হাস্সান ইবন সাবিত (রা)।। ৫ম অংশ

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

২. চমৎকার প্রতীকের ব্যবহার: আরবী অলঙ্কার শাস্ত্রে ‘তাতবী’ বা ‘তাজাওয়ায’ নামে এক প্রকার প্রতীকের নাম দেখা যায়। তার অর্থ হলো, কবি কোন বিষয়ের আরোচনা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু অকম্মাৎ অতি সচেতনভাবে তা ছেড়ে দিয়ে এমন এক বিসয়ের বর্ণনা কনে যাতেতাঁর পূর্বের বিষয়টি আরো পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। হাস্সানের কবিতায় এ জাতীয় প্রতীক বা ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

আরবে অসংখ্য গোত্র দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমির মধ্যে বসবাস করতো। তারা ছিল যাযাবর। সেখানে পানি ও পশুর চারণভূমি পাওয়া যেত সেখানেই তাঁবু গেড়ে অবস্থায়ী বাসস্থান পড়ে তুরতো। পানি ও পশুর খাদ্য শেষ হলে নতুন কোন কোন স্থানের দিকে যাত্রা করতো। এভাবে তারা এক স্থান থেকে ান্য স্থানে ঘুরে বেড়াতো। আরব কবিরা তাদের কাব্যে এ জীবনকে নানভাবে ধরে রেখেছেন। তবে হাস্সান বিষয়টি যেভাবে বর্ণনা করেছে তাতে বেশ অভিনবত্ব আছে। তিনি বলছেন : ‘জাফ্নার সন্তানরা তাদের পিতা ইবন মারিয়্যার কবরের পাশেই থাকে, তিনি খুবই উদার ও দানশীল।’

প্রশংসিত ব্যক্তি যেহেতু আরব বংশোদ্ভুত। এ কারণে তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গি করে বলে দিলেন, এঁরা আরব হলেও যাযবর নন, বরং রাজন্যবর্গ। কোন রকম ভীতি ও শঙ্কা ছাড়াই তাঁরা তাঁদের পিতার কবরের আশে-পাশেই বসবাস করেন। তাঁদের বাস্থান সবুজ-শ্যামল। একারণে তাঁদের স্থান থেকে স্থানান্তরে ছুটে বেড়ানোর প্রয়োজন পড়েনা।

৩. রূপকের অভিনবত্ব: আরব কবিরা কিছু কথা রূপক অর্থে এবং পরোক্ষে বর্ণনা করতেন। যেমন: যদি উদ্দেশ্যে হয় একথা বলা যে, অমুক ব্যক্তি অতি মর্যাদাবান ও দানশীল, তাহলে তাঁরা বলতেন, এই গুণগুলি তার পরিচ্ছেদের মধ্যেই আছে। হাস্সানের (রা) কবিতায় রূপকের অভিনবত্ব দেখা যায়। যেমন একটি শ্লোকে তিনি চলতে চান, আমরা খুবই কুলিন ও সন্তুন্তু। কিন্তু কথাটি তিনি বলেছেন এভাবে: ‘সম্মান ও মর্যদা আমাদের আঙ্গিনায় ঘর বেঁধেছে এবং তার খুঁটি এত মজবুত করে গেঁড়েছে যে, মানুষ তা নাড়াতে চাইলেও নাড়াতে পারে না।’ এই শ্লোকে সম্মান ও মর্যদার ঘর বাঁঢ়া, সুদৃঢ় পিলার স্থাপন করা এবং তা টলাতে মানুষের অক্ষম হওয়া এ সবই আরবী কাব্যে নতুন বর্ণনারীতি।

৪. ছন্দ, অন্তমিল ও স্বর সাদৃশ্যের আশ্চর্য রকমের এই সৌন্দর্য তাঁর কবিতায় দেখা যায়। শব্দের গাঁখুনি ও বাক্যের গঠন খুবই শক্ত, গতিশীল ও সাবলীল। প্রথম শ্লোকের প্রথম অংশের শেষ পদের শেষ বর্ণটি তাঁর বহু কাসীদার প্রতিটি শ্লোকের শেষ পদের শেষ বর্ণ দেখা যায়। আরবী ছন্দ শাস্ত্রে যাকে কাফিয়া’ বলা হয়। আরবী বাক্যের এ ধরনের শিল্পকারিতা এর আগে কেবল ইমরুল কায়সের কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। তবে তাঁর পরে বহু আরব কবি নানা রকম শিল্পকারিতার সফল পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। আব্বাসী আমলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক কবি আবুল আলা আল-মা’য়াররীর একটি বিখ্যাত কাব্যের নাম নুযুমু মালা ইয়ালযাযু’। কবিতা রচনায় এমন কিছু বিষয় তিনি অপরিহার্যরূপে অনুসরণ করেছেন, যা আদৌ কবিতার জন্য প্রয়োজন নয়। তাঁর এ কাব্যগ্রন্থটি এ ধররেন কবিতার সমষ্টি। এটা তাঁর একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ।

৫. হাস্সানের কবিতার আর একটি বৈশিষ্ট হলো, তিনি প্রায়ই এমন সব শব্দ প্রয়োগ করেছেন যা ব্যাপক অর্থবোধক। তিনি হয়তো একটি ভাব স্পষ্ট করতে চেয়েছেন এবং সেজন্য এমন একটি শব্দ প্রয়োগ করেছেন যাতে উদ্দিষ্ট বিষয়সহ আরো অনেক বিষয় সুন্দরভাবে এসে গেছে।৬৮

৬. অতিরঞ্জন ও অতিকথন: হাস্সানের ইসলামী কবিতা যাবতীয় অতিরঞ্জন ও অতিকথন থেকে মুক্ত বলা চলে। একথা সত্য যে কল্পনা ও অতিরঞ্জন ছাড়া কবিতা হয় না। তিনি নিজেই বলতেন, মিথ্যা বলতে ইসলাম নিষেধ করেছে। এ কারণে অতিরঞ্জন ও অতিকথন, যা মূলতঃ মিথ্যারই নামান্তরÑআমি একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি।৬৯

শুধু তাই নয়, তাঁর জাহিলী আমলে লেখা কবিতায়ও এ উপাদান খুব কম ছিল। আর এ কারণে তৎকারীন আরবের শ্রেষ্ঠ কবি আন-নাবিগা কবি হাস্সানের একটি শ্লোকের অবমূল্যায়ন করলে দুই জনের মধ্যে ঝগড়া হয়।৭০

হাস্সানের ইসলামী কবিতার মূল বিষয় ছিল কাফিরদের প্রতিরোধ ও নিন্দা করা। কাফিরদের হিজা ও নিন্দা করে তিনি বহু কবিতা রচনা করেছেন। তবে তাঁর সেই কবিতাকে অশ্ললতা স্পর্শ করতে পারেনি। তৎকারীন আরব কবিরা ‘হিজা’ বলতে নিজ গোত্রের প্রশংসা এবং বিরোধী গোত্রের বিন্দা বুঝাতো। এই নিন্দা হতো খুবই তীর্যক ও আক্রমণাত্মক। এ কারণে কবিরা তাদের কবিতায় সঠিক ঘটনাবলী প্রাসঙ্গিক ও মনোরম ভঙ্গিক তুলে ধরতো।জাহিলী কবি যুহাইর ইবন আবী-সুলমার জিহা’ বা নিন্দার একটি স্টাইল আমরা তার দুইটি শ্লোকে লক্ষ্য করি। তিনি ‘হিস্ন’ গোত্রের নিন্দায় বলেছেন:৭১

‘আমি জানিনে। তবে মনে হয় খুব শিগ্গী জেনে যাব। ‘হিস্ন’ গোত্রের লোকেরা পুরুষ না নারী? যদি পর্দানশীল নারী হয় তাহলে তাদের প্রত্যেকে কুমারীর প্রাপ্য হচ্ছে উপহার।’

যুহাইরের এ শ্লোকটি ছিল আরবী কবিতার সবচেয়ে কঠোর নিন্দাসূচক। এ কারণে শ্লোকটি উক্ত গোত্রের লোকদের দারুণ পীড়া দিয়েছিল। হাস্সানের নিন্দাবাদের মধ্যে শুধু গালিই থাকতো না, তাতে থাকতো প্রতিরোধ ও প্রতিউত্তর। তাঁর ষ্টাইলটি ছিল অতি চমৎকার। কুরাইশদের নিন্দায় রচিত তাঁর একটি কবিতার শেষের শ্লোকটি সেকালে এতখানি জনপ্রিয়তা পায় যে তা প্রবাদে পরিণত হয়। শ্লোকটি নিম্নরূপ:

‘আমি জানি যে তোমার আত্মীয়তা কুরাইশদের সংগে আছে। তবে তা এ রকম যেমন উট শাবকের সাথে উট পাখীর ছানার সাদৃশ্য হয়ে থাকে।’৭২

পরবর্তীকালে কবি ইবনুল মুফারিরগ উল্লেখিত শ্লোকটির ১ম পংক্তিটি আমীর মুয়াবিয়ার (রা) নিন্দায় প্রয়োগ করেছেন।৭৩ আল-হারেস ইবন’ আউফ আল-মুররীর গোত্রের বসতি এলাকায় রাসূলুল্লাহ (সা) প্রেরিত একজন মুবাল্লিগ নিহত হলে কবি হাস্সান তার নিন্দায় একটি কবিতা রচনা করেন। তিনি বলেন:

‘যদি তোমরা প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করে থাক তাহলে তা এমন কিছু নয়। কারণ, প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ করা তোমাদের স্বভাব। আর প্রতিশ্র“তি ভঙ্গের মূল থেকেই প্রতিশ্র“তি ভঙ্গ অঙ্কুরিত হয়।’

হাস্সানের এই বিদ্রুপাত্মক কবিতা শুনে আল-হারেসের দুই চোখে অশ্র“র প্লাবন নেমেয় আসে। সে রাসূলুল্লাহ (সা) দরবারে ছুটে এসে আশ্রয় প্রার্শনা করে এবং হাস্সানকে বিরত রাখার আবেদন জানায়।৭৪

হাস্সান (রা) চমৎকার মাদাহ বা প্রশংসা গীতি রচনা করেছেন। আলে ইনানের প্রশংসায় তিনি যে সকল কবিতা রচনা করেছেন তার দুইটি শ্লোকে এ রকম:

‘যারা তাদের নিকট যায় তাদেরকে তারা ‘বারদী’ নদীর পানি স্বচ্ছ শরাবের সাথে মিথিয়ে পান করায়।’

এই শ্লোকটিরই কাছাকাছি একটি শ্লোকে রচনা করেছেন কবি ইবন কায়স মুস’য়াব ইবন যুবাইরের প্রশংসায়। কিন্তু যে বিষয়টি হাস্সানের শ্লোকে ব্যক্ত হয়েছে তা ইবন কায়সের শ্লোকে অনুপস্থিত।৭৫

অন্য একটি শ্লোকে তিনি গাসসানীয় রাজন্যবর্গের দানশীলতা ও অতিথিপরায়ণতার একটি সুন্দর চিত্র এঁকেছেন চমৎকার ষ্টাইলে। ‘তাঁদের গৃহে সব সময় াতিথিদের এত ভিড় থাকে যে তাঁদের কুকুরগুলিও তা দেখতে অভ্যন্ত হয়ে গেছে। এখন আর তারা নতুন আগন্তুককে দেখে ঘেউ ঘেউ করে না।’

আরবী কাব্য জগতের বিখ্যাত তিন কবির তিনটি শ্লোক প্রশংসা বা মাদাহ কবিতা হিসেবে সর্বোত্তম। এ ব্যাপারে প্রায় সকলে একমত। তবে এ তিনটির মধ্যে সবচেয়ে ভালো কোনটি সে ব্যাপারে মতপার্থক্য আছে। কবি হুতাইয়্যা হাস্সানের এ শ্লোকটিকে শ্রেষ্ঠ মনে করেছেন। কিন্তু অন্যারা আবুত ত্বিহান ও নাবিগার শ্লোক দুইটিকে সর্বোত্তম বলেছেন।৭৬ ইমাইয়্যা খলীফা আবদুল মালিক ছিলেন একজন বড় জ্ঞানী ও সাহিত্য রসিক মানুষ। তাঁর সিদ্ধান্ত হলো, ‘আরবরা যত প্রশংসাগীতি রচনা করেছে তার ম্েয সর্বোত্তম হলো হাস্সানের শ্লোকটি।’৭৭ তিনি রাসূলে কারীমের প্রশংসায় যে সকল কবিতা রচনা করেছেন তার ষ্টাইল ও শিল্পকারিতায় যথেষ্ট নতুনত্ব আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) প্রশংসায় রচিত একটি শ্লোকে তিনি বলেছেন ‘অন্ধকার রাতে রাসূলুল্লাহ (সা) পবত্র ললাট অন্ধকারে জ্বলন্ত প্রদীপের আলোর মত উজ্জ্বল দেখায়।’

হাস্সান (রা) জাহিলী ও ইসলামী জীবনে অনেক মারসিয়া বা শোকগাঁথা রচনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা) ইনতিকাল ছিল মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বড় শোক ও ব্যথা। হাস্সান রচতি কয়েকটি মারসিয়ায় সে শোক অতি চমৎকাররূপে বিধৃত হয়েছে। ইবন সা’দ তাঁর তাবাকাতে মারসিয়াগুলি সংকলন করেছেন।

হাস্সান ছিলেন একজন দীর্ঘজীবনের অধিকারী অভিজ্ঞ কবি। তাছাড়া একজন মহান সাহাবীও বটে। এ কারণে তাঁর কবিতায় পাওয়া প্রায় প্রচুর উপদেশ ও নীতিকথা। কবিতায় তিনি মানুষকে উন্নত নৈতিকতা অর্জন করতে বলেছেন। সম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ বিষয়ে দুইটি শ্লোক:

‘অর্থ-সমএদর বিনিময়ে আমি আমার মান-সম্মান রক্ষা করি। যে অর্থ-সম্মাদে সম্মান রক্ষা পয়না আল্লাহ তাতে সমৃদ্ধি দান না করুন!

সম্পদ চলে গেলে তা অর্জন করা যায়; কিন্তু সম্মানক্ষার বার অর্জন করা যায় না।’৭৯

মানুষের সব সময় একই রকম থাকা উচিত। প্রাচযর্যের অধিকারী হলে ধরাকে সরা জ্ঞান করা এবং প্রাচুর্য চলে গেলে ভেঙ্গে পড়া যে উচিত নয়, সে কথা বলেছেন একটি শ্লোকে:

‘অর্থ-সম্পদ আমার লজ্জা-শরম ও আত্মা-সম্মানবোধেকে ভুলিয়ে দিতে পারেনি। তেমনিভাবে বিপদ-মুসবিত আমার আরাম-আয়েশ বিঘিœত করতে পারেনি।’৮০

অত্যাচারের পরিণতি যে শুভ হয় না সে সম্পর্কে তাঁর একটি শ্লোক:

‘আমি কোন বিষয় সম্পর্কে অহেতুক প্রশ্ন ও অনুসন্ধান পরিহার করি। অধিকাংশ সময় গর্ত খননকারী সেই গর্তের মধ্যে পড়ে।’৮১

তিনি একটি শ্লোকে মন্দ কথা শুনে উপেক্ষা করার উপদেশ দিয়েছেন:

‘মন্ত খতা শুনে উপেক্ষা কর এবং তার সাথে এমন আচরণ কর যেন তুমি শুনতেই পাওনি।’৮২

লাঞ্ছিত ও অপমানিত অবস্থায় জীবন যাপন সম্পর্কে তিনি বলেন:

‘তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে তাদের চারণভূমি ান্যদের জন্য বৈধ করে দিয়েছি। তাই শক্ররা সেখানে অপকর্ম সম্পন্ন করেছে।

তোমরা কি মৃত্যু থেকে পালাচ্ছো? দুর্বলতার মৃত্যু তেমন সুন্দর নয়।’৮৩

‘আবদুল কাহির আল-জুরজানী বলেছেন, হাস্সানের রচিত কবিতার সকল পদের মধ্যে একটা সুদৃঢ় ঐক্য ও বন্ধন দেখা যায়। এমন কি সম্পূর্ণ বাক্যকে একটি শক্তিশালী রশি বলে মনে হয়।৮৪

একালের একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সমালোচক বুটরুস আল-বুসতানী বলেন: ‘হাস্সানের কবিতার বিশেষত্ব কেবল তাঁর মাদাহ ও হিজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার রয়েছে এক বড় ধরনে বিশেষত্ব। আর তা হচ্ছে তাঁর সময়ের  ঘটনাবলীর একজন বিশ্বস্ত ঐতিহাসিকের বিশেষত্ব। কারণ, তিনি বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা) জীবনের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও বিভিন্ন ঘটনাবল্ ীএ সকল যুদ্ধে মুসলিম ক্ষে যাঁরা শহীদ হয়েছে এবং বিরোধী পক্ষে যারা নিহত হয়েছে তাদের অনেকের নাম তিনিকবিতায় ধরে রেছেনে।। আমরা যখন ত৭ার কবিতা পাঠ করি তখন মনে হয়, ইসলামের প্রথম পর্বের ইতিহাস পাঠ করছি।”৮৫

প্রাচীন আরবের অধিবাসীরা দেহাতী ও শহুরেÑএই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। মক্কা, মদীনা ও তায়েপের অভিাসীরা ছিল শহরবাসী। অবশিষ্ট সকল অঞ্চলের অধিবাসীরা ছির দেহাতী বা গ্রাম্য। বেশীর ভাগ খ্যাতিমান কবি ছিলেন গ্রাম অঞ্চলের। এর মধ্যে মুষ্টিমেয় কিছু কবি শহরেও জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে হাস্সানের স্থান সর্বোচ্চ।৮৬

ইবন সাল্লাম আল-জামহী বলেন: ‘মদীনা, মক্কা, তায়িক, ইয়ামামাহ, বাহরাইনÑএর প্রত্যেক গ্রামে অনেক কবি ছিরেন। তবে মদীনার গ্রাম ছির কবিতার জন্য শীর্ষে। এখানকার শ্রেষ্ঠ কবি পাঁচজন। তিনজন খাযরাজ ও দুইজন আউস গোত্রের। খাযরাজের তিনজন হলেন: কায়স ইবনুল খুতাইম ও আবু কায়স ইবন আসলাত। এঁদের মধ্যে হাস্সান শ্রেষ্ঠ।৮৭ আবু ‘উবায়দাহ বলেন: ‘শহুরে কবিদের মধ্যে হাস্সান সর্বশ্রেষ্ঠ।৮৮ একথা আবু আমর ইবনুল আলাও বলেছেন। কবি আল-হুতাইয়্যা বলেন: তোমরা আনসারদের জানিয়ে দাও, তাদের কবিই আরবের শ্রেষ্ঠ কবি।’৮৯ আবুল ফরাজ আল-ইসফাহানী বলেন: হাস্সান শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন। খোদ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: ইমারাইল কায়স হচ্ছে দোযখী কবিদের পতাকাবাহী এবং হাস্সান ইবন সাবিত তাদের সকলকে জান্নাতের দিকে চালিত করবে।৯০

ইমাম আল-আসমা’ঈ বলেন: অকল্যাণ ও অপকর্মে কবিতা শক্তিশালী ও সাবলীল হয়। আর কল্যাণ ও সৎকর্মে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই যে হাস্সান, তিনি ছিলেন জাহিলী আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ইসরাম গ্রহণের পর তাঁর কবিতার মান নেমে যায়। তাঁর জাহিলী কবিতাই শ্রেষ্ঠ কবিতা।’৯১

হাস্সানের (রা) বার্দ্ধক্যে একবার তাঁকে বলা হলো, আপনার কবিতা শক্তিহীন হয়ে পড়েছে এবং তার পর বার্দ্ধক্যের ছাপ পড়েছে। বললেন: ভাতিজ্য! ইসলাম হচ্ছে মিথ্যার প্রতিবন্ধক। ইবনুল আসীর বলেন, হাস্সানের একথার অর্থ হলো কবিতার বিষয়বস্তুতে যদি অতিরঞ্জন থাকে তাহলে চমৎকার হয়। আর যে কোন  অতিরঞ্জনই ইসলামের দৃষ্টিতে মিথ্যাচার, যা পরিহারযোগ্য। সুতরাং কবিতা ভালো হবে কেমন করে?৯২

বুটরুস আল-বুসতানী হাস্সানের (রা) কবিতার মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন: ‘আমরা দেখতে পাই হাস্সান তাঁর জাহিলী কবিতায় ভালো করেছেন। তবে সে কালের শ্রেষ্ঠ কবিদের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেননি। আর তাঁই ইসলামী কবিতার কিছু অংশে ভালো করেছেন। বিশেষতঃ হিজা ও ফখর (ন্দিা ও গর্ব) বিষয়ক কবিতায়। তবে অধিকাংশ বিষয়ে দুর্বলতা দেখিয়েছেন। বিশেষতঃ রাসূলের (সা) প্রশংসায় রচিত কবিতায় ও তাঁর প্রতি নিবেদিত শোকগাঁথায়। তবে ঐতিহাসিক তথ্যের দিক দিয়ে এ সকল কবিতা অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ইসলামী কবিতায় এমন সব নতুন ষ্টাইল দেখঅ যায় যা জাহিলী কবিতায় ছিল না। ইসলামী আমলে হাস্সান একজন কবি ও ঐতিহাসিক এবং একই সাথে একজন সংস্কারবাদী কবিও বটে। রাসূলুল্লাহর (সা) পক্ষে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক কবিদের পুরোধা।’৯৩

একবার কবি কা’ব ইবন যুহাইর একটি শ্লোকে গর্ব করে বলেনঃ কা’বের মৃত্যুর পর কবিতার ছন্দ ও অন্তমিলের কি দশা হবে? শ্লোকটি শোনার সাথে সাথে তৎকালীন আরবের বিখ্যাত কিব সাম্মাখের ভাই তোমরূয বলে উঠলেন: আপনি অবশ্যই সাবিতের ছেলে তীক্ষ্মধী হাস্সানের মত কবি নন।৯৪ যাই হোক, তিনি যে একজন বড় মাপের কবি ছিলেন তা আজ প্রতিষ্ঠিত সত্য।

হাস্সানের (রা) সকল কবিতা বহুদিত যাবত মানুষের মুখে মুখে ও অন্তরে সংরক্সিত ছিল। পরে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়। ত৭ার কবিতার একটি দিওয়ান আছে যা ইবন হাবীব বর্ণনা করেছেন। তবে এতে সংকলিত বহু কবিতা প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। ইমাম আল-আসমা’ঈ একবার বললেন: হাস্সান একজন খুব বড় কবি। একথা শুনে আবু হাতেম বললেন: কিন্তু তাঁর অনেক কবিতা খুব দুর্বল। আল-আসামা’ঈ বললেন: তাঁর প্রতি আরোপিত অনেক কবিতাই তাঁর নয়।৯৫ ইবন সাল্লাম আল-জামিহী বলেন: হাস্সানের মানবস্পন্ন কবিতা অনেক। যেহেতু তিনি কুরাইশদের বিরুদ্ধে প্রচুর কবিতা লিখেছেন, এ কারণে পরবর্তীকালে বহু নিম্নমানের কবিতা তাঁর প্রতি আরোপ করা হয়েছে। মূলতঃ তিনি সেসব কবিতার রচয়িতা নন।৯৬

হাস্সানের (রা) নামে যাঁরা বানোয়াট কবিতা বর্ণনা করেছেন তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি হলেন প্রখ্রাত সীরাত বিশেষঞ্জ মুহাম্মদ ইবন ইসহাক। তিনি তাঁর মাগাযীতে হাস্সানের (রা) প্রতি আরোপিত বহু বানোয়াট কবিতা সংকরন করেছেন। পরবর্তীকালে ইবন হিশাম যখন ইবন ইসহাকের মাগাযীর আলোকে তাঁর আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’ সংকলন করেন তখন বিষয়টি তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়। তখন তিনি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রাচীন আরবী কবিতার তৎকালীন পণ্ডিত-বিশেষজ্ঞদের, বিশেষতঃ বসরার বিখ্যাত রাবী ও ভাষাবিদ আবু যায়িদ আল-আনসারীর শরণাপন্ন হয়। তিনি ইবন ইসহাক বর্ণিত হাস্সানের কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন, আর তার কিছু সঠিক বলে মত দিতেন, আর কিছু তাঁর নয় বলে মত দিতেন। এই পন্ডিতরা যে সকল কবিতা হাস্সানের নয় বলে মত দিয়েছেন তাঁরও কিচু কবিতা ইবন হাবীব বর্ণনা করেছেন। আর তা দিওয়ানেও সংকলিত হয়েছে।।৯৭

প্রকৃতপক্ষে হাস্সানের (রা) ইসলামী কবিতায় যথেষ্ট প্রক্ষেপণ হয়েছে। এ কারণে দেখা যায় তাঁর প্রতি আরোপিত কিচু কবিতা খুবই দুর্বল। মূলতঃ এ সব কবিতা তাঁর নয়। আর এই দুর্বলতা দেখেই আল-আসমা’ঈর মত পণ্ডিতও মন্তব্য করেছে যে, হাস্সানের ইসলামী কবিতা দারুণ দুর্বল।

হাস্সানের (রা) কবিতার একটি দিওয়ান ভারত ও তিউনিসিয়া থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। পরে সেটি ১৯১০ সনে প্রফেসর গীব মেমোরিয়াল সিরিজ হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশ পায়। লন্ড, বার্লিন, প্যারিস ও সেন্টপিটার্সবুর্গে দিওয়ানটির প্রাচীন হন্তলিখিত কপি সংরক্ষিত আছে।৯৮

শেষ জীবনে একবার হাস্সান (রা) গভীর রাতে একটি অনুপম কবিতা রচনা করে। সাথে সাথে তিনি ফারে’ দুর্গের ওপর উটে চিৎকার দিয়ে নিজ গোত্র বনু ক্বায়লার লোকদের তাঁর কাছে সমবেত হওয়ার আহবান জানান। লোকেরা সমবেত হলে তিনি তাদের সামনে কবিতাটি পাঠ করে বলেন: আমি এই যে কাসীদাটি রচনা করেছি, এমন কবিতা আরবের কোন কবি কখনও রচনা করেননি। লোকেরা প্রশ্ন করলো: আপনি কি একথা বলার জন্যই আমাদেরকে ডেকেছেন? তিনি বললেন: আমার ভয় হলো, আমি হয়তো এ রাতেই মারা যেতে পারি। আর সে ক্ষেত্রে তোমরা আমার এ কবিতাটি থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে।৯৯

আল-আসামা’ঈ বর্ণনা করেছেন: সেকালে ছোট মঞ্চের ওপর গানের আসর বসতো। সেখানে বর্তমান সময়ের মত অশ্লীর কোন কিছু হতো না। বনী নাবীতে এরকম একটি বিনোদনের আসর বসতো। বার্দ্ধক্যে হাস্সান (রা) যখন অন্ধ হয়ে যান তখন তিনি এবং তাঁর ছেলে এ আসরে উপস্থিত হতেন। একদিন দুইজন গায়িকা তাঁর জাহিলী আমলে রচিত একটি গানে কষ্ঠ দিয়ে গাইতে থাকলে তিনি কছাদতে শুরু করেন। তখন তাঁর ছেলে গায়িকাদ্বয়কে বরতে থাকেন: আরো গাও, আরো গাও।১০০ তাঁর মানসপটে তখন অতীত জীবনের স্মৃতি ভেসে উঠেছিল।

হাস্সানের (রা) মধ্যে স্বভাবগত ভীরুতা থাকলেও নৈতিক হাসহ ছিল অপরিসীম। একবার খলীফা উমার (লা) মসজিদে নব্বীর পাশ দিয়ে যাচ্ছেন। দেখলেন, হাস্সান মসিজিদে কবিতা আবৃত্তি করছেন। ‘উমার বললেন: রাসূলুল্লাহর (সা) মসজিদে কবিতা পাঠ? হাস্সান গর্জে উঠলেন: উমার! আমি আপনাদের চেয়ে উত্তম ব্যক্তির উপস্থিতিতে এখানে কবিতা আবৃত্তি করেছি। ইমাম বুখারী ও মুসলিম উভয়ে সা’ঈদ ইবনুল মুসায়্যিবের সূত্রে হাসীদসটি বর্ণনা করেছেন। উমার (রা) বললেন: সত্য বলেছো।১০১

হাস্সান (রা) ইলমান-পূর্ব জীবনে মদ পান করতেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহনের পর মদ চিরদিনের জন্য পরিহার করেন। একবার তিনি তাঁর গোত্রের কতিপয় তরুণকে মদপান করতে দেখে ভীষণ ক্ষেপে যান। তখন তরুণরা তাঁর একটি চরণ আবৃত্তি কলে বলে, আমরা তো আপনাকেই অনুসরণ করছি। তিনি বললেন, এটা আমার ইসলাম-পূর্ব জীবনের কবিতা। আল্লাহর কসম! ইসলাম গ্রহনের পর আমি মদ স্পর্শ করিনি।১০২

হাস্সানের মধ্যে আমরা খোদাভীতির চরম রূপ প্রত্যক্ষ করি। কুর্শা কবিদের সংগে যখন তাঁর প্রচন্ড বাক্যুদ্ধ চলছে, তখন কবিদের নিন্দায় নাযিল হলো সূরা আশ-শু’য়ারার ২২৪ নং আয়াত। রাসূলুল্লাহর (সা) তিন কবি হাস্সান, কা’ব ও আবদুল্লাহ কাঁদতে কাঁদতে রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারে উপস্থিত হয়ে আরজ করেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ আয়াতের আওতায় তো আমরাও পড়েছি। আমারও তো কাব্য চর্চা করি। আমাদের কি দশা হবে? তখন রাসূল (সা) তাঁদেরকে আয়াতটির শেষাংশ অর্থাৎ ব্যতিক্রমী অংশটুকু পাঠ করে বলেন, এ হচ্ছো তোমরা।১০৩

হাস্সান (রা) সবচেয়ে বড় পরিচয়, তিনি রাসূলুল্লাহর (সা) দরবারের কবি ছিলেন। তিনি মসজিদে নববীতে রাসূলকে (সা) স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। এ ছিল এক বড় গৌরবের বিষয়। তাঁকে যথার্থই ‘শায়িরুল ইসলাম’ ও শায়িরুল রাসূল’ উপাধি দান করা হয়েছিল। ইসলাম গ্রহনের পর থেকে রাসূলুল্লাহর (সা) জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর পাশে থেকে কুরাইশ, ইহুদী ও আরব পৌত্তলিকদের প্রতি বিষাক্ত তীরের ফলার ন্যায় কথামালা ছুড়ে মেরে আল্লাহর রাসূলের (সা) মর্যাদা ক্ষা ও সমুন্নত করেছেন।

রাসূলে কারীম (সা) যখন যুদ্ধে যেতেন তখন তাঁর সহধর্মীগণকে হাস্সান (রা) তাঁর সুরক্ষিত ‘ফারে’ দুর্গের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে রাসূল (সা) তাঁকে গণীমতের অংম দিতেন। এমন কি উম্মুল মুমিনীন মারিয়্যা আল-কিবতিয়্যার বোন সীরীনকেও (রা) তুলে দেন হাস্সানের হাতে। খুলাফায়ে রাশেদীনের দরবারেও ছিল তাঁর বিশেষ মর্যাদা। খলীফাগণ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সাথে কথা বলতেন এবং তাঁর জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করেন। এভাবে একটি একটি করে হাস্সানের (রা) সম্মান ও মর্যাদার বিষয়গুলি গণনা করলে দীর্ঘ তালিকা তৈরী হবে।

প্রথম অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন

You may also like...

Skip to toolbar