হযরত আছিয়া (আঃ)- সপ্তম অংশ

অষ্টম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

এসব কথাবার্তা নিয়ে গভীর চিন্তা—ভাবনা করে আছিয়া মূসা (আঃ) এর অকপট উপস্থাপন ও সাবলীল বর্ণনাভঙ্গিতে বেশ চমৎকৃত হলেন। কত ছোট্ট অথচ পূর্ণাঙ্গভাবে তিনি মহান প্রভুর গুণাবলীর পরিচয় তুলে ধরে বলেছিলেন—

قَالَ رَبُّنَا الَّذِي أَعْطَى كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَى

আমাদের পালনকর্তা তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি দান করেছেন, অতঃপর পথপ্রদর্শন করেছেন।–সুরা ত্ব-হা, আয়াত ৫০।

আছিয়া মূসা (আঃ) এর প্রশকৃত সব কিছুর উপর ঈমান এনে মনে মনে ফেরাউনকে বললেন—মূসার সাথে বিতর্কে তুমি হেরে গেছ। বিশেষ করে যখন তুমি মূসাকে বলেছিলে,

قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى

তাহলে অতীত যুগের লোকদের অবস্থা কি? আর তৎক্ষণাৎ মূসা এর যুৎসই উত্তর দিয়ে বলেছিল,

قَالَ عِلْمُهَا عِندَ رَبِّي فِي كِتَابٍ لَّا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنسَى

الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَسَلَكَ لَكُمْ فِيهَا سُبُلًا وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاء مَاء فَأَخْرَجْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّن نَّبَاتٍ شَتَّى

كُلُوا وَارْعَوْا أَنْعَامَكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِّأُوْلِي النُّهَى

তাদের খবর আমার পালনকর্তার কাছে লিখিত আছে। আমার পালনকর্তা ভ্রান্ত হন না এং বিস্মৃতও হন না।

তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে শয্যা করেছেন এবং তাতে চলার পথ করেছেন, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেছেন এবং তা দ্বারা আমি বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।

তোমরা আহার কর এবং তোমাদের চতুস্পদ জন্তু চরাও। নিশ্চয় এতে বিবেক বানদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।–সুরা—ত্ব-হা, আয়াত ৫২—৫৪।

গভীর ভাবনায় সীমানা পেরিয়ে ঈমানের ভূখন্ডে ঢুকে পড়লেন আছিয়া। নারীদের মাঝে তিনিই সর্ব প্রথম মূসা (আঃ) এর উপর ঈমান আনেন। নিজের এ আবেগ ও অনুভূতি তিনি হিজকীলের স্ত্রীর (এ মহিলা তাঁর সেবিকা ছিলেন–) সামনে তুলে ধরলেন। হিজকীল ইতিপূর্বেই ঈমান এনেছিলেন কিন্তু ফেরাউনের ভয়ে তিনি ঈমান গোপন রেখেছিলেন হঠাৎ ফেরাউনের চিৎকারের বিকট আওয়াজ শোনা গেল। দরবারের বিশাল পরিসর পেরিয়ে বাহিরের প্রশস্ত আঙ্গিনাজুড়ে সে আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে। আত্মম্ভরিতার সুরে সে বলছে—কালই মূসা তাঁর জাদুর চূড়ান্ত পরিণাম দেখতে পাবে। তাঁর জাদুর ক্ষমতা চিরতরে নস্যাৎ করে দেয়া হবে কাল।

পরের দিন শহরের সকল লোক ফেরাউনের জাদুকরদের দেখার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে সমবেত হল। জাদুকররা তাদের ঐন্দ্রজালিক খেল দেখাতে শুরু করল। হাতের রশিগুলোকে তারা জাদুবলে চলন্ত সাপে পরিণত করল। এ দেখে ফেরাউন ও তাঁর সঙ্গিরাও তো খুশিতে আটখানা। এ দিকে মূসা (আঃ) এর কপালে একটি চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল। আমার লাঠিও যদি সাপ হয় তাহলে লোকেরা জাদু ও মুজিজার পার্থক্য করবে কিভাবে। সঙ্গে সঙ্গেই আল্লাহ পাক সান্ত্বনা দিয়ে নিশ্চিন্ত করলেন। ও দিকে আছিয়া জাদুকরদের অভিনব কীর্তি দেখে ভয়ে এতটুকন হয়ে গেলেন। দুশ্চিন্তায় কালো হয়ে গেল তাঁর চেহারা। এতক্ষণে মূসা (আঃ) তাঁর হাতে লাঠি জমীনে ছেড়ে দিয়েছেন। মুহূর্তেই এক প্রকান্ড সাপ হয়ে তা নড়েচড়ে উঠল। জাদুকরদের সাপের বিপরীত পার্শ্বে দাঁড়িয়ে এগিয়ে প্রতিটি সাপকেই গিলে খেতে লাগল। সামান্য সময়ের ব্যবধানে গোটা ময়দান খালি হয়ে গেল। এ অভাবিত দৃশ্য দেখে আছিয়া তো আনন্দে আত্মহারা প্রায়। অজ্ঞাতেই ভেতর থেকে কৃতজ্ঞতার আওয়াজ বেরিয়ে এল। আরেকটু হলেই সে আওয়াজ সকলের কানে চলে যেত। কিন্তু নিজেকে সংবরণ করে তিনি শুধু বললেন—আলহামদুলিল্লাহ! অবশেষে মূশাকেই তিনি বিজয়ী করলেন। অল্প কিছুক্ষণ পরেই তাঁর খুশির জোয়ার আর বাঁধ মানল না। যখন তিনি দেখলেন, পরাজিত জাদুকররা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে মূসা (আঃ) এরপ্রতি ঈমানের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে আল্লাহর সমীপে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছে। পাষন্ড ফেরাউন তাদের অমানুষিক শাস্তি দিয়ে চোখের সামনে নির্মমভাবে হত্যা করে ফেলল। কিন্তু তারা সফলকাম। কিয়ামতের দিন অবশ্যই আল্লাহ পাক তাদের মহা পুরস্কারে ভূষিত করবেন।

পরাজয়ের চরম গ্লানি মাথায় নিয়ে নিদারুণ লাঞ্ছিত ও অপদস্ত হয়ে ফেরাউন প্রাসাদে ফিরল। আছিয়াও ফিরে এলেন প্রাসাদে। স্বামীর সাথে কোন কথা হল না তাঁর। কারণ ঘটে যাওয়া কোন কিছুই তাঁর অগোচরে ছিল না। নিজের আলীশান সিংহাসনে বসে ভরা মজলিসে দিশেহারা ফেরাউন গম্ভীর হয়ে বলতে লাগল,

وَقَالَ فِرْعَوْنُ ذَرُونِي أَقْتُلْ مُوسَى وَلْيَدْعُ رَبَّهُ إِنِّي أَخَافُ أَن يُبَدِّلَ دِينَكُمْ أَوْ أَن يُظْهِرَ فِي الْأَرْضِ الْفَسَادَ

তোমরা আমাকে ছাড়, মূসাকে হত্যা করতে দাও, ডাকুক সে তার পালনকর্তাকে! আমি আশংকা করি যে, সে তোমাদের ধর্ম পরিবর্তন করে দেবে অথবা সে দেশময় বিপর্যয় সৃষ্টি করবে।–সুরা মুমিন, আয়াত ২৬।

অষ্টম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar