেন, মূসা! তুমি যদি জাদুকর হয়ে থাক তাহলে কস্মিনকালেও বিজয়ের নাগাল পাবে না তুমি। এরাই বিজয়ী হবে। এদের ঔদ্ধত্য বেড়ে যাবে আরো কয়েকগুণ। তিনি নিজেই আবার এ ধারণা প্রত্যাখ্যান করে বললেন—এমন তো নাও হতে পারে! সর্বোপরি তিনি নিরাশ ছিলেন না। আছিয়ার ভাবতন্ময়তা কাটতে না কাটতেই তিনি দেখতে পেলেন মূসা (আঃ) তাঁর হাতের লাঠিটি বৃত্তাকারে হাওয়ায় ভাসিয়ে জমিনে ছেড়ে দিলেন। কোন আওয়াজ হল না ঠিকই কিন্তু বিশালকায় এক অজগরে পরিণত হল লাঠিটি। প্রকান্ড মাথাটি উঁচুতে তুলে বিষাক্ত দাঁতগুলো বের করে সে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। ফেরাউন ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। সাপটি এমনভাবে ফেরাউনের দিকে এগুতে লাগল যেন, এক্ষুণি তাঁকে গিলে খাবে। ফেরাউন আত্মসংবরণ করে বলল—মূসা! তোমার সামর্থ কি এটুকুই। নাকি আরো কোন ভেল্কি তোমার ভান্ডারে আছে? মূসা (আঃ) নিজের ডানহাত বাম বগলের নিচে থেকে বের করে প্রলম্বিত করে মেলে ধরলেন। অপরূপ শুভ্র জ্যোতির বিচ্ছুরণ শুরু হল সেখান থেকে। রশ্মির তীব্রতায় সকলের চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। গোটা দরবার আলোকিত হয়ে সুদূর দিগন্ত পর্যন্ত সে আলো ছড়িয়ে পড়ল।

এসব কল্পনাতীত বাস্তবতা চাক্ষুষ দেখতে পেয়ে আছিয়া বলতে লাগলেন নিশ্চয় আল্লাহ পাক মুসাকে সহায়তা করবেন। তাঁকে বিজয়ী আর ফেরাউনকে পরাজিত করবেন। কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গিয়েছিল তাঁর হৃৎপিণ্ডে। তবুও তিনি আশান্বিত হয়ে উঠলেন; হয়তো এবার তাঁর স্বামীর মনে ভীতির সঞ্চার হয়ে মূসা (আঃ) এর দাওয়াতের সামনে মাথানত করবে সে। নিজের জুলুম—নির্যাতনের ঘৃণ্য পথ থেকে ফিরে আসবে। আছিয়া তাঁর স্বামীর অজ্ঞতা আর বর্বরতাকে ভীষণ অপছন্দ করতেন, ষন্ডামার্কা মন্ত্রীদের প্ররোচনায় তাঁর নিষ্ঠুরতার মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যেত। আছিয়া তখন খুবই মর্মাহত হয়ে পড়তেন। কৃত্রিম প্রভুত্বের অন্ধ—অহমিকার ফেরাউন মাঝে মাঝে তুলকালাম অকান্ড ঘটিয়ে ফেলত। আর তাঁর নির্মমতার যুপকাষ্ঠের বলি হত বেচারা বনী ইসরাঈল। সব কিছুর পরও আছিয়া এবার আশান্বিত হয়ে উঠলেন।

কিন্তু তাঁর আশার ব্যর্থ হতে খুব বেশী সময় লাগল না। ফেরাউন তাঁর সভাসদকে সম্বোধন করে বলল—তোমরা জেনে রাখ, মূসা ও তাঁর ভাই হচ্ছে আস্ত জাদুকর। জাদু বলে তারা তোমাদেরকে তোমাদের ভীখন্ড থেকে বের করে নিতে চায়। তোমাদের করণীয় সম্পর্কে তোমরাই এবার সিদ্ধান্ত নাও। জনৈক মন্ত্রী পরামর্শ দিল বাদশাহ সালামত! মূসা ও তাঁর ভাইয়ের যাদুর যথোচিত জবাব দেয়া দরকার। আপনি সমগ্র মিসরে আপনার প্রতিনিধি পাঠিয়ে দিন। তারা দেশের সব অভিজ্ঞ জাদুকরদের আপনার দরবারে এনে উপস্থিত করবে। তারাই মূসাকে সমুচিত শিক্ষা দিবে। পরামর্শটি ফেরাউনের খুবই মনঃপূত হল। সে দেশের চতুর্দিকে থেকে জাদুকরদের একত্রিত করায় ব্যস্ত হয়ে উঠল। আছিয়া জাদুকরদের তেলেসমাতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেন। কাজেই মূসা (আঃ) কে নিয়ে তিনি মহাভাবনায় ডুবে গেলেন। সেই যে, ফেরাউনকে সম্বোধন করে তিনি বলেছিলেন,

فَأْتِيَاهُ فَقُولَا إِنَّا رَسُولَا رَبِّكَ فَأَرْسِلْ مَعَنَا بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا تُعَذِّبْهُمْ قَدْ جِئْنَاكَ بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكَ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى

আমরা উভয়েই তোমার পালনকর্তার প্রেরিত রসূল, অতএব আমাদের সাথে বনী ইসরাঈলকে যেতে দাও এবং তাদেরকে নিপীড়ন করো না। আমরা তোমার পালনকর্তার কাছ থেকে নিদর্শন নিয়ে তোমার কাছে আগমন করেছি। এবং যে সৎপথ অনুসরণ করে, তার প্রতি শান্তি।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৪৭।

আছিয়া তাদের নিম্মোক্ত বক্তব্যটি নিয়েও বিস্তর ভাবতে থাকলেন—

إِنَّا قَدْ أُوحِيَ إِلَيْنَا أَنَّ الْعَذَابَ عَلَى مَن كَذَّبَ وَتَوَلَّى

আমাদের এ মর্মেও ওহী পাঠানো হয়েছে যে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং সঠিক দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে যায় তাদের উপর আল্লাহর আজাব অবধারিত ।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৪৮।

সপ্তম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar