হাস্সান ইবন সাবিত (রা)।। ৩য় অংশ

চতুর্থ অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

হাস্সানের (রা) স্ত্রীর নাম ছিল সীরীন। তিনি একজন মিসরীয় কিবতী মহিলা। আল-বায়হাকী বর্ণনা করেছেন। রাসূলে কারীম (সা) সাহাবী হযরত হাতিব ইবন বালতা’য়াকে (রা) ইস্কান্দারিয়ার শাসক ‘মাকুকাস’-এর নিকট দূত হিসেবে পাঠান। মাকুকাস রাসূলুল্লাহর (সা) দূতকে যথেষ্ট সমাদর করেন। ফেরার সময় তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) জন্য কিছু উপহার পাঠান। এই উপহার সামগ্রীর মধ্যে তিনটি কিবতী দাসীও ছিল। রাসূলুল্লাহর (সা) ছেলে ইবরাহীমের মা মারিয়্যা আল কিবতিয়্যা (রা) এই দাসী ক্রয়ের একজন। অন্য দুইজন দাসীর মধ্যে রাসূল (সা) হাস্সান ইবন সাবিত ও মুহাম্মদ ইবন কায়স আল-আবদীকে একটি করে দান করেন। হাস্সানকে প্রদত্ত দাসীটি ছিলেন উম্মুল মুমিনীন মারিয়্যা আল-কিবতিয়্যার বোন। নাম ছিল সীরীন। তাঁরই গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন হাস্সানের (রা) ছেলে আবদুর রহমান। এই আবদুর রহমান এবং রাসূলুল্লাহর (সা) ছেলে ইবরাহীম ছিলেন পরস্পর খালাতো ভাই।৩৯

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ফারে’ পর্বতের দূর্গ ছিল হাস্সানের (রা) পৈতৃক বাসস্থান। আবু তালহা (রা) যখন বীরহা’ উদ্যান ত৭ার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে সাদাকা হিসেবে বণ্টন করে দেন তখন সেখান থেকে একটি অংশ লাভ করেন। এরপর তিনি এখানে বাসস্থান নির্মাণ করেন। স্থানটি আল-বাকী’র নিকটবর্তী। পরে আমীর মু’য়াবিয়া (রা) তাঁর নিকট থেকে সিটি খরীদ করে সেখানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেন। যা পরে কাসরে বনী হুদায়লা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। কারো কারো ধারণা যে, রাসূল (সা) এ ভূমি তাঁকে দান করেন। কিন্তু তা সঠিক নয়। উপরে উল্লেখিত আমাদের বক্তব্য সাহীহ বুখারীর বর্ণনা দ্বারা সমর্থিত।

হাস্সানের (রা) মাথার সামনের দিকে এক গোছা লম্বা চুল ছিল। তিনি তা দুই চোখের মাঝখানে সব সময় ছেড়ে রাখতেন। ভীষণ বাক্পটু ছিলেন। এ কারণে বলা হতো, তিনি ত৭ার জিহবার আগা নাকের আগায় ছোঁয়াতে পারতেন। তিনি বলতেন, আরবের কোন মিষ্টভাষীই আমাকে তুষ্ট করতে পারে না। আমি যদি আমার জিহ্বার আগা কারো মাথার চুলের ওপর রাখি তাহলে সে মাথা ন্যাড়া হয়ে যাবে। আর যদি কোন পাথরের ওপর রাখি তাহলে তা বিদীর্ণ হয়ে যাবে।৪০

হাস্সান (রা) রাসূলুল্লাহর (সা) কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর তাঁর থেকে যাঁরা হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে বিশেষ উল্লেষযোগ্য হলেনঃ আল-বারা’ ইবন আযিব, সা’ঈদ ইবন মুসাঢ্যিব, আবূ সালামা ইবন আবদির রহমান, উওওয়া ইবন খুরাইর আবুল সাহান মাওলা নবী নাওফাল, খারিজা ইবন যায়িদ ইবন সাবিত, ইয়াহইয়া ইবন আবদির রহমান ইবন হাতিব আয়িশা আবু হুরাইরা, সুলায়মান ইবন ইয়াসার আবদুর রহমান ইবন হাসসান প্রমুখ।৪১ ইবন সা’দ হাস্সানকে (রা) দ্বিতীয় তাবকায় (স্তর) উল্লেখ করেছেন।৪২

রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর প্রথম দুই খলীফা আবূ বকর ও উমারের (রা) খিলাফতকালে হাস্সানের (রা) কোন রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায় না। উসমানের (রা) খিলাফতের সময় ত৭র মধ্যে রআবার আসাবিয়্যাতের (অন্ধ পক্ষপাতিত্ব) কিচু লক্ষণ দেখা যায়। তিনি খলীফা উসমানের (রা) পক্ষ নিয়ে বনু উমাইয়্যাকে আলীর (রা) বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চেষ্টা করেন। খলীফা উসমান (রা) বিদ্রোহীদের হাতে শাহাদাত বরণ করলে তিনি বনু হাশিম, বিশেষতঃ আলীকে (রা) ইঙ্গিত করে কিছু কবিতা রচনা করেছেন।৪৩

হাস্সানের (র) জীবনে কবিত্ব একটি স্বতন্ত্র শিরোনাম। কাব্য প্রতিভা সর্বকালে সকল জাতি-গোষ্ঠীর নিকট সমাদৃত। বিশেষ করে প্রাক-ইসলামী আরবে এ গুণটির আবার সবচেয়ে বেশী কদর ছিল। কবিতা চর্চা ছিল সেকালের আরববাসীর এক বিশেষ রুচি। তৎকালীন আরবে কিছু গোত্র ছিল কবির খনি বা উৎস খ্যাত। উদাহরণ স্বরূপ কায়স, রাবী’য়া, তামীম, মুদার, য়ামন প্রমুখ গোত্রের নাম করা যায়। এ সকল গোত্রে অসংখ্য আরবী কবির জন্ম হয়েছে। মদীনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয় ছির শেষোক্ত য়ামন গোত্রের অন্তর্ভূক্ত। হাস্সানের (রা) পৈত্রিক বংশধারা উপরের দিকে এদের সাথে মিলিত হয়েছে।

উপরে উল্লেখিত গোত্রসমূহের মধ্যে আবার কিচু খান্দানে কবিত্ব বংশানুক্রমে চলে আসছিল। হাস্সানের (রা) খান্দানটি ছির তেমনই। উপরের দিকে তাঁর পিতামহ ও পিতা, নীচের দিকে তাঁর পুত্র আবদুর রহমান, পৌত্র সা’ঈদ ইবন আবদির রহমান এবং তিনি নিজে সকলেই ছিরেন ত৭াদের সমকালে একেকজন শ্রেষ্ঠ কবি।৪৪ হাস্সানের (রা) এক মেয়েও একজন বড় মাপের কবি ছিলেন। হাস্সান (রা) তাঁর বার্দ্ধক্যে এক রাতের কবিতা রচনা করতে বসেছেন।  কয়েকটি শ্লোক রচনার পর আর ছন্দ মিলাতে পারছেন না। তাঁর অবস্থা বুঝতে পেরে মেয়ে বললেন: বাবা, মনে মনে হচ্ছে আপনি আর পাররছন না। বললেন: ঠিকই বলেছো। মেয়ে বললেন: আমি কি কিচু শ্লোক মিলিয়ে দেব? বললেন: পারবে? মেয়ে বললেন: হাঁ, তা পারবো। তখন বৃদ্ধ একটি শ্লোক বললেন, আর তার সাথে মিল রেখে একই ছন্দে মেয়েও একটি শ্লোক রচনা করলেন। তখন হাস্সান বললেন: তুমি যতদিনজীবিত আছ আমি আর একটি শ্লোক ও রচনা করবো না। মেয়ে বললেন: তা হয় না; বরং আমি আর আপনার জীবদ্দশায় কোন কবিতা রচনা করবো না।৪৫

প্রাক-ইসলামী ‘আমলের অগণিত আরব কবির অনেকে ছিলেন’ আসহাবে মুজাহ্হাবাত’ নামে খ্যাত। মুজাহ্হাবাত’ শব্দটি জাহাব’ থেকে নির্গত। ‘জাহাব’ অর্থ স্বর্ণ। যেহেুত এ সকল কবিদের কিছু অনুপম কবিতা স্বর্নের পানি দ্বারা লিখিত হয়েছিল, এজন্য সেই কবিতাগুলিকে ‘মুজাহ্হাবাত’ বলা হতো। আর ‘আসহাব’ শব্দটি ‘সাহেব’ শব্দের বহুবচন। যার অর্থ ‘অধিকারী, মালিক।’ সুতরাং’ আসহাবে মুজাহ্হাবাত’ অর্থ স্বর্ণ দ্বারা লিখিত কবিতা সমূহের অধিকারী বা রচয়িতাগণ। পরবর্তীকালে প্রত্যেক কবির সর্বোত্তম কবিতাটিকে মুজাহ্হাব’ বলা হতে াকে। হাস্সানের (রা) ‘মুজাহ্হাবার’ প্রম পংক্তি নিম্নরূপ:৪৬

আরবী হবে

(লা’আমরু আবীকাল খায়রু হাক্কান লিমা বিনা…………..)

আরবী কবিদের চারটি তাবকা বা স্তর। ১. জাহিলী বা প্রাক-ইসলামী কালের কবি, ২.মুখাদরাম-যে সকল কবি জাহিলী ও ইসলামী উভয় কাল পেয়েছেন, ৩. ইসলামী-যারা ইসলামের অভ্যূদয়ের পর জন্মগ্রহণ করেন এবং কবি হয়েছেন, ৪. মুহদাস-আব্বাসী বা পরবর্তীকালের কবি। এ দিক দিয়ে হযরত হাস্সান দ্বিতীয় স্তরের কবি। তিনি জাহিলী ও ইসলাম-উভয়কালেই পেয়েছেন।৪৭

কাব্য প্রতিভায় হাস্সান (রা) ছিলেন জাহিলী আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ইমাম আল-আসমা’ঈ বলেন: হাস্সানের জাহিলী আমলের কবিতা শ্রেষ্ঠ কবিতাসমূহের অন্তর্গত।৪৮

হাস্সানের (রা) কাব্য জীবনের দুইট অধ্যায়। একটি জাহিলী ও অন্যটি ইসলামী! যদিও দুইটি ভিন্নধর্মী অধ্যায়, তথাপি একটি অপরটি থেকে কোন অংশে কম নয়। জাহিলী জীবনে তিনি গাস্সান ও হীরার রাজন্যবর্গের স্তুতি ও প্রশংসাগীতি রচনার জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। ইসলামী জীবনে তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেন রাসূলুল্লাহর (সা) প্রশংসা, তাঁর পক্ষে প্রতিরোধ ও কুরাইশদের নিন্দার জন্য। তিনি সমকালীন শহরে কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি বলে স্বীকৃত। বিদ্রপাত্মাক কবিতা রচনায় অতি দক্ষ। আবু উবায়দাহ্ বলেন: অন্য কবিদের ওপর হাস্সানের মর্যাদা তিনটি  কারণে। জাহিলী আমলে তিনি আনসারদের কবি, রাসূলুল্লাহর (সা) নুবুওয়াতের সময়কালে ‘শা’য়িরুর রাসূল’ এবং ইসলামী আমলে গোটা য়ামনের কবি।৪৯

জাহিলী আরবে উকাজ মেলায় প্রতি বছর সাহিত্য-সংস্কৃতির উৎসব ও প্রতিযোগিতা হতো। এ প্রতিযোগিতায় হাস্সানও অংশগ্রহণ করতেন। একবার তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি আন-নাবিগা আয্-যুবইয়ানী (মৃতঃ ৬০৪ খ্রীঃ) ছিলেন এ মেলার কাব্য বিচারক। কবি হাস্সান ছিলেন একজন প্রতিযোগী। বিচারক আন-নাবিগা, আল-শা’শাকে হাস্সানের তুলনায় শ্রেষ্ঠ কবি বলে রায় দিলে হাস্সান তার প্রতিবাদ করেন এবং নিজেকে শ্রেষ্ঠ কবি বলে দাবী করেন।৫০

আবুল ফারাজ আল-ইসফাহানী বলেন: আল-আ’শা আবু বাসীর প্রথমে কবিতা পাঠ করেন। তারপর পাঠ করেন হাস্সান ও অন্যন্যা কবিরা। সর্বশেষে তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ মহিলা কবি আল-খান্সা বিনত’ আমর তাঁর কবিতা পাঠ করেন। তাঁর পাঠ শেষ হলে বিচারক আন-নাবিগা বলেন: আল্লাহর কসম! একটু আগে পঠিত আবু বাসীর আল-আ’শার কবিতাটি যদি আমি না শুনতাম তাহলে অবশ্যই বলতাম, তুমি জিন ও মানব জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর এ রায় শোনার সাথে সাথে হাস্সান উঠে দাঁড়ান এবং বলেন: আল্লাহর কসম! আমি আপনার পিতা ও আপনার চেয়ে বড় কবি। আন-নাবিগা তখন নিজের দুইটি চরণ আবৃত্তি করে বলেনঃ ভাতিজা! তুমি এ চরণ দুইটির চেয়ে সুন্দর কোন চরণ বলতে পারবে কি? তখন হাস্সান তাঁর কথার জন্য লজ্জিত হন।৫১ অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, আন-নাবিগার কথার জবাবে হাস্সান তাঁরÑ

আরবী হবে

(লানা আল-জাফানাতুল গুররু ইয়াল মা’না বিদদুজা) পংক্তি দুইটি আবৃত্তি করেন। আন-বাবিগা তখন পংক্তি দুইটির কঠোর সমালোচনা করে হাস্সানের দাবী প্রত্যাখ্যান করেন।

চতুর্থ অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar