হাস্সান ইবন সাবিত (রা)।। ১ম অংশ

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

সীরাতের গ্রন্থসমূহ হাস্সানের (রা) অনেকগুলি ডাকনাম বা কুনিয়াত পাওয়া যায়। আবুল ওয়ালীদ, আবুল মাদরাব, আবুল হুসাম ও আবূ আবদির রহমান। তবে আবুল ওয়ারীদ সর্বাধিক প্রসিদ্ধ।১ তাঁর লকব বা উপাধি ‘শায়িরু রাসূলিল্লাহ’ বা রাসূলুল্লাহর (সা) কবি। তাঁর পিতার নাম সাবিত ইবন আল-মুনজির এবং মাতার নাম আল-ফুরাই’য়া বিনতু খালিদা।২ ইবন সা‘দ আল-ওয়াকিদীর সূত্রে তাঁর মায়ের ানম আল-ফুরাইয়া বিনত হুরাইস বলে উল্লেখ করেছেন।৩ তাঁরা উভয়ে মদীনার বিখ্যাত নাযরাজ গোত্রের বনু নাজ্জার শাখার সন্তান। রাসূলুল্লাহর (সা) মাতুল গোত্র বনু নাজ্জারে সন্তান হওয়ার কারণে রাসূলে পাকের (সা) সাথে আত্মীয়তা ও রক্তের সম্পর্ক ছিল।৪ মা আল-ফুরাইয়া ইসলামের আবির্ভাব কাল পেয়েছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ করে সাহাবিয়্রাতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন।৫ তিনি ছিলেন খাযরাজ গোত্রের বিখ্যাত নেতা সা‘দ ইবন উবাদার (রা) চাচাতো বোন।৬ হযরত হাসসান (রা) তাঁর কবিতার একটি চরণে মা আল-ফুরাইয়া’র নামটি ধরে রেখেছেন।৭ প্রখ্যাত সাহাবী শাদ্দাদ ইবন আউস (রা) হাস্সানের (রা) ভাতিজা।৮ হাস্সান (রা) একজন সাহাবী, রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারী কবি, দুনিয়ার সকল ঈমানদার কবিদের ইমাম এবং তাঁর কাব্য প্রতিভা রুহুল কুদুস জিবরীল দ্বারা সমর্থিত।৯

ইবন সাল্লাম আল-জামহী বলেনঃ হাস্সানের পিতা সাবিত ইবন আল-মুনজির ছিলেন তাঁর সম্প্রদায়ের একজন নেতা ও সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁর দাদা আল-মুনজির প্রাক-ইসলামী আমলে ‘সুমাইয়া’ যুদ্ধের সময় মীদনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়ের বিচারক হয়ে তাদের মধ্যে ফায়সালা করেছিলেন। কবি হাস্সানের কবিতায় তার একটি বর্ণনা পাওয়া যায়। একবার মুযানিয়্যা গ্রো কবির পিতাকে বন্দী করেছিল। কবির গোত্র তাঁকে ছাড়িয়ে আনার জন্য ফিদিয়ার প্রস্তাব দিলে তারা প্রত্যাখ্যান করে। দীর্ঘদিন বন্দী থাকার পর তাঁর পিতার  প্রস্তাবেই বন্দী বিনিময়ের মাধ্যমে তিনি মুক্ত হন।১০ হাস্সানের দাদা আল-মুনজির ছিলেন খুবই উদার ও শান্তিপ্রিয় মানুষ।

হাস্সান হিজরাতের প্রায় ষাট বচর পূর্বে ৫৬৩ খ্রীষ্টাব্দে ইয়াসরিবে (মদীনা) জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে নির্মিত মসজিদে নব্বীর পশ্চিম প্রান্তে বাবে রহমতের বিপরীত দিকে অবস্থিত ‘ফারে’ কিল্লাটি ছির তাঁদের পৈত্রিক আবাসস্থল। হাস্সানের কবিতায় এর একটি বর্ণনা পাওয়া যায়।১১ কবি হিসেবে বেড়ে ওঠেন এবং কবিতাকে জীবকিার উৎস হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রাচীন আরবের জিল্লাক ও হীরার রাজপ্রাসাদে যাতায়াত ছিল। তবে গাস্সানীয় সম্রাটদের প্রতি একটু বেশী দুর্বল ছিরেন। হাস্সানের সাথে ত৭াদের একটা গভীর হৃদ্যতার সম্পর্কে গড়ে ওঠে। তিনি তাঁদের প্রশংসায় বহু সুন্দর সুন্দর কবিতা রচনা করেছেন। তার কিছু অংশ সাহিত্য সমালোচকগণ হাস্সানের শ্রেষ্ঠ কবিতার মধ্যে গণ্য করেছেন।১২ সম্রাটগণও প্রতিদানে তাঁর প্রতি যথেষ্ট বদান্যতা প্রদর্শন করেছেন। তাঁদের এ সম্পর্ক ইসলামের  পরেও বিদ্যমান ছিল।১৩

গাস্সানীয় সাম্রাজ্যের শেষ সম্রাট জাবালা ইবন আল-আয়হাম। তাঁর প্রশংসাংয় কবি হাস্সান অনেক কবিতা রচনা করেছেন। খলীফা উমারের (রা) খিলাফতকালে গোটা শামে ইসলামের পতাকা উড্ডীন হলে এই সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পরাজয়ের পর জাবালা ইবন আল-আয়হাম ইসলাম গ্রহণ করে কিচুকাল হিজাযে বসবাস করেন। এ সময় একবার হজ্জ করতে যান। কা’বা তাওয়াফের সময় ঘটনাক্রমে ত৭ার কাপড়ের আঁচল এক আরব বেদুঈনকে একইভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার নির্দেশ দিরে। জাবালা আত্মাপক্ষ সমর্থন করে বলরেন: আমি একজন রাজা। একজন বেদুঈন কিভাবে আমাকে থাপ্পড় মাতে পারে? উমার (রা) বললেন: ইসলাম আপনাকে ও তাকে একই কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে। জাবালা বিষয়টি একটু ভেবে দেখার কথা বলে সময় চেয়ে নিলেন। এরপর রাতের আঁধারে রোমান সাম্রাজ্যে পালিয়ে যান। পরবর্তীকালে ইসলাম ত্যাগ করেন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।১৪

এই রোমান সাম্রাজ্যে অবস্থানকালে পরবর্তীকালে একবার মু’য়াবিয়া (রা) প্রেরিত এক দূতের সাথে জাবারার সেখানে সাক্ষাৎ হয়। জাবালা তাঁর নিকট হাস্সানের কুশল জিজ্ঞেস করেন। দূত বলেন: তিনি এখন বার্দ্ধক্যে জর্জরিত। অন্ধ হয়ে গেছেন। হাস্সানকে দেওয়ার জন্য জাবালা তাঁর হাতে এক হাজার দীনার দানকরেন। দূত মদীনায় ফিরে আসলেন এবং কবিকে মসজিদে নববীতে পেরেন। তিনি কবিকে বলরেন: আপনার বন্ধু জাবালা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। কবি বললেন: তহালে তুমি যা নিয়ে এসেছো তা দাও। দূত বরলেন: আবুল ওয়ালীদ, আমি কিচু নিয়ে এসেছি তা আপনি কি করে জানলেন? বললেন: তাঁর কাছ থেকে যখনই কোন চিঠি আসে, সাথে কিছুনা কিছু থাকেই।১৫

আল-আসমা’ঈ বণৃনা করেছেন। একবার এক গাস্সানীয় সম্রাট দূত মারফত কবি হাস্সানের নিকট পাঁচ শো দীনার ও কিচু কাগড় পাঠিয়েছিরেন। দূতকে বলে দিয়েছিলেন, তিনি যদি জীবিত না থাকেন তাহলে কাপড়গুলো কবরের ওপর বিছিয়ে দেবে এবং দীনারগুলি দ্বারা একটি উট খরীদ করে তার কবরে পাশে জবেহ করবে। দূত মদীনায় এসে কবির সাক্ষাৎ পেলেন এবং কথাগুলি বললেন। কবি বললেন: তুমি আমাকে মৃতই পেয়েছো।১৬

গাস্সানীয় রাজ দরবারের মত হীরার রাজ দরবারেও কবি হাস্সানের প্রঅভাব প্রতিপত্তি ছিল। জুরজী যায়দান বলেন: প্রাক-ইসলামী আমলে যে সকল খ্যাতিমান আরব কবির হীরার রাজ দরবারের আসা-যাওয়া ছিল এবং আপনা কাব্য-প্রতিভা বলে সেখানে মর্যাদার আসনটি লাভ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হাস্সান অন্যতম।১৭

ইসলাম-পূর্বকারে কবি হাস্সান ইয়াসরিবের চির প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গোত্র আউস ও খাযরাজের মধ্যে যে সকল যুদ্ধ হতো তাতে নিজ গোত্রের মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতেন। আর এখান থেকেই প্রতিপক্ষ আউস গোত্রের দুই শ্রেষ্ঠ কবি কায়স ইবন খুতাইম ও আবী কায়স ইবন আল-আসলাত-এর সাথে কাব্য যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।১৮

হাস্সানের চার পুরুষ অতি দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। প্রত্যেকে একশো বিশ বছর করে বেঁচে ছিলেন। আরবের আর কোন খান্দানের পরপর চার পুরুষ এত দীর্ঘ জীবন লাভ করেনি হাস্সানের প্রপিতামহ হারাম, পিতামহ আল-মুনজির, পিতা সাবিত এবং তিনি নিজে-পেেত্যকে ১২০ বছর বেঁচে ছিলেন।১৯

হাস্সান যখন ইসলাম গ্রহণ করেন তখন তাঁর জীবনে বার্দ্ধক্য এসে গেছে। মদীনায় ইসলাম প্রচারের সূচনা পর্বে তিনি মুসলমান হন। রাসূলুল্লাহর (সা) মদীনায় হিজরাতের সময় হাস্সানের বয়স হয়েছিল ষাট বছর।২০ ইবন ইসহাক হাস্সানের পৌত্র আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হিজরাতের সময় তাঁর বয়স ষাট, এবং রাসূলুল্লাহর (সা) বয়স তিপ্পান্ন বছর ছিল। ইবন সা’দ আরো বর্ণনা করেছেন যে, তিনি ষাট বছর জাহিলিয়্যাতের এবং ষাট বছর ইসলামের  জীবন লাভ করেন।২১

রাসূলুল্লাহর (সা) আবির্ভাব বিষয়ে ইবন ইসহাক হাস্সানের একটি বর্ণনা নকল করেছেন। হাস্সান বলেন: আমি তখন সাত/আট বছরের এক চালাক=-চতুর বালক। যা কিচু শুনতাম, বুঝতাম। একদিন এক ইহুদীকে ইয়াসরিবের একটি কল্লিার ওপর উঠে চিৎকার করে মানুষকে কাডতে শুনলাম। মানুষ জড় হলে সে বলতে লাগলো: আজ রাতে আহমাদের লক্ষত্র উদিত হয়েছে। আহমাদকে আজ নবী করে দুনিয়ায় পাঠানো হবে।২২

ইবনুল কালবী বলেন: হাস্সান ছিরেন একজন বাগ্মী ও বীর। কোন এক রোগে তাঁর মধ্যে ভীরুতা এসে যায়। এরপর থেকে তিনি আর যুদ্ধের দিকে তাকাতে পারতেন না এবং কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণও করেননি।২৩ তবে ইবন ‘আব্বাসের (রা) একটি বর্ণনায় জানা যায়, তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। আল্লামাহ ইবন হাজার ‘আসকালানী লিখেছেন: একবার ইবন আববাসকে বলা হলো হাস্সান-আল-লা’ঈন’ (অভিশপ্ত হাস্সান) এসেছে। তিনি বললেন: হাস্সান অভিশপ্ত নন। তিনি জীবন ও জিহবা দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) সাথে জিহাদ করেছেন।২৪ আল্লামাহ্ জাহাবী বলেন, এ বণৃনা দ্বারা প্রমাণিত হয় তিনি জিহাদে অংশগ্রহণ করেছেন।২৫

হাস্সানের (রা) যুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সম্পর্কে যে সবকথা প্রচলিত আছে তা এই বর্ণনায় বিপরীত। খন্দক মতান্তরে উহুদ যুদ্ধের সময় রাসূল (সা) মুসলিম মহিলাদেরকে হাস্সানের ফারে দূর্গে নিরাপত্তার জন্য রেখে যান। তাদের সাথে হাস্সানও ছিলেন। এই মহিলাদের মধ্যে রাসূলুল্লাহর (সা) ফুফু সাফিয়্যা বিনত ‘আবদিল মুত্তলিবও ছিলেন। একদিন এক উহুদীকে তিনি কিল্লার চতুর্দিকে গুর ঘুর করতে দেখলেন। তিনি প্রমাদ গুণলেন যদি সে মহিলাদের অবস্থান জেনে যায় তাহলে ভীষণ বিপদ আসতে পারে। কারণ রাসূল (সা) তাঁর বাহিনী নিয়ে তখন প্রত্যক্ষ জিহাদে লিপ্ত। তিনি হাস্সানকে বললেন, এই ইহুদীকে হত্যা কর। তা না হলে সে আমাদের অবস্থানের কথা ইহুদীদেরকে জানিয়ে দেবে। হাস্সান বললেন, আপনার জানা আছে আমার নিকট এর কোন প্রতিকার নেই। আমার মধ্যে যদি সেই সাহসই থাকতো তাহলে আমি রাসূলুল্লাহর (সা) সাথেই থাকতাম। সাফিয়্যা তখন জিনেই তাঁবুর একটি খুঁটি হাতে নিয়ে ইহুদীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে হত্যা করেন। তারপর হাস্সানকে বলেন, যাও, এবার তার সঙ্গের জিনিসগুলি নিয়ে এসো। যেহেতু আমি নারী, আর সে পুরুষ, তাই একাজটি আমার দ্বারা হবে না। এ কাজটি তোমাকে করতে হবে। হাস্সান বললেন, ঐ জিনিসের প্রয়োজন নেই।

দ্বিতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar