হাস্সান ইবন সাবিত (রা)।। ২য় অংশ

তৃতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে। সাফিয়্যা লোকটিকে সহ্যার পর মাথাটি কেটে এসে হাস্সাকে বলেন, ধর, এটা দূর্গের নীচে ইহুদীদের মধ্যে ফেলে এসো। তিনি বললেন: এ আমার কাজ নয়। অতঃপর সাফিয়্যা নিজেই মাথাটি ইহুদীদের মধ্যে ছুড়ে মারেন। ভয়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।২৭

হাস্সান (রা) সশরীরে না হরেও জিহবা দিয়ে রাসূলে কারীমের সাথে জিহাদ করেছেন। বনু নাদীরের যুদ্ধে রাসূল (সা) যখন তাদেরকে অবরুদ্ধ করেন এবং তাদের গাছপালা জ্বালিয়ে দেন তখন তার সমর্থনে হাস্সান কবিতা রচনা করেন। বনু নদীর ও মক্কার কুরাইশদের মধ্রে দ্বিপাক্ষিক সাহায্য ও সহযোগিতা চুক্তি ছিল। তাই তিনি কবিতায় কুরাইশদের নিন্দা করে বলেন, মুসলমানরা বুন নাদীরের াবগ-বাগিচা জ্বালিয়ে ছিল, তোমরা তাদের  কোন উপকারে আসনি। এ কবিতা মক্কায় পৌঁছালে কুরাইশ কবি আবু সুফইয়ান ইবনুল হারিস বলেন: আল্লাহ সর্বদা তোমাদের এমন কর্মশক্তি দান করুন, যাতে আশে-পাশের আগুনে খোদ মদীনা পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আর আমরা দূরে বসে তামাশা দেখবো।২৮

হিজরী পঞ্চম সনে ‘আল-মুরাইসী’ যুদ্ধ থেকে মদীনায় ফেরার সময় একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। সুযোগ সন্ধ্যানী মুনাফিকরা তিলকে তাল করে ফেলে। তারা আয়িশার (রা) পূতঃপবিত্র চরিত্রের ওপর অপবাদ দেয়। মুনফিক নেতা আবদুল্লাহ ইবন উবাই ছিল এ ব্যাপারে সকলের অগ্রগামী। কতিপয় প্রকৃত মুসলমানও তাদের এ ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকে পড়েন। যেমন হাস্সান, মিসতাহ ইবন উসাসা, হামনা বিন্ত জাহাশ প্রমুখ। যখন আয়িশার (রা) পবিত্রতা ঘোষণা করে আল কুরআনের আয়াত নাযিল হয় তখন রাসূল (সা) অপবাদ দানকারীদের ওপর কুরআনের নির্ধারিত ‘হদ’ (শাস্তি) আশি দুররা জারি করেন। ইমাম যুহরী থেকে সাহীহাইনে একথা বর্ণিত হয়েছে।২৯ অবশ্য ানেকে ‘হদ’ জারি বিষযটি অস্বীকার করেছেন।৩০

অনেকে অবশ্য হাস্সানের জীবন, কর্মকাণ্ড এবং তাঁর কবিতা বিশ্লেষণ করে এ মত পোষণ করেছেন যে, কোনভাবেই তিনি ইফ্ক’ বা অপবাদের ঘটনায় জড়িত ছিলেন না। যেহেতু তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) পাশে দাঁড়িয়ে মক্কার পৌত্তলিক কুরাইশদের আভিজাত্যের মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছিলেন এবং আরববাসীর নিকট তাদের হঠকারিতার স্বরূপ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিরেন, একারণে পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণকারী কুরাইশরা নানাভাবে তাঁকে নাজেহাল করেছেন। তাঁরা মনে করেন, ইফ্ক’-এর ঘটনায় হাস্সানের নামটি জড়ানোর ব্যাপারে যারা বিশেষ ভূমিকা পালন করেন, তাদের পুরোধা সাফওয়ান ইবন মু’য়াত্তাল। হাস্সান আয়িশার (রা) শানে অনেক অনুপম কবিতা রচনা করেছেন। একটি চরণে তিনি ইফক’-এর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ান্য একডিট চরণে যারা তাঁর নামটি জড়ানোর ব্যাপারে ভূমিকা পালন করেছেন, সেই সব কুরাইশ মুহাজিরদের কঠোর সমালোচনা করেছেন।৩১

‘ইফ্ক’-এর ঘটনায় তাঁর জড়িয়ে পড়ার যত বর্ণনা পাওয়া যায়, সীরাত বিশেষজ্ঞরা সেগুলিকে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন। একারণে পরবর্তীকালে বহু সাহাবী ও তাবে’ঊ তাঁকে ভালো চোখে দেখেননি। অনেকে ত৭াকে নিন্দা-মন্দ করেছেন। তবে খোদ আয়িশা (রা) ও রাসূল (সা) ত৭াকে ক্ষমা করেছিলেন। একথা বহু বর্ণনায় জানা যায়। আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে। হাস্সানকে মুমিনরাই ভালোবাসে এবং মুনফিকরাই ঘৃণা করে। তিনি আরো বলেছেন: হাস্সান হচ্ছে মুমিন ও মুনাফিকদের মধ্যে প্রতিবন্ধক।৩২ কেউ আয়িশার (রা) সামনে হাস্সানকে (রা) খারাপ কিছু বললে তিনি নিষেধ করতেন।

হাস্সান (রা) শেষ জীবনে অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর একবার আয়িশার (রা) গৃহে আসেন। তিনি যদি বিছিয়ে হাস্সানকে (রা) বসতে দেন। এমন সময় আয়িশার (রা) ভাই আবদুর রহমান (রা) উপস্থিত হন। তিনি বোনকে লক্ষ্য করে বলেনঃ আপনি তাঁকে পদির ওপর বিসয়েছেন? তিনি কি আপনার চরিত্র নিয়ে এসব কথা বলেননি? আয়িশা (রা) বললেনঃ তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে কাফিরদের জবাব দিতেন শক্রুদের জবাব দিয়ে রাসূলুল্লাহর (সা) অন্তরে শান্তি দিতেন। এখন তিনি ান্ধ হয়েছেন। আমি আশা করি, আল্লা আখিরাতে তাঁকে শাস্তি দেবেন না।৩৩

প্রখ্যাত তাবে’ঈ মাসরূক বলেন: একবার আমরা আয়িশার (রা) কাছে গিয়ে দেখলাম হাস্সান সেখানে বসে বসে আয়িশার (রা) প্রশংসায় রচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাচ্ছেন। তার মধ্যে এই পংক্তিটিও ছিল:

‘সাহ্সানুল রাযাবুন মা তুযান্ন বিরীবাতিন’-অর্থাৎ তিনি পূতঃপবিত্র, শক্ত আত্মাসম্মানবোধ সম্পন্ন ভদ্রমহিলা, তাঁর আচরণে কোন প্রকার সন্দেহের অবকাশ নেই। পরনিন্দা থেকে মুক্ত অবস্থায় তাঁর দিনের সূচনা হয়।

পংক্তিটি শোনার পর আয়িশা (রা) মন্তব্য করলেন: কিন্তু আপনি তেমন নন।’ আশিয়াকে (রা) বললাম: আপনি তাকে এখানে আসার অনুমতি দেন কেন? আল্লরাহ তা’য়ালা তো ঘোষণা করেছেন, ইফ্ক-এ যে অগ্রহণী ভুমিকা রেখেছে, তার জন্য রয়েছে বিরাট শাস্তি। (সূরা: আন-নূর-১১) ‘আয়িশা (রা) বললেন: তিনি ান্ধ হয়ে গেছেন। তাঁর কাজের শাস্তি তো তিনি লাভ করেছেন। অন্ধত্বের চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে? তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে কুরাইশদের প্রতিরোধ করেছেন এবং তাদের কঠোর নিন্দা করেছেন।৩৪

‘উরওয়া বলেন: একবার আমি ফুরাই’য়ার ছেলে হাস্সানকে আয়িশার (রা) সামনে গালি দিই। আয়িশা (রা) বললেনঃ ভাতিজা, তুমি কি এমন কাজ থেকে বিরত হবে না? তাঁকে গ্যালি দিওনা। কারণ, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষ থেকে কুরাইশদের জবাব দিতেন।৩৫

একবার কতিপয় মহিলা আয়িশার (রা) উপসিথতিতে হাস্সানকে নিন্দমন্দ করে। আয়িশা (রা) তাদেরকে বললেন: তোমরা তাঁকে নিন্দামন্দ করোনা। আল্লাহ তা’য়ালা যে তাদেরকে কঠিন শাস্তি দানের অঙ্গিকার করেছেন, তিনি তা পেয়ে গেছেন। তিনি অন্ধ হয়ে গেছেন। আমি আশা করি তিনি কুরাইশ কবি আবু সুফইয়ান ইবনুল হারিসের কবিতার জবাবে রাসূলুল্লাহর (সা) প্রশংসায় যে কবিতা রচনা করেছেন তার বিনিময়ে আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করবেন। একথা বলে তিনি হাস্সানের হাজাওতা মুহাম্মাদান ফা আজাবতু আনহু’ কবিতাটির কয়েকটি লাইন পাঠ করেন।৩৬

উল্লেখখিত বর্ণনাসমূহ দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রা) কবি হাস্সানকে ক্ষমা করেছিলেন। এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আয়িশার (রা) সাথে তাঁর সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল।

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর হাস্সান (রা) দীর্ঘদিন জীবিত ছিলেন। ত৭ার মৃত্যু সময় নিয়ে যথেষ্ট মতপার্থক্য আছে। আবন ইসহাকের মতে িিতনি হিজরী ৫৪ সনে মারা যান। আল হায়সাম ইবন আদী বলেন: হিজরী ৪০ সনে মারা যান। ইমাম জাহাবী বলেন: তিনি জাবালা ইবন আল-আয়হাম ও আমীর মু’য়াবিয়ার দরবারে গিয়েছেন। তাই কইবন সা’দ বলেছেন: মু’য়াবিয়ার খিলাফতকালে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে, তিনি হিজরী ৫৪/খ্রীঃ ৬৭৪ সনে ১২০ বছর বয়সে মারা যান।৩৭

আবু’ উবায়েদ আল-কাসেম ইবন সাল্লাম বলেন: হিজরী ৫৪ সনে হাকীম ইবন হিযাম’ আবু ইয়াযীদ হুয়াইতিব ইবন আবদিল উয্যা, সা’ঈদ ইবন ইয়ারবু আল মাখযুমী ও হাস্সান ইবন সাবিত আল-আনসারী মৃত্যুবরণ করেন। এঁদের প্রত্যেকে ১২০ বছর জীবন লাভ করেছিলেন।

তৃতীয় অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar