হুদায়বিয়ার সন্ধির বিস্তারিত !

হিজরী ৬ষ্ঠ সালে এই ঘটনা ঘটে। ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এই যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চৌদ্দশত সাহাবী নিয়ে উমরাহ করার উদ্দেশ্যে মক্কায় যাত্রা করলেন। প্রথমে কুরাইশদের খবরাখবর সংগ্রহ করার জন্য একজন গোয়েন্দা মক্কায় পাঠালেন। উসফান নামক স্থানে পৌঁছে তিনি জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তিনি আরও জানতে পারলেন যে, কুরাইশরা তাকে কাবার কাছেই পৌঁছতে দিবে না এবং তাঁর সাথে তারা প্রচন্ড লড়াইয়ে লিপ্ত হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের সাথে পরামর্শে বসলেন। আবু বকর (রাঃ)এর পরামর্শ ছিল, কুরাইশদেরকে কোন প্রকার ছাড় দেয়া যাবে না। তারা যদি রাস্তায় আটকিয়ে দেয়, তাহেল প্রয়োজনে তাদের সাথে যুদ্ধ করা হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকরের এই মতকেই পছন্দ করলেন এবং সামনে অগ্রসর হতে থাকলেন। হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উছমান (রাঃ)কে এই খবর দেয়ার জন্য মক্কায় পাঠালেন যে, আমরা যুদ্ধ করার জন্য মক্কায় আসছি না। উমরাহ পালন করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সুতরাং আমাদের পথ ছেড়ে দাও। কিন্তু কুরাইশরা এই কথার মোটেই মূল্যায়ন করল না। তারা বললঃ আমরা তোমার কথা শুনলাম। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা শুরু হল। আলোচনা সামনে অগ্রসর হচ্ছিল। এক পর্যায়ে সন্ধির পরিবর্তে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। উভয় পক্ষের লোকেরা পরস্পর তীর ও পাথর নিক্ষেপে লিপ্ত হল। এই পর্যায়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে খবর পৌঁছল যে, কুরাইশরা উছমান (রাঃ)কে হত্যা করে ফেলেছে। মুসলমানেরা এই খবর শুনে রাগান্বিত হল এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হল। তারা একটি গাছের নীচে একত্রিত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে এই মর্মে বায়আত নিল যে, তারা যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত এবং কোনক্রমেই এই হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ না নিয়ে মদীনায় ফেরত যাবে না। কিন্তু একটু পরেই সহীহ-সালামতে উছমান (রাঃ) মক্কা হতে ফেরত আসলেন। উছমান (রাঃ)এর আগমণে পরিস্থিতি শান্ত হল। পুনরায় নতুন করে সন্ধির ব্যাপারে আলোচনা শুরু হল। আলোচনা-পর্যালোচনা শেষে নম্ন বর্ণিত শর্তে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সন্ধি চুক্তি রচিত হল। ইসলামের ইতিহাসে এটি হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত।

সন্ধির প্রধান প্রধান শর্তগুলো ছিল এইঃ

১) মদীনার মুসলামন ও মক্কার কুরাইশদের মধ্যে দীর্ঘ দশ বছর পর্যন্ত সকল প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ বন্ধ থাকবে।

২) এই বছর মুসলমানেরা উমরাহ না করেই মদীনায় ফেরত যাবে।

৩) আগামী বছর তারা মক্কায় আগমণ করতে পারবে। এ সময় তারা সাথে তীর ও বর্শা আনতে পারবে না। আত্মরক্ষার জন্য শুধু কোষবদ্ধ তলোয়ার সাথে রাখতে পারবে।

৪) মক্কায় তারা কেবল তিন দিন অবস্থান করতে পারবে। তিন দিন পার হওয়ার সাথে সাথে মক্কা থেকে বের হয়ে চলে যেতে হবে।

৫) এই দশ বছরের মধ্যে মক্কার কোন লোক যদি মুসলমান হয়ে মদীনায় আশ্রয় নেয় তাহলে মদীনাবাসীগণ তাকে আশ্রয় দিবে না। পক্ষান্তরে মদীনার কোন লোক যদি মক্কায় চলে আসে তাহলে মক্কাবাসীগণ তাকে মদীনায় ফেরত দিবে না।

সন্ধির এই শেষ শর্তটি মেনে নেওয়া মুসলমানদের জন্য খুবই কঠিন ছিল। তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে বলতে লাগলঃ হে আল্লাহর নবী! আমরা কি এই শর্তটিও মেনে নিব? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তাদের যে লোক মুসলমান হয়ে আমাদের কাছে চলে আসবে, আমরা তাকে তাদের নিকট ফেরত দিব। আল্লাহ তাআলা তার কোন না কোন ব্যবস্থা করবেন।

সুন্ধি পূর্ণ হওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদেরকে আদেশ দিলেন যে, তোমরা দাঁড়িয়ে যাও, কুরবানী করে ফেল এবং মাথা কামিয়ে ফেল।

হুদায়বিয়ার সন্ধির সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাঃ

১) এই সন্ধির পর মক্কার খোযা গোত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে যোগ দিল আর বনী বকর কুরাইশদের পক্ষ নিল।

২) হুদায়বিয়ার বছর এই হুকুম নাযিল হল যে, ইহরাম অবস্থায় কেউ যদি অসুবিধার কারণে মাথা কামাতে বাধ্য হয়, তাহেল তাকে ফিদইয়া স্বরূপ তিন দিন রোজা রাখতে হবে, অথবা সাদকাহ করতে হবে অথবা একটি কুরবানী করতে হবে। বিধানটি নাযিল হয়েছিল কা’ব বিন আজরাকে কেন্দ্র করে।

৩) এই সন্ধির ঘটনায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাথা মুন্ডনকারীদের জন্য তিনবার এবং চুল খাটকারীদের জন্য একবার দুআ করেছেন।

৪) এই ঘটনার সময় দশ জনের পক্ষ হতে একটি উট এবং সাতজনের পক্ষ হতে একটি গুরু করুবানী বৈধ হওয়ার বিধান জানা যায়।

৫) এই ঘটনায় সূরা ফাতাহ নাযিল হয়।

রাসূল (সাঃ) যখন মদীনায় ফেরত আসলেন, তখন একদল মু’মিন মহিলা আগমণ করল। আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে মক্কায় ফেরত পাঠাতে নিষেধ করলেন। এর মাধ্যমে মহিলাদেরকে ফেরত পাঠানোর বিধান মানসুখ রহিত হয়ে যায়। আবার কেউ বলেছেনঃ এ বিষয়ে কুরআনের মাধ্যমে সুন্নাতকে খাস করা হয়েছে। এ মতটি খুব শক্তিশালী। আবার কেউ কেউ বলেছেনঃ শুধু পুরুষদেরকেই ফেরত দেয়ার ব্যাপারে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু মুশরিকরা উভয় শ্রেণীর ক্ষেত্রেই শর্তটি কার্যকর রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ্ তাআলা তা প্রত্যাখ্যাণ করেছেন।

হুদায়বিয়ার ঘটনায় যে সমস্ত ফিকহী মাসায়েল জানা যায়ঃ

১) হুদায়বিয়ার ঘটনায় দলীল পাওয়া যায় যে, হজ্জের মাস সমূহেও উমরাহ করা জায়েয। হজ্জের ন্যায় উমরাহ্এর ক্ষেত্রেও মীকাত হতে ইহরাম বাঁধা উত্তম। আর যেই হাদীছে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি বাইতুল মাকদিস হতে উমরার ইহরাম বাঁধবে তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে, তা বাতিল।

২) এতে আরও দলীল পাওয়া যায় যে, উমরাতে কুরবানীর জানোয়ার সাথে নেয়া সুন্নাত। কুরবানীর জন্তুতে দাগ লাগানোও সুন্নাত; এটি মুছলা বা অঙ্গহানীর শামিল হবে না।

৩) আল্লাহর দুশমনদের মধ্যে ক্রোধের জ্বালা প্রবেশ করানো জায়েয।

৪) সেনাপতির উচিৎ শত্র“দের দেশে গোয়েন্দা প্রেরণ করা।

৫) প্রয়োজন বশত যুদ্ধ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রাপ্ত ও চুক্তিবদ্ধ মুশরিকদের সহায়তা নেওয়া জায়েয। কেননা উয়াইনা আল-খুজায়ী কাফের হওয়া সত্ত্বেও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার সাহায্য নিয়েছিলেন।

৬) সেনাপতির উচিৎ সঠিক মতামত খুঁজে বের করার জন্য সাধারণ সৈনিক ও জনগণের সাথে পরামর্শ করা। এতে আল্লাহর আদেশ পালিত হবে এবং তাদের মনও খুশী হবে।

৭) যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই মুশরিকদের শিশু সন্তাদেরকে বন্দী করা জায়েয আছে।

৮) অন্যায় কথার প্রতিবাদ করা জরুরী। যদিও সেই কথাটি অবুঝ মানুষ কিংবা কোন পশুকে লক্ষ্য করে বলা হয়। কেননা হুদায়বিয়ার দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উটনী কাসওয়া যখন বসে পড়ল, তখন লোকেরা বলল যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উটনী কাসওয়ার অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের কথার প্রতিবাদ করে বললেনঃ কাসওয়ার অভ্যাস খারাপ হয় নি। পূর্বেও তার অভ্যাস খারাপ ছিল না।

৯) দ্বীনি বিষয়কে জোরালোভাবে উপস্থাপন করার জন্য শপথ করা জায়েয আছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আশিটিরও অধিক স্থানে শপথ করার কথা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ্ তাআলা কুরআনের তিনটি স্থানে তথা সূরা সাবা, ইউনুস এবং তাগাবুনে সংবাদের সত্যতা প্রমাণ করার জন্য শপথ করার আদেশ দিয়েছেন।

১০) মুশরিক এবং ফাসেক-ফাজের লোকেরাও যদি আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদশনের প্রতি আহবান জানায়, তাহলে আল্লাহর নিদর্শনের সম্মান রক্ষার্থে তাদের সাথে সহযোগিতা করা জায়েয আছে। তবে তাদের ফাসেকী ও কুফরীর সাথে কোন প্রকার সহযোগিতা করা যাবে না। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর পছন্দনীয় বিষয়ে উপর সাহায্য চায়, তার ডাকে সাড়া দিতে হবে। সাহায্যপ্রার্থী যে কেউ হোসক না কেন। তবে শর্ত হল সেই প্রিয় বস্তুর কারণে সাহায্য করতে গেলে যাতে সেই প্রিয় বিষয়টির চেয়ে অধিক ভয়াবহ,কোন ক্ষতি প্রকাশিত না হয়। মানুষের নিকট এটি একটি কঠিন ও সুক্ষ্ম বিষয়। এ কারণেই হুদায়বিয়ার দিন কতিপয় সাহাবীর হৃদয় সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিল। উমার (রাঃ) তো সেই দিন উমরাহ না করেই হুদায়বিয়া থেকে ফেরত আসতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) সেই দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ন্যায় জবাব প্রদান করেছিলেন। এতে প্রমাণিত হয় যে, আবু বকর (রাঃ) সাহাবীদের মধ্যে সর্বাধিক উত্তম, সর্বাধিক জ্ঞানী এবং আল্লাহ্ রাসূল ও আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে সর্বাধিক অবগত ছিলেন। সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণেও ছিলেন সর্বাধিক মজবুত। এই জন্যই উমার (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আবু বকর (রাঃ) ব্যতীত অন্য কোন সাহাবীকে কোন বিষয়েই জিজ্ঞেস করতেন না।

১১) এতে আরও জানা গেল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদায়বিয়ার ডান দিক থেকে বের হয়েছিলেন। তাই ইমাম শাফেঈ (রঃ) বলেনঃ হুদায়বিয়ার এক অংশ হারামের সীমানার মধ্যে এবং অন্য অংশ এর বাইরে। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রঃ) বলেনঃ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হারামের সীমানায় নামায আদায় করতেন এবং হারামের সীমার বাইরে অবস্থান করতেন। এতে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় যে, হারামের সীমানার মধ্যে এবং এর যে কোন স্থানে নামায পড়লেই বাড়তি ছাওাব (এক ওয়াক্তের বিনিময়ে এক লক্ষ ওয়াকক্তের ছাওয়াব) পাওয়া যাবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীঃ

صلاة في المسجد الحرام أفضل من مائة ألف صلاة فيما سواه من المساجد

“মসজিদুল হারামের এক নামায অন্যন্যা মসজিদের এক লাখ নামায থেকেও উত্তম। এখানে শুধু মসজিদকে খাস করা হয় নি। আল্লাহ্ তাআলার বাণীর তাৎপর্যও অনুরূপ। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ

فَلا يَقْرَبُوا الْمَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَذَا

“সুতরাং এ বছরের পর তারা যেন মসজিদুল হারামের নিকট না আসে”। (সূরা তাওবাঃ ২৮) আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ

سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الأقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ

“পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে রাত্রি বেলায় ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি”। (সূরা ইসরাঃ ১)

১২) যে ব্যক্তি মক্কার নিকটবর্তী কোন স্থানে অবতরণ করবে, তার উচিৎ হবে হারামের সীমানার বাইরে অবস্থান করা এবং নামাযের সময় হলে হারামের সীমানার মধ্যে নামায আদায় করা। আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) এরূপই করতেন।

১৩) মুসলমানদের স্বার্থে ইমাম নিজেই শত্র“দের সাথে সন্ধির প্রস্তাব করতে পারেন।

১৪) হুদায়বিয়ার সন্ধি চলাকালে মুগীরা বিন শুবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাথার কাছে তলোয়ার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। অথচ তিনি অন্য সময় এমন করতেন না। এতে জানা গেল যে, মুসলিম শাসকের কাছে অমুসলিমদের দূত আসলে মুসলমানদের শান-শাওকাত ও শাসকের প্রতি সম্মান প্রদশনের জন্য অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জায়েয আছে। এটি কোন দোষের বিষয় নয়। এমনি যুদ্ধ ক্ষেত্রে গর্ব ও বীরত্ব প্রকাশ করা কোন দোষের বিষয় নয়।

১৫) শত্র“র সামনে উটসমূহ হাজির করার মধ্যে প্রমাণ পাওয়া যায় অমুসলিম শাসকদের দূতের সামনে ইসলামের নিদর্শনসমূহ পেশ করা মুস্তাহাব। সেই দিন মুগীরাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেনঃ তোমার ইসলাম কবুল করাকে মেনে নিলাম। আর তুমি যে মাল নিয়ে এসেছ, এতে আমার কোন প্রয়োজন নেই। এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, চুক্তিবদ্ধ অমুসলিমদের সম্পদের উপরও হস্তক্ষেপ করা যাবে না এবং তার মালিকও হওয়া যাবে না; বরং তা মালিকের নিকট ফেরত দেয়া হবে। মুগিরা বিন শুবা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে তাদের সাথে বসবাস করত। অতঃপর তিনি তাদের সাথে গাদ্দারী করে তাদের সম্পদ হস্তগত করে নিয়েছিল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই মালের প্রতি কোন প্রকার দৃষ্টিপাত করেন নি, সম্পদগুলো স্বীয় মালিকের জন্য রক্ষা করা কিংবা এর কোন দায়-দায়িত্বও নেন নি। কেননা এটি ছিল মুগিরা বিন শুবা (রাঃ)এর ইসলাম গ্রহণের পূর্বের ঘটনা।

১৬) সেই দিন আবু বকর (রাঃ) উরওয়া বিন মাসউদকে লক্ষ্য করে বলেছিলেনঃ তুমি যাও এবং লাত এবং উয্যার গুহ্যদ্বার (লজ্জাস্থান) চাটগে! এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, প্রয়োজনে লজ্জাস্থানের নাম উল্লেখ করা জায়েয আছে। এমনি যে ব্যক্তি জাহেলীয়াতের দিকে মানুষকে আহবান করে, তার জন্য এ কথা বলতে বলা হয়েছে যে, তোমার বাপের লজ্জাস্থান চুশতে থাকো। এ সমস্ত কথা ইংগিতের মাধ্যমে বলা হবে না; বরং খোলাখুলি বলা হবে। কেননা ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে বক্তব্যও ভিন্ন রকম হয়ে থাকে। অথচ স্বাভাবিক অবস্থায় এ ধরণের কথা বলা দোষণীয়।

১৭) বহিরাগত লোক কিংবা কাফেরদের দূতরা বেআদবী করলে বিশেষ স্বার্থে তাতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। কেননা হুদায়বিয়ার দিন উরওয়া যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দাড়িতে বারবার হাত লাগাচ্ছিল, তখন তাকে বাঁধা দেয়া হয় নি।

১৮) লোকেরা হুদায়বিয়ার দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কফ, থুথু এবং ব্যবহৃত পানি নিয়ে কাড়াকাড়ি করছিল এবং বুক ও চেহারায় মাখাচ্ছিল। এতে প্রমাণিত হয় যে উপরের বস্তুগুলো অপবিত্র নয়।

১৯) হুদায়বিয়ার ঘটনায় প্রমাণ পাওয়া যায় যে, নেকফাল লওয়া অর্থাৎ ভাল কিছু দেখে বা শুনে ভাল কিছু কামনা করা মুস্তাহাব। হুদায়বিয়ার দিন যখন কুরাইশদের দূত সুহাইল আগমণ করল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তোমাদের কাজ সহজ হয়ে গেছে। সুহাইল অর্থ নরম ও সহজ।

২০) হুদায়বিয়ার সন্ধিতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, মুসলমানদের বিশেষ স্বার্থ অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে মুশরিকদের সাথে চুক্তি করা জায়েয আছে।

২১) সময় নির্ধারণ না করে কেউ যদি কোন কাজ করার শপথ করে, কিংবা নযর মানে বা কোন ওয়াদা করে তবে তা তাৎক্ষণিৎ বাস্তবায়ন করা জরুরী নয়। বিলম্বে পূর্ণ করলেও চলবে।

২২) মাথা কামানে হজ্জ ও উমরার অনুষ্ঠানের অন্তর্ভূক্ত এবং চুল ছোট করার চেয়ে উত্তম। হজ্জ বা উমরার সফরে বাঁধাপ্রাপ্ত হলেও মাথা কামানো বা মাথার চুল ছোট করা একটি এবাদত। অন্যের পক্ষ হতে উমরা করলেও বদলী উমরাহকারীর মাথা মুন্ডন করা বা মাথার চুল খাটো করা আবশ্যক।

২৩) হজ্জ বা উমরাহ সম্পাদনের ইচ্ছায় সফররত ব্যক্তি যেই স্থানে বাঁধাপ্রাপ্ত হবে সেখানেই কুরবানীর জন্তু জবেহ করবে। চাই সে জায়গা হারামের বাইরে হোক বা ভিতরে- এতে কোন পার্থক্য নেই। এটা আবশ্যক নয় যে, বাঁধাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হারামে পৌঁছতে সক্ষম না হলে অন্য কারও মাধ্যমে হারামে কুরবানীর জানোয়ার পাঠিয়ে দিবে। যাতে হারামের সীমানায় জবেহ করা যায়। এটিও জরুরী নয় যে, কুরবানীর জন্তু হারামে পৌঁছার পূর্বে ঐ ব্যক্তি হালাল হতে পারবে না। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ

هُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا وَصَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَالْهَدْيَ مَعْكُوفًا أَنْ يَبْلُغَ مَحِلَّهُ

“তারাই তো কুফরী করেছে এবং বাধা দিয়েছে তোমাদেরকে মসজিদে হারাম থেকে এবং অবস্থানরত কোরবানীর জন্তুগুলোকে যথাস্থানে পৌঁছতে”। (সূরা ফাতাহঃ ২৫)

২৪) হুদায়বিয়ার যে স্থানে তারা কুরবানী করেছিলেন, সে স্থান হারামের বাইরে অবস্থিত ছিল। কেননা হারামের সমস্ত এলাকাই কুরবানীর পশু জবেহ করার জায়গা। সুতরাং জানুয়োরগুলো যদি হারামের এরিয়ার মধ্যে পৌঁছে যেত, তাহলে আটকিয়ে দেয়া হয়েছে- এ কথা বলা হত না।

২৫) হুদায়বিয়ার ঘটনা থেকে জানা গেল যে, উমরার সফরে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ফেরত আসলে সেই উমরাহ কাযা করা জরুরী নয়। পরের বছর তিনি যেই উমরা করেছিলেন, তাকে উমরাতুল কাযা বলার কারণ হল তিনি দ্বিতীয়বার উমরাহ কাযা করার চুক্তি করেছিলেন।

২৬) আমরে মুতলাক তথা শর্তহীন বা সাধারণ আদেশ তাৎক্ষণিক তামীল করা জরুরী। তাই যদি না হত, তাহলে হুদায়বিয়ার দিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ দ্রুত পালন না করার কারণে অর্থাৎ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ মুতাবেক কুরবানীর পশু জবেহ করা ও মাথা না কামানোর কারণে তিনি সাহাবীদের উপর নারাজ হতেন না। সাহাবীদের পক্ষ হতে এই আদেশ পালন করতে বিলম্ব হওয়া এবং দ্বিধা-দ্বন্ধে পতিত হওয়াকে ক্ষমা করা হয়েছে এবং আল্লাহ্ তাআলা তাদের জন্য জান্নাত আবশ্যক করেছেন।

২৭) হুদায়বিয়ার সন্ধির ঘটনায় এটি জানা গেল যে, কাফেরদের সাথে এই শর্তে চুক্তি করা জায়েয আছে যে, কাফেরদের দেশ থেকে যদি কোন মুসলমান পুরুষ পালিয়ে এসে মুসলমানদের ইমামের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে, তাহলে তাকে কাফেরদের নিকট ফেরত দিতে হবে। তবে কোন মহিলা মুসলমান হয়ে পালিয়ে আসলে তাকে ফেরত দেয়া হবে না। কারণ মুমিন মহিলাকে কাফেরদের নিকট ফেরত দেয়া জায়েয নয়। হুদায়বিয়ার সন্ধির এই অংশ অর্থাৎ নারীদেরকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি কুরআনের সুস্পষ্ট আয়াত দ্বারা মানসুখ হয়ে গেছে। অন্য কোন অংশ মানসুখ হওয়ার দাবী করা সঠিক নয়।

২৮) এ থেকে আরও জানা গেল, কোন মহিলা মুসলমান হয়ে যদি তার কাফের স্বামীর বিবাহ বন্ধন থেকে চলে আসে, তাহলে ঐ কাফেরকে বিবাহের সময় নির্ধারিত মোহরানা ফেরত দিতে হবে।

২৯) মুসলমানদের ইমামের কাছে কাফেরদের কেউ ফেরত আসলে, তাকে কাফেরদের কাছে ফেরত দিতে হবে- এই শর্ত ঐ ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, যে তাদের থেকে পালিয়ে এসে ইমামের কাছে না এসে অন্য কোন দেশে আশ্রয় নিল। তা ছাড়া ইমামের কাছে ফেরত আসলেও কাফেরদের থেকে ফেরত চাওয়ার তলব না আসলে ফেরত দেয়া জরুরী নয়।

৩০) চুক্তি মুতাবেক কোন মুসলমানকে কাফেরদের দূতের হাতে ফেরত দিলে সেই মুসলিম যদি রাস্তায় সেই দূতদেরকে হত্যা করে ফেলে, তাহলে কিসাস স্বরূপ ঐ মুসলমানকে হত্যা করা আবশ্যক নয়। মুসলিমদের ইমামের উপর এর কোন দায় বার্তায় না।

৩১) মুসলমানদের কোন রাজার সাথে মুশরিকদের নিরাপত্তার চুক্তি থাকা অবস্থায় অন্য কোন এলাকার মুসলিম রাজা এই চুক্তিবদ্ধ কাফেরদের উপর হামলা করতে পারবে। মুসলিমদের উক্ত ইমামের উপর এই হামলা ঠেকানো জরুরী নয়। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমীয়া এ রকমই ফতোয়া দিয়েছেন। তিনি আবু বসীরের ঘটনাকে দলীল হিসাবে উল্লেখ করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর আবু বসীর মক্কা থেকে পালিয়ে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আয়ত্তের বাইরে অন্য এলাকায় চলে যায়। সেখান থেকে তিনি মক্কার কাফেরদের উপর হামলা করতেন এবং তাদের মালামাল লুট করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে এ কাজ থেকে বারণ করতেন না।

হুদায়বিয়ার সন্ধিতে কি কি হিকমত রয়েছে?

হুদায়বিয়ার ঘটনায় এমনি আরও অনেক হিকমত রয়েছে, যার সঠিক সংখ্যা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ জানে না। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রঃ) নিম্নে কয়েকটি হিকমত উল্লেখ করেছেনঃ

১) মূলতঃ এটি ছিল মহান বিজয় তথা মক্কা বিজয়ের ভূমিকা স্বরূপ। পৃথিবীর বড় বড় ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার চিরাচরিত নিয়ম হচ্ছে, যে কোন বড় ঘটনা সংঘটিত হওয়ার আগে তিনি একটি ভূমিকা পেশ করে থাকেন, যা সেই ঘটনার কারণ হয় এবং ঐ দিকেই ইংগিত করে।

২) হুদায়বিয়ার সন্ধি মুসলমানদের জন্য একটি বিরাট বিজয় ছিল। কেননা এর মাধ্যমে উভয় পক্ষ পরস্পরকে নিরাপত্তা দিয়েছিল। ফলে লোকেরা পরস্পর মিলে-মিশে বসবাস করার সুযোগ পায়। সেই সুযোগে মুসলিমগণ কাফেরদেরকে কুরআন ও ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সুযোগ পেলেন। ফলে প্রচুর লোক ইসলামে প্রবেশ করে। যারা ইসলাম গোপন রেখেছিল, তারাও ইসলাম প্রকাশ করে দিল। এই চুক্তির মেয়াদের মধ্যে লোকেরা স্বেচ্ছায় ইসলামে প্রবেশ করল। যেই শর্তগুলো মুশরিকরা নিজেদের অনুকূলে মনে করে আরোপ করেছিল, সেগুলোও মুসলমানেদর কল্যাণে এসে গেল। সুতরাং যেখান থেকে তারা সম্মানের আশা করেছিল, সেখান থেকেই তারা অপমানিত হল। মুসলমানেরা যেহেতু আল্লাহর সামনে নত হয়েছিল, তাই আল্লাহ্ তআলা তাদেরকে সম্মানিত করলেন। বাতিলের মাধ্যমে অর্জিত ইজ্জত হকের মুকাবেলায় অপমানে পরিণত হল।

৩) এই সন্ধিকে আল্লাহ্ তাআলা মুসলমানদের ঈমান ও ইয়াকীন বৃদ্ধির কারণে পরিণত করলেন। এর মাধ্যমে পছন্দনীয়-অপছন্দনীয় সকল বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সিদ্বান্ত মেনে নেওয়া, তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর ওয়াদা পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় থাকার গুণাবলী অর্জিত হল এবং আল্লাহ্ তাআলা তাদের অন্তরে প্রশান্তি ও স্বস্তি নাযিলের মাধ্যমে যেই অনুগ্রহ ও দয়া করেছেছিলেন, তারা তাও দেখতে পেয়েছে। এ সময় তাদের জন্য এটির বিশেষ প্রয়োজন ছিল। কারণ তারা এমন অবস্থায় ছিল, যাতে মজবুত পাহাড়ের পক্ষেও স্থির থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং এই মুহূর্তে আল্লাহ্ তাআলা তাদের প্রতি এমন প্রশান্তি নাযিল করলেন, যাতে তাদের অন্তরসমূহ একদম শান্ত হয়ে গেল এবং অন্তরসমূহ শক্ত হয়ে গেল। সেই সাথে তাদের ঈমানও বৃদ্ধি পেল।

৪) হুদায়বিয়ার সন্ধিকে আল্লাহ্ তাআলা তাঁর রাসূলের পিছনের গুনাহ্সমূহ ক্ষমা করা, তাঁর প্রতি আল্লাহর নেয়ামত পূর্ণ করা, সীরাতুল মুস্তাকীমের দিকে তাঁকে হেদায়াত করা ও তাঁর প্রতি সাহায্য প্রেরণ করে তাঁকে বিজয়ী করার মাধ্যম বানিয়েছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলা তাঁর রাসূলের অন্তরকে খুলে দিয়েছেন।

হুদায়বিয়ার সন্ধির স্থানে যখন মুমিনদের অন্তর কাঁপছিল, তখন আল্লাহ্ তাআলা তাদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করলেন। এই প্রশান্তি নাযিলের মাধ্যমে তাদের ঈমান বৃদ্ধি পেল। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা এখানে রাসূলের হাতে বায়আতের কথা উল্লেখ করেছেন। এই বায়আতকে এমন জোর দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বায়আত যেন আল্লাহর হাতেই হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র হাত যখন তাদের হাতের উপর ছিল, তখন আল্লাহ্ তাআলার পবিত্র হাত তাদের হাতের উপর ছিল। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর নবী ও রাসূল। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর রাসূলের হাতে বায়আত করল, সে যেন আল্লাহর হাতেই বায়আত করল এবং যে ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে মুসাফাহা করল, সে যেন আল্লাহর সাথেই মুসাফাহা করল। অতঃপর সংবাদ দেয়া হয়েছে যে, যারা এই বায়আত ও অঙ্গিকার ভঙ্গ করবে, তারাই কেবল এর প্রতিফল ভোগ করবে। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা ঐ সমস্ত গ্রাম্য লোকদের আলোচনা করেছেন, যারা অঙ্গিকার ভঙ্গ করেছিল এবং আল্লাহর প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করেছিল।

অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাতে বায়আত করার কারণে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা বলেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধি চুক্তি সম্পাদনের সময় মুমিনদের অন্তরের প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ্ তাআলা অবগত ছিলেন। সুতরাং আল্লাহ্ তাআলা তাদের অন্তরে প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে প্রচুর বিজয় ও গণীমত দান করলেন। খায়বার বিজয়ের মাধ্যমেই এই বিজয়ের সূচনা হয়েছিল। এর পর থেকেই বিজয় অব্যাহত থাকে।

এরপর আল্লাহ্ তাআলা মুসলমানদের উপর কাফেরদের হাত উঠানোকে (আক্রমণকে) প্রতিহত করার কথা উল্লেখ করেছেন। এখানে কোন শ্রেণীর কাফের উদ্দেশ্য- তার ব্যাখ্যা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেনঃ মক্কার কাফেরদেরকে মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করা থেকে ফিরিয়ে রেখেছিলেন এবং তাদের ক্ষতি থেকে মুসলমানদেরকে হেফাজত করেছিলেন। কেউ কেউ বলেছেনঃ এরা হচ্ছে ইহুদী। সাহাবীগণ যখন মদীনা হতে বের হলেন, তখন তারা মদীনায় অবস্থানকারী মুসলিমদের উপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছিল। আল্লাহ্ তাআলা তাদের থেকে মদীনার মুসলিমদেরকে হেফাজত করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেনঃ এরা হচ্ছে খায়বারে বসবাসকারী ইহুদী এবং তাদের দুই বন্ধু গোত্র আসাদ ও গাতফান। তবে এই ক্ষেত্রে সঠিক কথা হচ্ছে, ইসলাম ও মুসলমানদের সকল শত্র“ই এর অন্তর্ভূক্ত হতে পারে। আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ

وَعَدَكُمُ اللَّهُ مَغَانِمَ كَثِيرَةً تَأْخُذُونَهَا فَعَجَّلَ لَكُمْ هَذِهِ وَكَفَّ أَيْدِيَ النَّاسِ عَنْكُمْ وَلِتَكُونَ آَيَةً لِلْمُؤْمِنِينَ وَيَهْدِيَكُمْ صِرَاطًا مُسْتَقِيمًا

“আল্লাহ্ তোমাদেরকে বিপুল পরিমাণ যুদ্ধলব্ধ সম্পদের ওয়াদা দিয়েছেন, যা তোমরা লাভ করবে। তিনি তা তোমাদের জন্যে ত্বরান্বিত করবেন। তিনি তোমাদের থেকে শত্র“দের স্তব্ধ করে দিয়েছেন- যাতে এটা মুমিনদের জন্যে এক নিদর্শন হয় এবং তোমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করেন”। (সূরা ফাতাহঃ ২০) মুসলমানদের উপর থেকে শত্র“দের হাত প্রতিহত করাকে একটি আয়াত (নিদর্শন) হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ মুসলমানদের সংখ্যা অল্প হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে বরাবরই বিজয় দান করেছেন এবং শত্র“দের অনিষ্ট হতে তাদেরকে রক্ষা করেছেন। এটি অবশ্যই একটি নিদর্শন ও বিরাট নেয়ামত। কেউ কেউ বলেছেনঃ এখানে আয়াত (নিদর্শন) বলতে খায়বার বিজয়কে বুঝানো হয়েছে। উপরের আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা মুসলমানদেরকে হেদায়াতের নেয়ামত দেয়ার কথাও বলেছেন। এটি হচ্ছে আল্লাহ্ তাআলার পক্ষ হতে তাদর জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত।

এরপর আল্লাহ্ তাআলা মুসলমানদেরকে এমন অনেক গণীমত ও বিজয় দান করার ওয়াদা করেছেন, যা তারা সেই মুহূর্তে কল্পনাও করতে পারে নি। এই বিজয়গুলো সম্পর্কে আলেমগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেনঃ এখানে মক্কা বিজয়কে বুঝানো হয়েছে। কেউ বলেছেনঃ পারস্য ও রোম উদ্দেশ্য। আবার কেউ বলেছেনঃ খায়বার বিজয়ের পর পূর্ব ও পশ্চিমের দেশসমূহের বিজয় উদ্দেশ্য।

অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা বলেছেনঃ কাফেররা যদি আল্লাহর অলীদের সাথে যুদ্ধ করে, তাহলে তারা অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে। আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে আল্লাহ্ তাআলার এই সুন্নাতই (রীতিই) চলে আসছে। আর আল্লাহর এই সুন্নাতের মধ্যে কোন পরিবর্তন নেই।

এখানে একটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয় যে, উপরোক্ত সুন্নাত অনুযায়ী উহুদ যুদ্ধের দিন মুসলমানদের জন্য আল্লাহর সাহায্য আসল না কেন? এই প্রশ্নের জবাব এই যে, আল্লাহ্ তাআলার সাহায্য আসার জন্য তাকওয়া ও সবরের শর্ত ছিল। উহুদ যুদ্ধের দিন মুসলিমগণ সবুর করতে পারে নি বলে এবং তাকওয়ার পথ অবলম্বন না করে রাসূলের হুকুম অমান্য করেছিল বলে ওয়াদা পূর্ণ হয় নি। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা অসহায় নারী-পুরুষদেরকে রক্ষা করার জন্য কাফেরদের উপর থেকে তাদের হাতকে (হামলাকে) প্রতিহত করেছেন। সুতরাং এই দুর্বল ও অসহায় লোকদের কারণেই কাফেরদের উপর হতে শাস্তিকে প্রতহিত করেছেন। কেননা তখনও বেশ কিছু দুর্বল মুসলিম কাফেরদের কাতারে ছিল এবং তাদের ঈমান কাফেরদের নিকট গোপন ছিল। তারা বাধ্য হয়ে কাফের পক্ষ হয়ে মুসলমানদের বিরোদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছিল। সুতরাং এই অবস্থায় যদি আল্লাহ্ তাআলা মুসলমানদেরকে কাফেরদের উপর সক্ষম করে দিতেন, তাহলে এই দুর্বল মুসলিমরাও মারা যেত। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের মাঝে অবস্থান করার কারণে আল্লাহ্ তাআলা তাদেরকে আযাব থেকে রক্ষা করেছেন।

অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা কাফেরদের অন্তরের মূর্খতাযুগের জেদ পোষণ করার কথা আলোচনা করেছেন। মূর্খতা ও জুলুমের কারণেই তাদের অন্তরে এই জেদ তৈরী হয়েছিল। এই জেদ ও হিংসার মুকাবেলায় আল্লাহ্ তাআলা তাঁর বন্ধুদের অন্তরে প্রশান্তি ও স্বস্তি অবতরণ করেছেন এবং তাদের জন্যে তাকওয়ার (সংযমের) বাক্য অপরিহার্য করে দিলেন। তাকওয়ার বাক্য দ্বারা সেই সমস্ত বাক্য উদ্দেশ্য, যার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করা হয়। এগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ট হচ্ছে কালিমাতুল ইখলাস তথা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্। অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা বলেনঃ

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ

“তিনিই তাঁর রসূলকে হেদায়েত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে একে অন্য সমস্ত ধর্মের ওপর জয়যুক্ত করেন। যদিও এতে মুশরিকরা অসন্তুষ্ট হয়”। (সূরা ফাতাহঃ ২৮) সুতরাং আল্লাহ্ তাআলা এই দ্বীনকে পরিপূর্ণ করার অঙ্গিকার করেছেন এবং ইহাকে পৃথিবীর সমস্ত দ্বীনের উপর বিজয়ী করার দায়িত্ব নিয়েছেন। এই ঘোষণার মাধ্যমে মুমিনদের অন্তরকে শক্তিশালী করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে তাদেরকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। এই সুসংবাদের মাধ্যমে তাদের এই দৃঢ় বিশ্বাস অর্জিত হয়েছে যে, আল্লাহ্ তাআলা অবশ্যই এই দ্বীনকে পরিপূর্ণ করবেন। হুদায়বিয়ার দিন বাহ্যিকভাবে মুসলমানদের যে পরাজয় হয়েছে, তা দেখে এমনটি বুঝার সুযোগ নেই যে, আল্লাহ্ তাআলা রাসূলের দুশমনদেরকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর দ্বীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এটি কিভাবে সম্ভব? অথচ আল্লাহ্ তাআলা তাঁর রাসূলকে দ্বীনে হকসহ প্রেরণ করেছেন এবং ওয়াদা করেছেন যে, তিনি তাঁর দ্বীনকে সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করবেন।

পরিশেষে আল্লাহ্ তাআলা তাঁর রাসূল এবং রাসূলের পবিত্র জামআতের খুব প্রশংসা করেছেন। অথচ রাফেযীরা (শিয়ারা) এর বিপরীত করে অর্থাৎ রাসূলের সাহাবীদের কুৎসা বর্ণনা করে থাকে।

You may also like...

Skip to toolbar